চ্যানেল আই অনলাইন
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • স্বাস্থ্য
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

আমাদের রবীন্দ্রভাগ্য

আদিত্য শাহীনআদিত্য শাহীন
৬:৫৬ পূর্বাহ্ন ০৭, মে ২০১৫
মতামত
A A

আমাদের এক পুরনো জমিদারের নাম রবীন্দ্রনাথ। প্রজা দরদী এক জমিদার। যিনি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে ১৮৯১ সালে পিতার আদেশে তৎকালীন নদীয়ায় আসেন। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে তিনি থাকতেন। ‘পদ্মা’ নামের বিলাসবহুল পারিবারিক বজরায় চড়ে তিনি প্রজাবর্গের কাছ থেকে খাজনা আদায় ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে যেতেন।

শিলাইদহ নামের জায়গাটি এখনও প্রত্যন্ত গ্রাম। নগরায়ণের উষ্ণ হাওয়া হু হু করে চতুর্দিক প্রবাহিত হতে থাকলেও ফসলি সবুজে ছাওয়া এক ক্ষেত্র এটি। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত একটি ইউনিয়ন। গোটা কুমারখালী জুড়েই বাঙালি মনিষীর চারণক্ষেত্র। বাউল শিরোমণি ফকির লালন সাঁই, সাধক ও সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, মীর মশাররফ হোসেন, বিপ্লবী বাঘা যতীন, আকবর হোসেনসহ অসংখ্য গুণী মানুষের চিন্তার আবেশ ছড়িয়ে আছে এই জনপদে। বলা যেতে পারে সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত কুষ্টিয়ার ভাবজগতের সূত্রমুখ কুমারখালী। মহাকালের এক সুবর্ণসময়ে যেখানে আগমন ঘটে কর্মচঞ্চল মানবতাবাদী এক জমিদারের। জমিদারী বৃত্তে কৈশোর পেরুনো নব্য জমিদার এখানে এসে পেয়ে গেলেন মানব জমিনের নতুন এক স্বাদ। পারস্পরিক চিন্তার রশি হয়ে উঠলো আরো দীর্ঘ ও মজবুত। সুফী সাধক ও মারফতি তান্ত্রিকেরা বলেন, ‘আমি নেই তুমি (স্রষ্টা) আছো’। স্রষ্টার সৃষ্টিবার্তা নিয়ে স্রষ্টারই এক রূপ বিরাজ করে, তাদের তাদের মিলন হয়। তারা তারা পেয়ে যায় মনের মানুষের সন্ধান। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তৎকালীন চিন্তাজগতের অন্যতম প্রতিভূ লালন দর্শনের গভীর সাক্ষাৎ যেন ছিল জমিদারের মহাজাগতিক ভ্রমণ পথে সবচেয়ে বড় ‘খাজনা’ হিস্যা বা উপার্জন। তার জীবনের সেরা সৃষ্টিগুলি উদগত হয়েছে এখানেই।

রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কাজের জগৎ বিশাল বিস্তৃত। যা নিয়ে এ পর্যন্ত কাজও হয়েছে অগণন। যুগে যুগে রবীন্দ্রচিন্তক ও অনুরাগীদের অনুসন্ধান তৃষ্ণার সামান্য হয়তো পূরণ হয়েছে। কিন্তু চিন্তা ও রহস্য উন্মোচনের বিবেচনায় এখনও রবীন্দ্রনাথ এক বিস্ময়। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনের রস, আত্মবিশ্বাস আর মুক্তির সূত্র খুঁজেই বেশি আনন্দ। তার কাজ নিয়ে জিজ্ঞাসা সুউচ্চ হিমালয়ের সন্ধান দেয়, যেখানে অন্ধের মতো আরোহন করাও কঠিন, চোখ খুলে তো আরো কঠিন।

