সিনেমা হিট করতে প্রচার-প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই। একটা সময় নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই ছিলো উৎসবের আমেজ! দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামে মাইকিং করে জানিয়ে দেয়া হতো নতুন সিনেমা আসার খবর। দোকানে দোকানে সাঁটানো থাকতো পোস্টার। সেই দিন নেই আর নেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় অনলাইনের বদৌলতে এখন সেসব জায়গা দখল করেছে মোশন পোস্টার, টিজার, ট্রেলার-এর মতো প্রচারণার এমন অনেক অনুষঙ্গ!
ছবির প্রচার প্রচারণায় অনলাইন এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো সিনেমা মুক্তির আগে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ ইউটিউবে নানা কন্টেন্ট তৈরীর হিড়িক পড়ে। যেনো মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবিটি নিয়ে দর্শক আগ্রহী হন। কিন্তু আদতেও কি অনলাইনের এসব প্রচারণায় দর্শকের মন গলে? তারা কি এসব প্রচারণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে প্রেক্ষাগৃহে যান? তাহলে চলতি বছরে বিভিন্ন ছবি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় যে প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে, সে তুলনায় দর্শক কেন প্রেক্ষাগৃহে আসেননি? সারা বছরজুড়ে মুক্তি পাওয়া দেশিয় ৪৫টি ছবির মধ্যে কেন মাত্র একটি ছবি ব্যবসাসফল?
একটা সময় প্রিয় তারকার অভিনীত কোনো ছবি দেখতে দর্শকের ছিলো উন্মাদনা! প্রেক্ষাগৃহ থাকতো হাউজফুল। কিন্তু সেই উন্মাদনা কি মানুষের মধ্যে এখনো আছে? বর্তমানে সোশাল মিডিয়ায় কোনো তারকা অভিনেতা, অভিনেত্রী কিংবা নির্মাতার লাখ লাখ ফলোয়ার দেখা যায়। ছবি মুক্তির আগে প্রচারণাতেও যুক্ত হন বিশাল সংখ্যক ভক্তকূল। কিন্তু সিনেমা হলের চিত্র তবে কেন ‘দর্শক শুন্য’?
এর সর্বশেষ উদাহরণ ‘গহীনের গান’ নামের চলচ্চিত্রটি। যা মুক্তির আগে অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়। অনলাইনে ছবির নির্মাতা ও কলাকুশলীরা ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও তাদের নির্মিত ছবিটি দেখতে কার্যত দর্শক পেয়েছেন হাতেগোনা! হল মালিকরা বলছেন, প্রতিটি শোতে যে দর্শক ছবিটি দেখেছেন তা দিয়ে একটা শো চালানোরই পয়সা উঠেনি, ‘হাউজফুল’ তো বহু দূরের ব্যাপার!
শুধু ‘গহীনের গান’ নয়, প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির খাতায় উল্লেখ আছে চলতি বছরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে নতুন ছবি মুক্তির জরিপ! ২০১৯ সালে দেশিয় ছবি মুক্তির সংখ্যা ৪৫টি, এরমধ্যে দুটি যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। এছাড়া সাফটা চুক্তির আওতায় ১২ মাসে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় আরো দশটি ছবি। সব মিলিয়ে ছবির সংখ্যা মোট ৫৫টি ছবি। কিন্তু ‘পাসওয়ার্ড’ ছাড়া আর কোনো ছবিই নির্মাণ ব্যয়ের কাছাকাছিই তুলতে পারেনি, ব্যবসা তো বহু দূর। বছর শেষে সিনেমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন বা ফেসবুকে সিনেমা নিয়ে যতোই তর্জন-গর্জন দেখা গেছে, প্রেক্ষাগৃহ ছিল ঠিক ততটাই নির্জন!
