চট্টগ্রাম থেকে: জিম্বাবুয়েতে বাস ২০০২ সাল থেকে। জন্ম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে, ১৯৮৬ সালে। সিকান্দার রাজা জিম্বাবুয়েকে ধ্যানজ্ঞান মনে করলেও পাকিস্তানের পরিচয়টা বাদ দিতে চান না। বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা বাবা-মায়ের মুখে অল্প অল্প শুনেছেন। সেই যুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস না জানলেও বৃহস্পতিবার সিলেটকে হারানোর পর চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন, ‘অবশ্যই আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমর্থন করি। কেননা আমি মনে করি প্রতিটি জাতি স্বাধীন হওয়ার দাবি রাখে।’
চিটাগং পর্বে সিলেটকে ৪০ রানে হারায় বন্দরনগরীর দলটি। এই জয়ে রাজার অবদান সবচেয়ে বেশি। ব্যাট হাতে টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলেন, ৪৫ বলে ৯৫। এরপর বিপজ্জনক হয়ে ওঠা প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যান ফ্লেচারের কঠিন ক্যাচ নিয়ে দলকে ম্যাচে ফেরান।
সংবাদ সম্মেলনে রাজা চ্যানেল আই অনলাইনের পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেন। সেসময় মূলত ক্রিকেটীয় আলোচনার সঙ্গে ছেলেবেলার একটি গল্প বলেন। এরপর সংবাদ সম্মেলন শেষে ফেরার পথে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। দুই পর্বের আলাপ পাঠকদের জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে তুলে দেয়া হল:
একাত্তর প্রসঙ্গ
সাগরিকায় তখন সুনসান নীরবতা। দলকে জিতিয়ে চট্টলাবাসী দেরি করেনি। অনেক আগে গ্যালারি ফাঁকা করে সবাই বেরিয়ে পড়েছেন। নিঃসঙ্গ মাঠের শিশিরে ভেজা ঘাসের বুক চিরে দলীয় ম্যানেজারকে নিয়ে সাজঘরে ফিরছিলেন সিকান্দার রাজা। পেছন থেকে নাম ধরে ডাকতেই দাঁড়িয়ে যান। বললেন, ‘ওহহ..আপনি?’
-‘রাজা, আপনি তো পাকিস্তানি?’
-‘এখন আগে জিম্বাবুইয়ান। পরে পাকিস্তানি,’ হাসতে হাসতে উত্তর দেন সুদর্শন রাজা।
-ক্রিকেটীয় আলাপ তো সংবাদ সম্মেলনেই হল। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। আপনি কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু জানেন?
৩১ বছর বয়সী রাজা এবার একটু থমকে যান। কিছু একটা ভেবে ছবি তুলতে তুলতে বলেন, ‘বাবা-মায়ের মুখে অল্প অল্প শুনেছি। অবশ্যই সমর্থন করি। সব জাতি স্বাধীন হওয়ার দাবিদার।’
-পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে যেটা করেছিল, আপনি সেটা সমর্থন করেন কি না? তাদের ভুল স্বীকার করা উচিত বলে মনে করেন কি না?
রাজা এবার চুপ করে যান। এক সময় উত্তরও দেন। তবে কৌশলী, ‘আমি আসলে দুদেশের ইতিহাস ভালো করে জানি না। তাই মন্তব্য করে ইডিয়ট হতে চাই না। আগে আমাকে ইতিহাসটা ভালো করে পড়তে হবে।’
রাজা যাওয়ার সময় কথা দিয়ে যান, সেই ইতিহাস পড়ে দেখবেন।
সংবাদ সম্মেলন পর্ব
সিকান্দার রাজা ছেলেবেলায় কখনোই ক্রিকেটার হতে চাননি। চাননি তার বাবা-মাও। ছেলেকে পাইলট হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু চোখে সমস্যা থাকায় সেটা হয়নি। এরপর রাজার পথ বেঁকে যায়। জিম্বাবুয়েতে পড়ালেখা শেষ করে ২০০৭ সালের দিকে পেশাদার ক্রিকেটে নাম লেখান। বোর্ডের অনুরোধে জিম্বাবুয়ে সরকার রাজার খেলায় খুশি হয়ে পূর্ণ নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে খেলার অনুমতি দেয়। চোখে এখনো সেই সমস্যা আছে কি না, জানতে চাইলে রাজা বলেন, ‘পাইলট হতে চোখ যেমন থাকা লাগে, তখন হয়তো সেটা ছিল না। কিন্তু এখন সমস্যা নেই।’
‘প্রত্যেকটা মানুষের ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন থাকে। এক সময় আমারও ছিল। কিন্তু সেটা পূরণ হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে আমি এখানে আসতে পেরেছি।’
টি-টুয়েন্টিতে রাজার আগের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল স্টিনবিক ব্যাংক টুর্নামেন্টে, ৪৮ বলে ৯৩। সেটা দশ বছর আগের কথা। এরপর রাজাকে বিপিএলের এই ম্যাচের মতো এতটা ঝড় কখনো তুলতে দেখা যায়নি। এতদিন বাদে রাজার এমন ঝড়ের রহস্য কী? রাজা উত্তরে বলেন, ‘আসলে ঠিক রহস্য না। আমি সবসময় শিখতে পছন্দ করি। এখানে আসার আগে আমার বেশ কয়েকজন সতীর্থর সঙ্গে কথা বলেছি। ম্যাচের আগে প্রচুর তথ্য জোগাড় করি। কীভাবে বল আসে। কীভাবে এখানে শট খেলতে হয়। তাতেই সফল হয়েছি।’
চার বছর আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে বুলাওয়েতে রাজার অভিষেক হয়। তারপর সব মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয়বার বাংলাদেশে এসেছেন। এবার বিপিএলের সুবাদে তিনটি শহরে খেলেছেন। বাংলাদেশকে কেমন দেখছেন?
‘আমি মনে করি পরিবেশটা দারুণ। ক্রিকেট খেলার উপযুক্ত যায়গা। আমার ফ্রাঞ্চাইজির সবাই পরিবারের মতো। আমি খুব উপভোগ করছি।’








