রাজধানীর মহাখালীতে বড় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিক সেবা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানবিক পুলিশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তেজগাঁও থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক শবনম সুলতানা পপি।
সেদিনের সেই ঘটনার পর এখন তিনি বলেছেন ‘আমার দুই হাত যেন সবসময় মানুষের নির্ভরতা ও বিশ্বাসে কাজে লাগে।’
বৃহস্পতিবার চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় শবনম সুলতানার। একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে তারা জীবনের নানা কথা।
সেদিনের ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, ওই সময় রুটিন ডিউটিতে ছিলাম, ওয়্যারলেসে দুর্ঘটনার খবর শুনেই ছুটে যাই, গিয়ে প্রথমেই আমি ভাবি রাস্তার যানজট মুক্ত করতে হবে, তা না হলে মানুষের দুর্ভোগ হবে, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের দুর্নাম হবে। তাই ড্রাইভিং জানা থাকার কারণে দ্রুত গাড়িটিকে রাস্তায় পাশে পার্কিং করে যান চলাচল স্বাভাবিক করি। পরে দেখি দুর্ঘটনায় আহত এক ছেলে পায়ে ব্যথা পেয়ে কাতরাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে তাকে আমি প্রাথমিক চিকিৎসা দেই।
‘‘আমার পাশে থাকা অনেকেই বিষয়টি দেখেছে, কিন্তু কেউ চিন্তাও করেনি একজন নারী পুলিশ হিসেবে রাস্তার যানজট স্বাভাবিক করে দুর্ঘটনায় আহতদের পাশে দাঁড়াবো। আমি নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেই কাজ করি”-যোগ করেন তিনি।

শবনম বলেন, ছেলেটিকে দেখে আমার মনে হয়েছে ওর পায়ের চিকৎসাটা দেওয়া জরুরি ছিল। অনেক সময় দেখা যায় দুর্ঘটনায় কেউ পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাকে প্রাথমিক সেবা না দেওয়ায় বড় ধরণের ক্ষতি হবার আশংকা থাকে।
আগে থেকেই প্রাথমিক সেবাটা জানা ছিল কিনা? জানতে চাইলে শবনম সুলতানা বলেন: আমাদের ট্রেনিংয়ে দুর্ঘটনা কবলিত মানুষদের প্রাথমিক সেবা দেওয়াটা শেখানো হয়। এছাড়াও আমাদের যে কোন মিটিংয়েই মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানবতা বিষয়ে সবসময় বলা হয়।
ইদানিং মানুষের প্রতি মানবতা বিষয়টি একেবারেই উঠে যাচ্ছে, সেখান থেকে একজন নারী পুলিশ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সাম্প্রতিক সময়ে বিরল, নিজের অনুভূতির কথা জানতে চাইলে তেজগাঁও থানা পুলিশের এই উপ-পরিদর্শক বলেন: আমি চাই আমার দু’হাত যেন সবসময় মানুষের নির্ভরতা ও বিশ্বাসে কাজে লাগে। কখনই পুলিশ হিসেবে ভুল বা অন্যায় করি নাই।’
‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনি এখন টক অব দ্য টাউন’- কীভাবে দেখছেন বিষয়গুলো জানতে চাইলে শবনম বলেন: আমি শুরুতে বিষয়টি নিয়ে খুবই লজ্জা পেয়েছি, আমি বড় কোন কিছু করি নাই, এগুলো আমি ডিউটিরত অবস্থায় হরহামেশাই করি। বুধবার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে এক ব্যক্তির বাইক বন্ধ হয়ে যায়, আমি বাইক রাস্তার পাশে নিয়ে তার বাইক স্টার্ট দিতে সাহায্য করি।

বিনয়ী শবনম বলেন: এই ঘটনা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে, আমি কিন্তু জানতামও না কে আমার ছবি তুলছে, শুধু মনে হয়েছিল মানুষটির পাশে দাঁড়াতে হবে। ওই ঘটনার পর বিষয়টি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের নজরে এসেছে, দেখবেন অন্য কোনদিন আমার আরেক সহকর্মী হয়তো আমার চেয়েও বড় কোন বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করবে। তাদের এই ঘটনা অনুপ্রেরণা যোগাবে আরো ভালো কিছু করার। সবাই চায় তাদের বিপদে যেন পুলিশকে পাশে পায়। আমি চাই আমার ডিপার্টমেন্ট যেন হেয় না হয়।
যা ঘটেছিল সেদিন
গত ২২ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে আজিমপুর-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী ভিআইপি পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা কয়েকটি গাড়িকে প্রচণ্ডবেগে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত ৮-১০টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঘটনাস্থলে পেট্রোলিং দায়িত্বে থাকা ডিএমপির তেজগাঁও থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক শবনম এগিয়ে আসেন। চালক না থাকায় সবাইকে অবাক করে নিজেই গাড়িটি চালিয়ে নিরাপদে সরিয়ে রাস্তার যান চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ীর লোকদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, এই গাড়ীটি আটক করা হয়েছে। আপনারা থানায় যোগাযোগ করুন, আপনাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।

পরে রাস্তার যানজট স্বাভাবিক করে দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত ছেলেটির কাছে ছুটে যান। ছেলেটির পায়ে নিজে বরফ দিয়ে দেন এবং ছেলেটি যেন হাটতে পারে সেজন্য তাকে সহযোগিতা করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানবতার প্রতীক শবনম
পুলিশ কর্মকর্তা শবনমের অসাধারণ কর্মকাণ্ড সেখানে উপস্থিত থাকা কয়েকজন মুঠোফোনে ধারণ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর ওই পুলিশ কর্মকর্তার এই কাজকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সোহেল আহমেদ নামের একজন লিখেছেন: গুটিকয়েক পুলিশের জন্যে সমস্ত পুলিশ বাহিনী খারাপ হতে পারে না। “স্যালুট বোন আপনাকে, আপনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর গর্ব এবং মানবতার প্রতীক “।
কবির চৌধুরী নামের আরেকজন লিখেছেন: দুনিয়াতে এখনও ভাল মানুষ ও ভাল পুলিশ আছে!!
ঘটনার পর থেকে নিয়মিতই আপনজন, সহকর্মীদের ভালবাসায় সিক্ত হচ্ছেন শবনম সুলতানা। মুঠোফোনেও পাচ্ছেন শুভেচ্ছা বার্তা।