সিনেমা প্রেমীরাও বলছেন, ফেসবুকে কারও কারও ভক্তের সংখ্য কয়েক লক্ষাধিক অথচ সিনেমা হলে তাদের ছবি দেখতে হাজার দর্শকও নেই! নিজস্ব ভক্ত অনুরাগীদেরই কেন সিনেমা হলে আনা সম্ভব হচ্ছে না, এটা তারকাদেরও বোঝা উচিত!
অনলাইনে পাহাড়সম জনপ্রিয়তার মধ্যে অনেক নায়ক-নায়িকার ছবি ফ্লপ! দর্শক নেই সিনেমা হলে। ছবি মুক্তির আগে ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও দর্শকের আগ্রহ জন্মে না। সাধারণ দর্শকদের কথা বাদ দিলেও যারা ফেসবুকে তারকাদে ফলো করেন, তারাও সিনেমা হলে গিয়ে তাদের ছবি দেখেন না! কিন্তু কেন? একজন ফলোয়ার নিশ্চয়ই তার প্রিয় তারকার প্রতি আগ্রহ রয়েছে বলেই তাকে ফলো করেন! তাহলে কেন সেই প্রিয় তারকার সৃষ্টিকর্ম দেখতে আগ্রহ বোধ করেন না!
নায়িকাদের মধ্যে অনলাইনে অনেকেই আছেন, যাদের এতো পরিমাণ ভক্ত-অনুরাগী রয়েছেন তাতে করে তার কুড়ি শতাংশ যদি সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখত তাহলে বাজেটের তিনগুণ অর্থ প্রযোজক ফেরত পেতেন! এমন ছকও কষছেন কেউ কেউ।
ছোট্ট উদাহরণ টেনে বলতে গেলে, বিদ্যা সিনহা মিমের ফ্যানপেজ ও ফেসবুক মিলিয়ে অনুসারী এই মুহূর্তে প্রায় ৩০ লাখ। তার সিনেমা ‘দাগ হৃদয়ে’ মুক্তি পেয়েছে চলতি বছর। মিমের পেজে যুক্ত থাকা ৯০ ভাগ ফলোয়ারই বাংলাদেশে বসবাস করেন। এই ৩০ লাখ অনুসারীর ২০ লাখ যদি তার অভিনীত সিনেমা দেখতে হলে যেতেন তাহলে একবার ভাবুন সেই ছবির অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত! বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, বিদ্যা সিনহা মিম অভিনীত ওই সিনেমার বাজেট ছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো! তার ভক্তের মধ্যে ২০ লাখ মানুষও যদি সিনেমা দেখতে হলে যেতেন, তাহলে প্রতি টিকিটের দাম গড়ে ৫০ টাকা করে সেই ছবির টিকিট বিক্রি হতো বাজেটের তুলনায় প্রায় ১০ গুন বেশি! ভক্তের মধ্যে যদি ২০ শতাংশ সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতেন তাহলে সিনেমাটি সাফল্য পেত। এই ছবির প্রযোজক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করে পেয়েছে মাত্র ১০ লাখ টাকার মতো!
বছর শেষে এমন ছক কষার বিষয়টি খুব সরলীকরণ মনে হলেও একজন তারকার মাত্র ২০ শতাংশ ভক্তও যদি সিনেমা হলে উপস্থিত হতেন, তাহলে বদলে যেতে পারত বাংলাদেশি সিনে ইন্ডাস্ট্রির ভাগ্য! কিন্তু এটা কেবলই পরিসংখ্যান। আদতে এরকম কিছুই ঘটার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে নেই। তবে সেই সঙ্গে সঙ্গে একজন তারকাকে এই সত্যটাও আবিষ্কার করার সময় এসেছে, কেন তাকে অনলাইনে ফলো করা ভক্তটি তার অভিনীত সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখেন না? আর সেটা খুঁজে পেলেই অন্তত বাংলা ছবির ‘দর্শক খরা’র অভিশাপ কিছুটা হলেও ঘুচবে।








