কবি, ঔপন্যাসিক ও লেখকরা তাদের প্রকাশিত লেখার সমালোচনা শুনতে উৎসুক থাকেন। বিভিন্ন সাহিত্য আসরে তারা তাদের লেখা নিয়ে উপস্থিত হন তা পাঠ করে তাৎক্ষণিক সমালোচনা শুনে নিতে। প্রকাশিত গ্রন্থের সমালোচনা লিখিয়ে নিতে তারা হন্য হয়ে সমালোচক খুঁজে বেড়ান। যারা ভালো সমালোচনা করতে পারেন তারাও সম্মানিত হন।
সম্মান সূচকভাবেই তাদের নামের আগে বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক বিশেষণটি জুড়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন সংবাদ পত্রে ও সাহিত্য পত্রে সাহিত্য সমালোচনা বিভাগও থাকে। এইসব সমালোচনাই সাহিত্যের উর্বরতা,উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে তাকে অধিকতর সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়।
সমালোচনাকে অস্বীকার করা মানে মুক্ত বুদ্ধি ও প্রকৃতির সহজাত রীতিকে অস্বীকার করা। যেমন প্রকৃতিতে শান্ত বাতাস আছে, মিষ্টি রোদ আছে, ভরা পূর্ণিমার রাত আছে, নদীতে জোয়ার আছে তেমনই ঝড়ের তান্ডবলীলা আছে, ঘামঝরানো উত্তপ্ত রোদেলা দিন আছে, অমাবস্যার ভূতুরে রাত আছে, নদীতে ভাটা আছে। শান্ত মায়াবী হরিনী, নানা রঙের পাখি, প্রজাপতি যেমন বনের শোভা তেমনই শোভা বাঘ, ভাল্লুক, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীরাও সুন্দর বনে বাঘসহ আরও অন্যান্য ভয়ংকর প্রাণী থাকে।
পরিবেশবাদীরা কিন্তু ভয়ংকর প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলার আহবান জানায় না। তারা হিংস্র, নম্র, মায়াবী তথা সকল প্রাণীকূল ধ্বংসের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ায়। এক কথায় রক্ষা করতে হবে জীব বৈচিত্র্যকে। রক্ষা করতে হবে প্রকৃতিকে। একটি বাঘ, সিংহ কিংবা ভাল্লুককে হিংস্র বলে কেউ হত্যা করলে সে বীর নয় অপরাধীই হয়। কথা আছে, ‘‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”।
শিশুরাও মাঝে মাঝে দুষ্টামি করলে মায়ের হাতেই মার খায়। মায়ের হাতের মার খেয়ে সন্তানের চোখে জল বেরোয় কিন্তু এতে মাতৃত্বের আবেগ ও ভালোবাসা কমে যায় না। মায়ের হাতের মার শিশুর বেড়ে ওঠার সহায়কই হয়। ছাত্র পড়া না পারলে শিক্ষকের হাতে মার খেতে হয়। আবার শিক্ষক অপরাধ করলে ছাত্রদেরকেও শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। সমালোচনা মানব প্রকৃতির স্বভাবসিদ্ধ রীতি। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে এটি খুবই আবশ্যক। লেখক, সংস্কৃতি কর্মী ও সাহিত্যকর্মীদের কর্মের মূল্যায়ন এবং তাদের কর্ম প্রক্রিয়ার সহায়ক ভূমিকা পালন করতেই প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি। কিন্তু এটি আজ চরম ভাবে বিতর্কিত।
সম্প্রতি সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার অগ্রগতিরই বিপরীতে দাঁড়িয়েছে।বাংলা একাডেমি মেলায় নিষিদ্ধ করলো একটি প্রকাশনা সংস্থাকে। বাংলা একাডেমির সমালোচনা করলে সমালোচকের প্রাতিষ্ঠানিক বই নিষিদ্ধ করা হবে এটা একাডেমির কোনো আইনে লেখা আছে?