জন্মগত সূত্রে আমার রবীন্দ্রগর্ব রয়েছে। বলতে ভালোবাসি রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি থেকে আমার জন্মভূমি কয়েক মাইলের ব্যবধানমাত্র। আমাদের শিশুকালে পারিবারিক সফর, স্কুল পালানো ভ্রমণ থেকে শুরু করে তারুণ্যের প্রেমসিক্ত কোনো কোনো দুপুরের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে। শহর পেরিয়ে গড়াই নদী তারপরে টানা এক পথ কুঠিবাড়ি। যেখানে আমরা পায়ে হেঁটে, বাই সাইকেলে, রিক্সাভ্যানে, মোটর সাইকেলে এবং গাড়িতে গিয়েছি অন্য এক স্বাধীনতার সন্ধানে। কুঠিবাড়ির দোতলায় দাঁড়িয়ে এদিকে সেদিক তাকিয়ে রবীন্দ্র দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ সন্ধানেরও বৃথা চেষ্টা করেছি। বারবার ভালো লেগেছে কুঠিবাড়িতে ঠিকরে পড়া বিকেলের রোদে কিংবা বকুল তলার সিঁড়িতে বসে ধ্যানমগ্ন এক জমিদারের কথা ভাবতে, যিনি দেখতে এসেছিলেন জমিদারি কিন্তু প্রেমে মজে গিয়েছিলেন গ্রামীণ জীবনের খড়কুটো ধুলোবালির। গ্রামীণ দারিদ্র্যের গভীর বাস্তবতা, এর কারণ ও নিরসনের উপায় নিয়ে গভীর ভাবনায় মজে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জমিদারী হৃদয় খনন করে নিজের ভেতরে রোপন করার প্রয়াস পেয়েছিলেন এক দরদি বৃক্ষ। সৃষ্টিকর্তা যেনো তাকে এখানে আনার জন্যই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন।

আমার ভেতরের রবীন্দ্র অহংকারহেতু আমি বরাবরই রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িকে নিজের বাড়ি ভেবেছি, নিকটতম ও দূরের মানুষে মাঝে ছড়িয়েছি রবীন্দ্রগর্ব। রবীন্দ্র জন্মতিথিতে কুঠিবাড়িতে তৈজসপত্রের মেলা, পুতুলনাচের নামে অন্য কিছু কিংবা নাগরদোলা দেখে খিস্তি করে এসবের নানান ব্যাখ্যা দাঁড় করেছি। কিন্তু আমি বাইরের কেউ হিসেবে রাজধানী ঢাকা থেকে যখন প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের জন্য একটি প্রতিবেদন করতে রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে যাই, তখন আমার সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হয় অন্য এক রবীন্দ্রনাথের। প্রৌঢ় এক কৃষক, তার নাম মনে নেই। বাড়ি শিলাইদহ, খলিশাদহ অথবা খোরশেদপুর এসব এলাকায় হবে। জিজ্ঞাসা করছি, রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা জানেন? তিনি বললেন, না। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কি জানেন? বললেন, আমরা মুরুক্কু (মুর্খ) মানুষ। আমি কি জানবো ? নাছোড়বান্দা হয়ে বললাম কিছু একটা তো বলেন, আপনার বাড়ি যেহেতু এখানেই। তিনি বললেন, ‘আমার আব্বার মুখে শুনিচি। ঠাকুর যখন জমিদার হয়া প্রত্তম একেন আসে, তকুন সে যুবক। ফসসা টকটইকি গাইর রোং। সিবার পদ্মার চরে কিচ্চু ফসল হয়ছিল্ লা। বালু উইটি নষ্ট হয়া গিছিলু। আমার দাদা, আরো বহু মানুষ। সপই কিরষক। লাইন ধইরি দাঁড়া ঠাকুরের কাছ মাফ চাইছিলি, যে ইবার খাজনা দিতি পারবু নান, আমার এবার যাওয়ার জিগা নি। আপনিই আমার বাপ মাও। এই কতা শুইনি ঠাকুর সিবার খাজনা মাপ কইরি দিছিল’। দারুণ তথ্য, খাতায় টুকে নিলাম। সে সঙ্গে ক্যামেরায় তো ধারণ হলোই।

