শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আলোচনায় এসেছে আর একটি ঘটনা। অবশ্য লাঞ্ছিত শিক্ষক শ্যামল কান্তি’র কাহিনী মনে রেখেছেন ক’জন? আমরা কি জানি, তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন? তবে, আমরা এটুকু নিশ্চিত হয়েছি, সমালোচিত সাংসদ সেলিম ওসমান আছেন বহাল তবিয়তে। তার কোন শাস্তি হয়নি।
গত ৫ জুন প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় এক নারীকে। ২ সন্তানের জননী তিনি। সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এমন ঘটনা আমাদের কাছে নতুন নয়। বরং স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনা একটু ব্যতিক্রম। এখানের ঘটনাটি ঘটেছে একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যা। আরও একটু ব্যতিক্রম হচ্ছে, নিহত মাহমুদা খাতুন মিতু একজন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা’র স্ত্রী।
পুলিশের সেই কর্মকর্তাকে প্রভাবশালী বলার জন্যে যথেষ্ট কারণ আছে। ২৪তম বিসিএস ক্যাডার বাবুল আক্তার। পুলিশে যোগ দেন ২০০৫ সালে। ১১ বছরের চাকরি জীবনে তিনি পোস্টিং পেয়েছেন, ‘ক্রীম’ জায়গা গুলোতে। সারদা পুলিশ একাডেমির প্রশিক্ষণ শেষে র্যাব-২-এ কর্মজীবন শুরু। ২০০৮ সালের মার্চে র্যাব থেকে বদলি হয়ে চট্রগ্রাম মেট্রাপলিটন পুলিশ (সিএমপি)-তে। এরপর কোতোয়ালী জোন, হাটহাজারী সার্কেল, কক্সবাজার জেলা ঘুরে আবারও সিএমপিতে। এরমধ্যে একাধিকবার বিদেশ যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তার। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দিয়ে দক্ষিণ সুদান গিয়েছিলেন তিনি। গত বছর প্রায় ২ মাসের জন্য প্রশিক্ষণে যান চীনে। 
দীর্ঘ ১১ বছরের চাকুরি জীবনে তার সাসপেন্ড কিংবা পানিশমেন্ট পোস্টিং হয়নি একবারও। বরং প্রাপ্তির খাতায় রয়েছে, পুলিশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল-বিপিএম (সাহসিকতা), দু’বার প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম), ১ বার আইজি ব্যাজ ও ৪ বার চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার নির্বাচিত হয়েছেন বাবুল আক্তার। পুলিশ বিভাগে এমন ভাগ্যবান কর্মকর্তা খুব কমই আছেন! খুঁটির জোর বেশ শক্ত না হলে পুলিশের চাকরিতে এমন অবস্থান সৃষ্টি আদৌ সম্ভব নয়।
সম্প্রতি পদোন্নতি দিয়ে, এসপি বাবুলকে বদলী করা হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স-এ। একারণে তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। পরিবারকে নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত করার আগেই গত ৫ জুন আকস্মিকভাবে খুন হন, তার স্ত্রী মিতু। অন্যান্য হত্যার পর যে ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়, আমরা ধারণা করেছিলাম এই ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। অবলম্বন করা হবে আধুনিক কৌশল। অপরাধী ধরার মাধ্যমে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।
ঘটনার ১ দিন পর আমরা কি দেখলাম? আমরা দেখলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘যে সমস্ত হত্যার ঘটনা ঘটছে সবই টার্গেট কিলিং। আমেরিকা লন্ডনেও এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে। দেশে ব্যবসা চলছে, রাস্তাঘাট ঠিকমতো চলছে, মানুষ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সব ডাটাই পজেটিভ রয়েছে।’ ৬ জুন সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কথা জানান।
বিবিসি অনলাইনে ‘হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলি সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর’ শিরোনামে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চলমান নাশকতা বা খুনের ঘটনার সাথে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত করেছেন। বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্তের কথা জানান তিনি।
মিতু হত্যাকাণ্ড। পর্যবেক্ষণে জানা যায়, বাবুল পুত্র মাহমুদ আক্তার মাহিরকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যেতেন এক কনস্টেবল। যার নাম সাদ্দাম। বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু বাইরে যেতেন কম। ২ সন্তানকে নিয়ে মিতু নগরীর জিইসি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। তার বাসার সামনে নিরাপত্তাও থাকতো। মাহিরকে নিয়মিত কনস্টেবল সাদ্দাম স্কুল বাসে তুলে দিতেন। কিন্তু ওই দিন অর্থাৎ ৫ জুন কনস্টেবল সাদ্দাম আসেনি। তাই মিতু ছেলে মাহিরকে নিয়ে সকালে বের হয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সাদ্দাম সেদিন কেন আসেনি? সাদ্দাম যে সেদিন আসবে না, সেই খবর কে কে জানতো?
