স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদরের বিচার নিয়ে তখনকার প্রজন্ম খুব হতাশ থাকতেন, ভাবতেন দেশবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেশের মাটিতে হবে তো। তবে এদের মধ্যেও এমন কিছু সংঘবদ্ধ মানুষ ছিলেন যারা বিশ্বাস করতেন একদিন না একদিন এই মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। দেরি করে হলেও আজ সেই বিশ্বাস পূরণ হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সেই স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে। আর দেশ হচ্ছে কঙ্কলমুক্ত।
তেমনি এক স্বপ্ন ভরা গল্প মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুর নূর তুষার তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন। তার পুরো লেখাটি তুলে ধরা হলোঃ
রোগী একজন রাজনৈতিক কর্মী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। অ্যাডমিশনের দিন রোগীর ভীষণ চাপ, তিনি বসে আছেন বারান্দায়। আর বলছেন, শোনেন, তাড়াতাড়ি আমাকে বেড দেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যতো দ্রুত সম্ভব তাকে বেড দেয়া হলো, বারান্দাতেই একটা ফ্যানের ব্যবস্থা করা হলো এবং প্রথম সুযোগেই ওয়ার্ডের ১ নম্বর বেডটি তাকে বরাদ্দ দেয়া হলো। ১ থেকে ৪ নম্বর বেড আমার দায়িত্বে। আমি তার চিকিৎসক। খুব কম সময়েই আমরা নিশ্চিত হলাম রোগীর ফুসফুসে ক্যান্সার।
রোগীর জন্য প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা, ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে । তিনি প্রতিদিন গল্প করেন। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। রণাঙ্গণে তার নেতা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আব্দুর রাজ্জাক। তখন তিনি জীবিত। তার হাত ধরেই তিনি ট্রেনিং নিয়েছেন । মনে ভীষণ দুঃখ তার। রাজাকারদের দাপট দেখতে হয়েছে, দেখতে হয়েছে ১৯৭৫ এর নৃশংসতা। ১৯৯৪ সালে, বিএনপি জোট ক্ষমতায়। তার খুব আশা একদিন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা রাজাকারদের বিচার করবে।
প্রতিদিন তিনি আমাদের তাগাদা দেন।”শোনেন, আমাকে দেখতে যে কোনোদিন বড় বড় নেতারা আসবেন। আপনারা ওয়ার্ড পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখেন। নাহলে তারা এসে খুব নাখোশ হবেন।”
তার পরনে একটা লুংগি আর একটা শার্ট। কপর্দকহীন তিনি। একমাত্র সম্বল একটা গরু বিক্রি করে ২০০০ টাকা নিয়ে এসেছিলেন। প্রায়ই সেটার কথা বলেন আর বলেন, চিন্তা করবেন না, চিকিৎসার জন্য আমার কাছে টাকা আছে। সেই টাকার একটি টাকাও তাকে আমরা খরচ করতে দেইনি। সমাজকল্যাণ অফিসের আপাকে বলে তার জন্য নতুন লুংগি, শার্ট, গামছার ব্যবস্থা হয়েছে। চাঁদা তুলে টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য সব ঔষধ ও বিনামূল্যে ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা কিনে এনেছি কেমোথেরাপীর জন্য সিসপ্লাটিন। রেডিয়েশন দেয়া হবে তার আগে টিউমার ছোট করার জন্য।
চিকিৎসার এক পর্যায়ে রোগী খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। একে বলে এআরডিএস। রেডিওথেরাপী চলাকালীন এমন হয় কারো কারো। একদিন রাতে আমার একা নাইট ডিউটি। ওয়ার্ডে তিনি ছাড়া তেমন খারাপ কোনো রোগী নেই। রোগী বাঁচবেন না। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে গেলেন।
আমার হাতে তার হাত, তিনি বলছেন..ডাক্তার সাহেব, আলো কম কেন? শোনেন, আলো জ্বালান। আর মনে রাখবেন আমরা কিন্তু হারবো না। আমরা ঠিকই রাজাকারদের বিচার করবো। বলছেন আর তার গলা হারিয়ে যায়.. হঠাৎ তিনি কলেমা পড়লেন.. তারপর চুপ।
রাত তখন একটা। ওয়ার্ডে মৃত রোগী রাখা হয় না। অন্য রোগীরা ভয় পায়। তার স্ত্রী তাকে কিছুতেই পেছনের অন্ধকার বারান্দায় রাখতে দেবেন না। তিনি বলছেন, ডাক্তার সাহেব, সে অন্ধকার পছন্দ করে না, তারে অন্ধকার বারান্দায় রাখবেন না, তারে মশা মাছি কামড় দেবে। ওয়ার্ডের সিস্টার আর ওয়ার্ড বয়কে নিয়ে পরিকল্পনা করে ফেললাম মুহূর্তের মধ্যে। আমি তার উপরে মশারী টাংগিয়ে দিলাম।এমন ভাব করলাম যেন তিনি বেঁচে আছেন, ঘুমে অচেতন। তার পাশে তার হাত ধরে বসে থাকলাম। শুধু শুধুই অক্সিজেন সিলিন্ডারটা যেন ঠিক করে দিচ্ছি সেই অভিনয় করলাম। চ্যানেল খুললাম না। আর তার স্ত্রী সারারাত তাকে বাতাস করলেন।
তার ঠিক পাশের বেডের রোগীকে বেড সহ দূরে সরিয়ে দিলাম। এমন ভাবে আমি কিছুক্ষণ পরপর তার বেডের পাশে যাওয়া আসা করতে লাগলাম, যেনো রোগী বেঁচে আছেন। আমি ও আমার সঙ্গের সহকর্মীরা সেদিন তাকে অন্ধকার বারান্দাতে যেতে দেই নি।
ভোরের আলো হবার সাথে সাথে,ট্রাক এনে ওয়ার্ডের দাদুভাইদের সাথে নিয়ে.. তাকে রওনা করিয়ে দিলাম, তার বাড়ীর দিকে। আমি আমার জীবনের প্রথম ডেথ সার্টিফিকেটে সই করলাম।
আজকে যতোবার আমি দেখি রাজাকার আলবদর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, আমার সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে। ডাক্তার সাহেব, আমরা কিন্তু হারবো না। আমি মাঝে মাঝে স্বপ্নে তার হাত ধরে বসে থাকি।