হ্যাঁ, এখানেই প্রজাদরদী এক জমিদার হয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও যুগচিন্তকরা বহুমুখি সৃষ্টির ভেতর দিয়ে যে রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন, কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষ কোন কবিতা না পড়ে, কোন চিত্রকর্ম না দেখে, কোন উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ না করে, রবীন্দ্রসঙ্গীত না শুনে, নৃত্যকলা তিলমাত্র না জেনেই রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে পারেন। আগেই বলেছি, কুষ্টিয়া জেলাজুড়েই বিরাজ করে অন্যরকম এক আবেশ। যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি বড় জ্বলজ্বলে। কুষ্টিয়া শহরের গড়াই পাড়ের রেনউইক এন্ড যজ্ঞেশ্বর, শহরের মিলপাড়ায় ‘টেগর লজ’ নামের রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত দোতলা ভবন আর শিলাইদহের কুঠিবাড়ির বাইরেও রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন গড়াই নদীর স্রোতধারা ও চরের বালুকারাশিতে মিশে, রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন প্রতিটি সড়কে, ফসলি সবুজে, গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র, হতাশা, অপ্রাপ্তি, বঞ্চনার ভেতরও। বলা বাহুল্য, কুষ্টিয়ার শিলাইদহের গ্রামীন কৃষক প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা রবীন্দ্রনাথকে পরিণত করেছিল দৃঢ়চেতা এক উন্নয়ন ব্যক্তিত্বে। রবীন্দ্রনাথের যে উন্নয়ন চিন্তা আজকের দিনে আমাদের অর্থনীতি, ক্ষুদ্রঋণ, দারিদ্র্যমুক্তি, বিশ্বায়ণের মানবিকীকরণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রচিন্তা ও বিশ্বের উন্নয়নভাবনার এক বড় নির্দেশক।

Reneta

অন্য একটি প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে এ কথাটি সঙ্গতভাবেই বলতে চাই, রবীন্দ্রনাথ নিজে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন কিন্তু তিনি তার নোবেলের সমুদয় অর্থ, জীবনের স্বপ্ন ও গ্রামীন উন্নয়নবাঞ্ছা বিনিয়োগ করে পতিসরে যে সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা-ই বাংলাদেশের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তির প্রথম রোপিত বীজ। যদিও প্রফেসর ইউনূসের কোন গ্রন্থে কিংবা জবানীতে রবীন্দ্রনাথের সমবায় চিন্তা, গ্রামীন জনগোষ্ঠী তথা প্রান্তিক মানুষের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ধারণা সম্বন্ধে কোনো কিছু উল্লেখ করেছেন বলে শুনিনি বা দেখিনি। এমনকি রবীন্দ্রনাথের সমবায় চিন্তার নির্যাস নিয়ে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষে বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের নতুন গোড়াপত্তন হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর আখতার হামিদ খানের হাত দিয়ে। প্রফেসর ইউনূস আশির দশকে কুমিল্লার যে অঞ্চলে সমবায় আন্দোলন সাফল্যে রূপ নেয় সে অঞ্চলগুলিতে গিয়ে দিনের পর দিন থেকে ধারণা ও উপাত্ত সংগ্রহ করেন, কিন্তু তার কোনো লেখা ও জবানীতে পথিকৃত বা পূর্বসুরি হিসেবে তার কথাও কথাও উল্লেখ করেননি। অবশ্য, আজকের লেখাটিতে এটি প্রয়োজনীয় কিছু নয়।