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ জানান, সিসিটিভি ফুটেজে চেহারা স্পষ্ট বুঝা না গেলেও এটি যে কিলিং মিশন সেটি বুঝা যাচ্ছে। পরিতোষ ঘোষ বলেন, হত্যার ধরণ দেখে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা আগে থেকেই ঘটনাস্থল রেকি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিকল্পনা কে কারা করলো? কেন করলো? সর্ষের মধ্যে-ই কোথাও ভূত লুকিয়ে নেই তো!
গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার প্রটোকল অফিসার ও ইউএসএইড-এর কর্মকর্তা জুলহাস ও তার বন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার পর আততায়ীরা ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে বলতে চলে যায়। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। হত্যাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত এবং গ্রেফতারের দাবি ওঠে। পুলিশ জানায়, সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ স্পষ্ট না হওয়ায়, খুনিদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। মিতু হত্যার পরও পুলিশের একই বক্তব্য। অর্থাৎ দেশের কোনো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরিস্কার নয়। তাহলে, অনর্থক এসব ক্যামেরা লাগিয়ে কাদের চোখে ধুলো দেয়া হচ্ছে? এটাও কি এক ধরণের প্রহসন নয়?
ঝিনাইদহের শৈলকুপার মদনপুর গ্রামে ১৯৭৫ সালে জন্ম নেয়া বাবুল আক্তার অতি অল্প সময়ে খ্যাতির শিখরে উঠেছেন। ২০০৬ সালে রাজধানীর পুরান ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ হাজার জাল সনদ আটক করেন তিনি। এছাড়াও ২০০৭ সালে নরসিংদীর ভেলানগরে ৬ খুনের রহস্য উন্মোচনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাশাপাশি এটাও অনস্বীকার্য যে, প্রভাবশালী বিশেষ মহলের আশীর্বাদপুষ্ট তিনি।
সহজ কথায়, তিনি ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তার স্ত্রী খুন হয়, প্রকাশ্যে। খুনিদের চিহ্নিত করা যায় না। গ্রেফতার করা হয় না। দেশে আইন আছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। সেই বাহিনীর ঊর্ধতন কর্মকর্তা’র দশা যখন বেহাল, তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দশা কি?
শ্যামল কান্তি ভক্ত একজন সাধারণ মানুষ। তাকে লাঞ্ছনা করে পার পাওয়া কঠিন কিছু নয়। তবুও, আমরা সেই লাঞ্ছনা’র প্রতিবাদ করেছি। বিচার চেয়েছি। আমরা প্রতিটি অন্যায়ের বিচার চাই। এই চাওয়াতে আমার সংকোচ নেই। কার্পণ্য নেই। কিন্তু একটি’র-ও যখন বিচার হয় না, তখন নিজেকে শান্তণা দেয়ার ভাষা খুঁজে পাই না। গত ২৫ এপ্রিল, ১৩ মে কিংবা ৫ জুন। ঘটনা গুলো কী সবই বিছিন্ন? এগুলো কী একই সূত্রে গাঁথা? কার কাছে চাইবো এই প্রশ্নের উত্তর? এসব ঘটনা গুলো কী অমীমাংসিত-ই রয়ে যাবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