শ্রাবণ প্রকাশনী অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেছে। পাঠকরা এই বইগুলো মেলায় খুঁজতে গিয়ে যখন পাবে না সেটা কি পাঠকের অধিকার হরণের বিষয় হবে না? যার পাঠকের চাহিদা মেটানোর কথা তার দ্বারাই চাহিদাকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়া খুবই লজ্জার। টকশোতে বাংলা একাডেমির সমালোচনা করার দায়ে দুই বছরের জন্য শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করা হল। গত বছর বন্ধ করা হয় ব-দ্বীপ প্রকাশনী। গ্রেফতার করা হয় এর প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে। এখনো বৃদ্ধ বয়সে জেলের ঘানি টানছেন তিনি। এর আগের বছর বইমেলাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা বাংলা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে।
অভিজিতের বই প্রকাশের দায়ে হত্যা করা হয় এর প্রকাশক দীপনকে। এই হত্যায় বাংলা একাডেমি ছিল নিরব ভূমিকায়। এখন নিজেই অবতীর্ণ হল মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিপরীতে।
আদালত কর্তৃক হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি এই বইটি প্রকাশ করেছেন। কই এজন্যতো আগামী প্রকাশনী নিষিদ্ধ করা হয়নি। বই মেলা প্রাণের মেলা, এটা কেবলই মুখের বুলি। স্টল বরাদ্দে, লেখক কবিদের বই প্রকাশে, নতুন লেখকদের উৎসাহব্যঞ্জক কর্মকাণ্ডে প্রতিবছরই ব্যাপক অনিয়ম বিশৃংখলা চালু থাকে। কতিপয় প্রকাশক লেখক, কবির টাকায় বই বের করে প্রকাশ্যে পরের ধনে পোদ্দারি করছে।
বই বিক্রি হয় না বলে তারা লেখক কবিকে নূন্যতম টাকাও ফিরিয়ে দেয় না। বাংলা একাডেমি কি পেরেছে লেখক কবিদের স্বর্বসান্ত করা এইসব প্রকাশকদের মেলায় স্টল বরাদ্দ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে? স্টল বরাদ্দ পেতে যেসব প্রকাশক তাদের বইয়ের তালিকা জমা দেয় বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কি কখনো জানতে চেয়েছে এগুলোর মধ্যে কয়টি বই প্রকাশকের টাকায় আর কয়টি লেখকের টাকায় বের হয়েছে?
প্রকাশকদের যেসব বিষয়ে কঠোর হওয়া উচিত সেসব বিষয়ে না হয়ে একটি টকশো সমালোচনাকে কেন্দ্র করে একটি প্রকাশনা সংস্থাকে নিষিদ্ধ করে ফেলা চরম প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার বর্হিপ্রকাশ কিছু নয়। রবিন আহসান একজন প্রকাশক সুতরাং আরেকজন প্রকাশকের গ্রেফতার ও জেলের ঘানি টানার প্রতিবাদ করতেই পারেন।
বাংলা একাডেমির শ্রাবণ প্রকাশনী নিষিদ্ধের কারণ হিসাবে শামসুজ্জোহা মানিকের পক্ষে রবিনের প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ করার বিষয় উল্লেখ করা চরম ছেলেমানুষী খোঁড়া যুক্তি ছাড়া কিছু নয়। তবে কি এবার যারা রবীন আহসানের পক্ষে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে আগামীতে তাদেরও নিষিদ্ধ করা হবে? কোন ভয়াবহ স্বেচ্ছাচারিতার দিকে ছুটছে বাংলা একাডেমি? এতে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানটির।
আহত হচ্ছে প্রকাশক, লেখক ও পাঠক সমাজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় একাডেমির এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে। রাজপথে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকায়। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বাংলা একাডেমির গ্রহণযোগ্যতা। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি লালনের এই সর্বোচ্চ সংস্থাটিকে বিতর্কিত করে তোলা এক চরম লজ্জার বিষয়।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, আমি একাডেমির সিদ্ধান্তের তুমুল প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু এজন্য আমার বাংলা একাডেমি পুরস্কার কেড়ে নেবেনাতো? একোন অশিষ্ঠ,অভব্য ও ভয়াবহ স্বেচ্ছাচারিতার পথে ছুটছে বাংলা একাডেমি!!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