রবীন্দ্রনাথকে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং সেই স্মৃতি মনে রেখেছেন এমন একজন মানুষের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। ২০০৬ সালের কথা। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীকে সামনে রেখে এপ্রিল মাসে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসর কাচারিবাড়ি একবারে সফর করেছিলাম। দেশের প্রখ্যাত উন্নয়ন সাংবাদিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’ এর পরিচালক শাইখ সিরাজের অনুষ্ঠান নির্মাণের গবেষণাকর্মী হিসেবে সেবার আমার রবীন্দ্র উপলব্ধির নতুন নতুন জায়গায় প্রথম টোকা পড়লো। তখন গোধুলি বেলা। বৈশাখের খরতাপ কমেছে, বিকেলের আলো রবীন্দ্রনাথের পতিসর কাচারিবাড়ির দেউড়ির ভেতর দিয়ে উঠোন ও বারান্দা ছুঁয়েছে। স্থানীয় একজন ডেকে নিয়ে এলেন এলাকার প্রবীণতম ব্যক্তি ফয়েজউদ্দিন প্রমাণিককে। তিনিই রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন। ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিকের বাবা রূপচাঁদ প্রামাণিক এলাকার বেশ নামযশঅলা লোক ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গে প্রথম কলের লাঙল এনেছিলেন পতিসরে। রূপচাঁদ প্রামাণিক প্রথম চালিয়েছিলেন ওই কলের লাঙলটি। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখছি ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিককে। বললেন, ‘আমি একবারই জমিদার বাবুকে দেখেছিলাম। আমরা তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। ঠাকুর এসে আত্রাই হয়ে নাগর নদী দিয়ে পতিসরের ঘাটে এসে নামলেন। আমরা স্কুলের শিশুরা সারি ধরে দাঁড়ানো। জমিদার বাবু আমাদের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে গেলেন। আমার যতদূর মনে হয়, তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলাম।’ আহা আমরা যেন চোখে দেখতে পেলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ্র চেহারা। তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করছেন ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিক। গল্পটি শুনে বিশাল মহীরুহ মনে হলো ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিককে। যা হোক ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিক আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তার সেদিনের কথাগুলি খুব মনে পড়ে। তিনি একটিবারের জন্যও রবীন্দ্রনাথকে সুমহান সাহিত্যিক হিসেবে চিনতে চাননি। তিনি স্বচক্ষে রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন একজন প্রজাদরদী জমিদার হিসেবে। ফয়েজউদ্দিন বাবা রূপচাঁদ প্রামাণিকের কাছে শুনেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ পতিসর থেকে বিদায় নেবার দিন অবতারণা ঘটেছিল এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের। প্রজারা সব আবেগঘন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলছেন, জমিদার বাবু, পরজনমে আমাদের বিশ্বাস নেই। তারপরও ভগবান যদি আমাদেরকে আবার পৃথিবীতে পাঠান, তাহলে যেন আপনার প্রজা করে পাঠান। আমরা বারবার আপনার প্রজা হয়েই পৃথিবীতে থাকতে চাই।’

