চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৭২ ঘণ্টা পার হলেই কি ধর্ষণ বৈধ?

নিম্ন আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। একটি ধর্ষণ মামলার রায়ে আদালত যে নির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সেটি ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করবে বলেই সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা। ঔপনিবেশিক মান্ধাতা আমলের আইনে এখনও এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার চলছে, যেগুলো তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের দুবৃর্ত্তদের শাস্তি না হওয়া নিশ্চিত করতে।

এই মামলায় ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ। সেই রাতে রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ডেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। এ মামলায় ঐ বছরের ৮ জুন সাফাতসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এর পরের মাসে ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই তারিখে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২ জনকে আদালতে হাজির করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন: ঘটনার ৩৮ দিন পর ধর্ষণের অভিযোগ মেডিকেল প্রতিবেদনকে সমর্থন করে না। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ অহেতুক আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে। এই মামলায় বিচারকাজে ৯৩ কার্যদিবসে প্রচুর কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এ সময়ে বিচারাধীন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন আদালত।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বিশিষ্ট নারী অধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল একটি দৈনিকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেন: রায়টি অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক। এটি এই সময়কার বহুল আলোচিত একটি মামলাই শুধু নয়, কলঙ্কিত মামলাগুলোর মধ্যে একটি। যেভাবে এ মামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে, পরবর্তী কালে তার যে বিবরণ আমরা পেয়েছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টালবাহানা, ভুক্তভোগীদের হয়রানি, চিকিৎসকদের ভূমিকা, সর্বোপরি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রভাব—নানা ঘটনা আছে। তাতে এ মামলার প্রথম থেকেই সবার মনে এ শঙ্কা তৈরি করেছিল যে, এ ধরনেরই একটি রায় আসতে পারে। আমাদের সেই শঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে এমন একটি রায় পাওয়া গেল, যা আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি এখনও যতটুকু আস্থা রাখার চেষ্টা করি আমরা, তার ওপর কঠিন আঘাত হানল। এ রায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি বলেন: ফৌজদারি অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো সময়সীমা আমাদের প্রচলিত আইনব্যবস্থায় বেঁধে দেয়া নেই। বিচারকের এ নির্দেশনা সম্পূর্ণ বেআইনি। ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ধর্ষণের আলামত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়, সে কারণে এই সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা যত উন্নত প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছি, অপরাধ নির্ণয়ে নানা সুযোগ আমাদের সামনে উন্মুক্ত হচ্ছে। ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা তেমন একটি উপায়। অপরাধ যাতে প্রমাণ করা যায়, সে বিষয়ের ওপর জোর না দিয়ে বিচারক ৭২ ঘণ্টার পরে মামলা না নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে ধর্ষণের শিকার মানুষের বিচার পাওয়ার পথে কঠিন অন্তরায় সৃষ্টি করলেন। আর একটি কথা, ধর্ষক বা ধর্ষকেরা ভুক্তভোগীকে ৭২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখতে পারলেই নিজেদের বিচারের আওতামুক্ত থাকা নিশ্চিত করে নিতে পারল। আমার প্রশ্ন, মাননীয় আদালত একবারও এ মামলার বিচার করতে গিয়ে ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার দেয়ার কথা চিন্তা করে বিচারকার্য সমাধা করলেন কি? আদালতের এ নির্দেশনা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনার মূলেই কুঠারাঘাত করেছে। এ নির্দেশনার ফলে সমগ্র বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, নতুন করে আস্থার সংকট ঘটানো হয়েছে। এই আদালত নানা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে অপরাধ করে নিষ্কৃতি পাওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। নারী নির্যাতনের যে প্রকট রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আদালতের এ পর্যবেক্ষণ তা বহুমাত্রায় উৎসাহিত করলেন।

এই রায় নাগরিক সমাজকেও ক্ষুদ্ধ করে তুলেছে। সচেতন নাগরিকরা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে এই রায়ের বিরুদ্ধে। ৭২ ঘণ্টা পার হলে ধর্ষণ ন্যায্য?,’ ‘চরিত্রের প্রশ্নে বিচারহীন, আর কত দিন’ এ রকম নানান প্ল্যাকার্ড আর স্লোগানে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মুখরিত ছিল রাজধানীর শাহবাগ। গতকাল মধ্যরাতে ঢাকার শাহবাগ থেকে ‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ শুরু হয়। আদালতের এই নির্দেশনার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নারী অধিকারকর্মী, পেশাজীবী ও শিল্পীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারী-পুরুষেরা পদযাত্রায় অংশ নেন। দাবি তোলেন, ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্যপ্রমাণ আইনের ১৫৫(৪) ধারা বাতিলের।

আমরা মনে করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ যোগ রয়েছে। ঔপনিবেশিক আইনও তার কালাকানুন এই একবিংশ শতাব্দিতে অনেকটাই অকার্যকর। পৃথিবীর দেশে দেশে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অনেক পুরনো আইনের বদল হয়েছে। সভ্যরাষ্ট্রগুলো প্রতিদিনই আইনের নতুন নতুন ধারা প্রয়োগ করে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অব্যাহত রেখেছে। আমাদের দেশও এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির দিকে। এই উন্নতি শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি হলে সমাজ অনগ্ররই থেকে যাবে। আর অনগ্রসর সমাজের আর্থিক অগ্রগতি সমাজকে পিছিয়ে দেয়। আমরা আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এর আগেও সম্প্রতি রিমান্ডসহ নানা বিষয়ে নিম্ন আদালতের বিচারকদের উচ্চ আদালতে জবাবদিহী করতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রেও তেমন প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে আমাদের আশাবাদ। নতুবা যে তিমিরের সমাজ সে তিমিরেই রয়ে যাবে। উন্নয়ন হবে মরিচীকার মত ঝরে যাওয়া উন্নয়ন। সেটা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

বিজ্ঞাপন