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাচারিবাড়িতেও রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত তৈজসপত্র, চিত্রা ও সোনারতরির বেশকিছু কবিতা রচনার সেই ক্ষেত্র কাচারিবাড়ির পূর্বমুখি জানালা, বিশাল বারান্দায় দাঁড়ালে এখনও হঠাৎ যেন পৃথিবী পিছিয়ে যায় এক’শ বছর। পতিসরের ফয়েজউদ্দিন প্রামাণিকের মতো রবীন্দ্রনাথকে স্বচক্ষে না দেখলেও রবীন্দ্রনাথকে স্বপ্ন কল্পনা ও কাজে প্রতিদিনই দেখতে পান প্রফেসর নাছিমউদ্দিন মালিথা। যার বাড়ি শাহজাদপুরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণের পর রবীন্দ্রচিন্তায় পার করেন প্রতিটি সময়। এই মানুষগুলোর রবীন্দ্র বীক্ষণ অন্যরকম। কাব্য মগ্নতায় রবীন্দ্রনাথ কখনো যে বেখেয়ালি হয়ে যাননি, বরং মানবজগতের বাস্তব রহস্য উন্মোচন আর উন্নয়নের সেতুবন্ধন রচনায় অবিরত থেকেছেন তা গভীর দৃষ্টিতে ধরতে পারেন রবীন্দ্রনাথের বিচরণ ক্ষেত্রের পাশের মানুষেরা। রবীন্দ্রনাথে যাদের সাহস, রবীন্দ্রনাথে যাদের জীবনশিক্ষা। এক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বড় দুই রবীন্দ্র গবেষকই কুষ্টিয়ার। ড. প্রফেসর আনোয়ারুল করীম ও ড. প্রফেসর আবুল আহসান চৌধুরী। প্রফেসর আনোয়ারুল করীম বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে সুদীর্ঘ গবেষণা করেছেন। যেটি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হওয়ায় এক্ষেত্রের অনুসন্ধানকারী ও অনুরাগীরা উপকৃত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রফেসর আবুল আহসান চৌধুরীল কাজের পরিধি ব্যাপক বিস্তৃত। তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের গভীর তথ্য তুলে ধরেছেন তার বহু সংখ্যক গবেষণায়। যা বাংলাদেশে ও পশ্চিমবাংলায় ব্যাপকভাবে আদৃত।  

রবীন্দ্রনাথের যথার্থতা আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক জীবনে অনেক বেশি প্রমাণিত এখন। আমাদের দেশের অর্থনীতি চিন্তায় রবীন্দ্রনাথ এখন এক অপরিহার্য পথ প্রদর্শক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যাংকিং খাত, সমবায়, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি ঋণ এবং সুশাসনের অনেক ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তাকে কাজে লাগানোর প্রয়াসী। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার বহু কাজ। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার রবীন্দ্রনাথের আর্থ সামাজিক ভাবনা বিষয়ক রচনাসংকলন ‘তব ভুবনে তব ভবনে’।

আজ এদেশে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে গবেষক ও প্রাজ্ঞজনের মাঝে আলোচিত হতে শুনি, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংগ্রামের ফসল। আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ তাদের মাটিতে জন্ম নেয়া এক সন্তান। পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরন জীবন যাপন ও চিন্তাচেতনায় রবীন্দ্র প্রভাব তেমনটা নেই, যতটা আমাদের আছে। আমাদের গ্রামীন জীবনের পরতে পরতে রবীন্দ্রনাথের স্বয়ং উপস্থিতি টের পাই। বারবার বলতে চাই, কাব্যে না থাক, গানে না থাক, নাটকে না থাক, চিত্রকর্মে না থাক দরিদ্রমুক্তিতে, জীবন-যাপনে, চিত্তের উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাদেশে যতটা প্রাসঙ্গিক ততখানি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না পশ্চিমবাংলায়।

২০১১ সালের মে মাসে আমার পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন যাবার সুযোগ হয়েছিল। কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের সঙ্গী হিসেবে শ্রীনিকেতনকে উদ্দেশ্য করে যাওয়া। কলকাতার দমদম নেতাজি সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে নেমে গাড়িতে ছুটলাম শ্রীনিকেতনের উদ্দেশ্যে। বর্ধমান, শক্তিগড়, বোলপুর, বীরভূম হয়ে শান্তিনিকেতন। বিশাল রবীন্দ্র সাম্রাজ্যে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মের সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া আমাদেরকে অনেকটা অর্বাচীন ভেবেই যেন উড়িয়ে দিলেন অনেকে। কেউ বললেন, এখানে কোনো ছবি তোলা যাবে না। কেউ বললেন, এখানে কাজ করতে হলে টাকা ছাড়তে হবে। নানান ফিরিস্তি। খোঁজ-খবর করলাম দুয়েকজন গবেষকের। শান্তিনিকেতনের কৃষি অর্থনীতি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ড. দেবাশীষ সরকারের সঙ্গে দেখা হলো। প্রাজ্ঞ মানুষ। রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের নানাদিক নিয়ে বহু গবেষণা তাঁর। অবাক ব্যাপার হলো, রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন চিন্তার যে ভিত্তিভূমি সেই বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের প্রসঙ্গই তাদের কাজ ও গবেষণার মধ্যে খুবই সীমিত।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত কৃষি, শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের মডেল ‘শ্রীনিকেতন’ প্রতিষ্ঠার পেছনের স্বপ্নই রোপিত হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। সেকথা তারা চর্চা করেন না। অবশ্য, বিষয়টি ইতিহাসের আড়লে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করছেন আমাদের গবেষকরা। প্রফেসর সনৎ কুমার সাহার প্রবন্ধ পড়ে একসময় শ্রীনিকেতনের যে ছবি ধরতে পেরেছিলাম, ২০১১ সালে তা স্বচক্ষে দেখি। বারবার মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গে কৃষি ও সমাজ জীবনের যে সংকটগুলো দেখেছেন সেগুলো দূর করার জন্যই গ্রামোন্নয়নের ওই মডেল দাঁড় করিয়েছেন। ওই মডেল যদি ছড়িয়ে দেয়া যেতো তাহলে সত্যিই পাল্টে যেতে বাংলাদেশ। কিন্তু সামগ্রিক চিন্তাগুলোর রস ও মধু ব্যক্তিবিশেষে নিজস্ব ব্যবসা, সামাজিক ব্যবসা, পুরস্কার, পুঁজি-প্রতিপত্তি উপার্জনে ব্যবহার করছেন। যা রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টি ও স্বপ্নকে ম্লান করতে পারছে না বটে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথেরে চিন্তাকে ব্যবহার করে তা সামগ্রিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে যেভাবে ব্যবহার করা যায়, তা এখনও হয়ে উঠছে না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার আলোকে কৃষি ঋণ ব্যবস্থা, যুব উন্নয়ন, গ্রাম্য শিক্ষা, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি, সমিতি ইত্যাদি কাজ করছে সীমিত পরিসরে। কোন কোন ক্ষেত্রে রবীন্দ্রচিন্তা পরিমার্জন করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের এখানে মানুষের প্রতিদিনের জীবন ও কাজে রবীন্দ্রপ্রভাব রয়েছে কিন্তু সরকারিভাবে ততোখানি গ্রহণ করা হয়নি। রাজনৈতিক চিন্তায়, সংগঠনে, শিক্ষায়, প্রতিষ্ঠানে সর্বোপরি জীবন ব্যবস্থার উত্তরণে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে আলোর পথযাত্রী। আর একথা উল্লেখের অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশবাসীর রবীন্দ্রভাগ্য পশ্চিমবঙ্গবাসীর চেয়ে প্রসারিত। আমাদের এখানে ঘটেছে উন্নয়নমনষ্ক এক দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের জন্ম। যে শক্তির ছিটেফোটা পশ্চিমবঙ্গ ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। আনুষ্ঠানিকতানির্ভর রবীন্দ্রভাবনার পথ থেকে সরে আসতে হবে আমাদের। রবীন্দ্রনাথকে করে তুলতে হবে প্রাত্যহিকের, প্রতিমুহূর্তের।

আদিত্য শাহীন; বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: রবীন্দ্ররবীন্দ্রনাথরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

জাঙ্ক ফুড কি সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর, যা বলছে গবেষণা

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬

২০২৬ সালের হজের ভিসা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬

হার্ট অ্যাটাক করে সিসিইউতে শহীদ মীর মুগ্ধর বাবা

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬

‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান ৬’-এ ফিরছেন জনি ডেপ!

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬

ভারতের কাছে হেরে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: মীর মাসরুর জামান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT