চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হিসপানীওয়ালাদের দেশে

সরকারি এক বিশেষ ডিক্রি অনুযায়ী মাত্র এক সপ্তাহের প্রস্তুতির মধ্যেই সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গড়া হাজারেরও অধিক জনবলের এক সম্মিলিত কন্টিনজেন্ট এর অংশ হিসেবে ইউএস আর্মি নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আপহোল্ড ডেমোক্রেসি’তে অংশ নেয়ার জন্য ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে, পশ্চিম ভারতীয় ক্যারিবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্র ‘ল্যান্ড অব হিসপানীওয়ালা’ হাইতিতে আসি। দেশটির রাজধানী ‘পোর্ট-অ-প্রিন্স’ এ আমেরিকার সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও শহরের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত করা হয়। বলাই বাহুল্য হাইতি’তে তখন প্রায় যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। সেখানে আমেরিকার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীই ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম। শহরের অভিজাত ও উন্নত যোগাযোগ সমৃদ্ধ এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর দায়িত্ব আমেরিকান বাহিনী তাদের হাতে রেখে রাজধানীর অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে যে ‘ডাউন টাউন’ বা পুরনো শহর ও বস্তি এলাকা ছিল সেখানেই আমাদের নিয়োজিত করা হয়। অধিক ঘনবসতি, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর বস্তি এলাকায় আমাদের দায়িত্ব দেয়ায় ব্যাপারটি অনেকের কাছেই মনঃকষ্ট ও কিছুটা অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের দায়িত্বের পরিধিও ছিল বেশী। এজন্য আমেরিকানদের চেয়ে আমাদেরই বেশী কষ্ট করতে হতো। নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য সতর্কতার সর্বোচ্চ দিতে গিয়ে কষ্টের মাত্রাটাও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী। তুলনামূলকভাবে জুনিয়র এবং কমান্ডো যোগ্যতার কারণে ব্যক্তিগত ভাবে আমার উপর যথেষ্ট চাপ যাচ্ছিল। এজন্য এখানে আসার আগে বিদেশ বিভূঁইয়ের রংগিলা স্বপ্ন ইতিমধ্যেই দুঃস্বপ্নে রুপান্তরিত হতে শুরু করেছে। অধিকন্তু সদ্য সংসারী হওয়া মাত্রই বিরহের অনলে পরার অস্বস্তি এবং প্রিয়তমা আর সদ্যজাত পুত্রকে ছেড়ে আসার বেদনা তো ছিলই। তাছাড়া, এখনকার মত তখন তো কোন ইন্টারনেট, ভাইবার, হোয়াটস্ অ্যাপ বা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বলে কিছুই ছিলো না। তার উপর প্রথম একমাস ছিল না টেলিযোগাযোগেরও কোন ব্যবস্থা। চিঠিই ছিলো একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চিঠি লেখা আর প্রাপ্তির অপেক্ষায় পার হয়েছে অনেক প্রহর। ৭ থেকে ১০ দিন এর কমে চিঠি পাওয়া যেতো না। প্রিয়জনের কাছে সকাল বিকেল মিলিয়ে প্রতিদিনই এক এর অধিক চিঠি লেখা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আমরা যারা বেচমেট ছিলাম তাদের মধ্যে প্রত্যহ কে কটা চিঠি লিখলো তা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতাও হচ্ছিল। যদিও এগুলো এখন মনে হলে হাসি পায়।

মাস খানেকের মধ্যে প্রথম টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থা হলো। হাজারের অধিক তীর্থের কাক সেনানীর জন্য প্রথমে মাত্র দুটি কার্ডফোন বুথ লাগানো হলো। প্রথম প্রথম দেশে ফোন করার জন্য প্রতি মিনিট দুই ডলারেরও বেশি গুনতে হতো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে গেলেও তখনো নিয়মিত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা শুরু হয়নি। অনেকেরই দেশ থেকে নিয়ে আসা যতসামান্য হাতেরপাঁচ এর অবশিষ্ট কমে যাওয়ায় ফোনে কথা বলার জন্য অবলম্বন করতে হয়েছে কঠিন রেশনিং এর। তার উপর কথা বলার জন্য খোলা মাঠের মধ্যে এক তাবুতে স্থাপিত ফোন সেটোব্দি পৌছুতে যে দীর্ঘ কিউ হতো, তার বিড়ম্বনা ও অপেক্ষমাণ সকল পদবীর ভুক্তভোগীর সামনেই প্রাইভেসি জলাঞ্জলি দিয়ে প্রিয়জনের সাথে কথা বলার সিস্টেমের কারণে এক সময় কথা বলার স্বাদও মিলিয়ে যাবার উপক্রম হতে লাগলো। তার উপর প্রায়শই লাইন না পাওয়ার বিড়ম্বনা আর পিছন হতে অপেক্ষমাণদের মধুর মধুর বাণী শুনার কথা নাইবা বললাম।
এভাবেই কেটে গেল আরও ক’টা মাস। যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে কোন অঘটন-দুর্ঘটনা ছাড়াই আমাদের দায়িত্বাধীন রাজধানীর ডাউন টাউন এলাকা সমূহে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হওয়ায়, চারিদিকে যথেষ্ট সুনাম ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পরে। আর এলাকাবাসীর সাথেও ‘বাংলা অর্মি’র (স্থানীয়রা আমাদের এ নামেই ডাকতো) একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি হবার সুবাদে পরিস্থিতি ক্রমেই অনুকূলে আসতে থাকে। একই সাথে ভীতি ও শঙ্কার মাত্রাও কমতে শুরু করে। আমেরিকান সেনা নেতৃত্ব ও সদস্যারাও আমাদের এহেনও সাফল্য ও যোগ্যতার উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং তারিফ করতে কার্পণ্য করেনি। এজন্য আমাদের কাজের পরিধিও ক্রমশ: বিস্তৃত হতে লাগলো। উল্লেখ্য, হাইতির তখনকার এই অভিযানিক কার্যক্রম আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল। তবে আরও মাস কয়েক পরে জাতিসংঘ এর অনুমোদন দিলে তখন সব কার্যক্রম জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল। যাহোক, হাইতিতে সেসময় আমেরিকান সশস্ত্রবাহিনী কিংবা ফেডারেল এ্যামিনিস্ট্রেশনের যে ক’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা সেক্রেটারি(মন্ত্রী) সফর করেছিল, প্রায় সবাই নূন্যতম একবার হলেও আমাদের কন্টিনজেন্ট পরিদর্শনে এসেছিলেন। বলাই বাহুল্য, একটা ভোজনও আমাদের এখানে অবশ্যই করতেন। কারণ আমাদের খাবারের সুনাম ইতিমধ্যে আমেরিকানদের কাছে অতীব এক লোভনীয় মেন্যু হিসেবে যথেষ্ট ক্রেজ সৃষ্টি করে ফেলেছিল।

বিজ্ঞাপন

কন্টিনজেন্টের সুনাম ছড়িয়ে যেতে শুরু হওয়ার সুবাদে সে সময় আমাদের কন্টিনজেন্ট, বিশেষ করে সেনা কর্মকর্তারা আমেরিকান এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদ কর্মীদের আগ্রহের লক্ষ্য বস্তু হয়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে হাইতি’তে অবস্থানরত অমেরিকান সশস্ত্রবাহিনীর হাজার পনের সদস্যদের বিনোদনের জন্য তাদের বাহিনীর নিজস্ব রেডিও-টিভি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান ‘এএফআরটিএস’ বা ‘আর্মড ফোর্সেস রেডিও টিভি সার্ভিস’ মোবাইল ষ্টেশন স্থাপন করে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার চালু করেছে। বর্তমানে এ সংগঠনটি কে ‘এএফএন’ বা ‘আর্মড ফোর্সেস নেটওয়ার্ক’ বলা হয়। ‘এএফআরটিএস’ চালুর প্রথম দিকে এর সংবাদ কর্মীরা প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কন্টিনজেন্টের বিভিন্ন অভিযানিক ও সামাজিক কার্যক্রম নিয়ে রিপোর্ট, ডকুন্টেরী বানিয়ে তাদের রেডিও এবং টিভিতে প্রচার করছিল যা আমাদের কাজে উৎসাহ বর্ধক টনিক হিসেবেও কাজ করেছিল।

আমেরিকার বিভিন্ন জাতীয় দিবস বা বিশেষ বিশেষ দিন গুলোতে চমক সৃষ্টির লক্ষ্যে ভিন্ন ধারার অনুষ্ঠান প্রচারে ‘এএফআরটিএস’ কর্মীদের সব সময় আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। আমি একবার বেশ কিছু দিনের জন্য হাইতিতে অবস্থিত আমেরিকান ‘ফোর্সেস হেডকোয়ার্টা’রে সমন্নয়ক বা coord হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস আগত প্রায়, সপ্তাহ খানেক হয়ত বাকী। এই উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে অনেক কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারে দায়িত্ব পালনের সুবাদে বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা তো পেয়েছিলামই। সে সাথে প্রতিদিনই কোন না কোন ফিষ্ট (ঋবধংঃ) বা পার্টি থাকতো যেখানে যোগ দিতে পেরে যথেষ্ট পুলোকিতই হতাম। আর বয়সে তারুণ্যতা থাকায় খাবারের প্রতি অনীহা কমই ছিল। সেই সাথে মিউজিক আর ফলোড বাই ডান্স উপভোগের সুযোগ ছিলো বাড়তি পাওয়া।
এ সময়ে আমাকে ঘিরে অভূতপূর্ব বিরল এক ঘটনা ঘটে যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আর এ ঘটনাকেই ঘিরেই আমার এই লেখা। স্বাধীনতা দিবসকে উপলক্ষ করে সব জায়গায় সবার মাঝেই উৎসবের আমেজ। সে সময় এক দিন সকালে কাজে এসেই মর্নিং ব্রিফ, ফ্রেগো (ঋজঅ(FRAGO-Fragmentary Order) চেক করা, আর অন্য সব রুটিন কাজ/রিপোর্ট শেষ করে ডেস্কটপে আনমনে কি যেন একটা দেখছিলাম যা এখন আর মনে নেই। কিছুক্ষণ বাদেই দেখতে মন্দ না যুবা বয়সী ইউএস আর্মির একজন ফিমেইল প্রাইভেট কি কর্পোরাল তাও মনে করতে পারছি না, আমার নির্ধারিত কিউবিকেল (Cubicle) এর ডেস্ক বা টেবিলের উপর কিছু না বলেই সঠান করে আমার দিকে মুখ করে বসে (আমেরিকান বাহিনী গুলোতে এভাবে বসে পড়াটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু মনে করা হয় না) আমার বসা চেয়ারের পাশের খালি চেয়ারটিতে এক পা রেখে আমাকে বললোঃ
–Yes Major! This is Suzana Perry from AFRTS. Would you mind to spare some time for me? (এই যে মেজর! আমি সুজানা পেরী-‘এএফআরটিএস’ হতে এসেছি। আমাকে কি একটু সময় দেয়া যাবে?)
অনোতি দূরত্বে বসে মুচকি হাসি দিয়ে এই মহিলা সৈনিকের এ আবদার উপেক্ষা করার কোন সুযোগ বা ইচ্ছে কোনটাই আমার তখন হয়নি। বলা যায় একরকম ভালই লেগেছিল। তাই বুঝে – না বুঝেই বলে ফেলিঃ
-Yes Ma’am, it’s my pleasure. (নিশ্চয়ই মেম্, এ তো আমার জন্য আনন্দের)।

বিজ্ঞাপন

এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কথা হলো সুজানার সাথে। আসলে ‘এএফআরটিএস’ সে সময় হাইতিতে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সিলেক্টিব কিছু সদস্যদের উপর এক ধরনের জরিপ করে নির্বাচিতদের নিয়ে পরে আলাদা একটা অনুষ্ঠান করবে বলেই আমার সাথে কথা বলতে এসেছিল। যাহোক, সব কথোপকথন গুলো সহজ করার জন্য বাংলায় তুলে ধরা যৌক্তিক মনে করে এখন হতে সেভাবেই দিচ্ছি। সুজানা বললোঃ
-আমি তোমাকে ৩টি প্রশ্ন করছি, তেমন কঠিন কিছু না। যা মনে হয় তা ই বলতে পারো।
কি না কি প্রশ্ন করে ভেবে একটু অস্থিরতা চেপে বসলো বৈকি। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মিডিয়ায় কথা বলার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনার ব্যপারটিও এসময় মনে এলে অস্থিরতা আরও একটু বেগবান হয়। তবে সব শঙ্কাকে উপেক্ষা করেই তাকে বললাম
– ওকে মেম্, ইউ কেন্ গো এহেড।
এরপর, অফিসের বাইরে এসে এক খোলা জায়গায় প্রশ্ন-পর্ব শুরু হলো। ক্যামেরা অন হবার সাথে সাথেই সুজানা পর পর ৩টি প্রশ্ন ছুড়ে দিলোঃ
প্রশ্ন-১ঃ তোমাকে ১০০ ডলার এর একটা ফোন কার্ড দেয়া হলে কার সাথে কথা বলবে?
প্রশ্ন-২ঃ তোমাকে এ মুহূর্তে ১০০ ডলার দিয়ে দ্রুতই খরচ করতে বলি তাহলে তা দিয়ে তুমি কি করবে?
প্রশ্ন-৩ঃ তোমাকে একটা ফ্রি এয়ার টিকেট দেয়া হলে কোথায় ঘুরতে যাবে?
আমি সব শুনে বলা যায় কোন সময় না নিয়েই সব গুলো প্রশ্নের উত্তরই আমার স্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট করে দিয়ে দেই। প্রশ্নোত্তর গুলো শুনে সুজানা’কে কিছুটা গম্ভীরই মনে হলো। এরপর আরও কিছু টুকটাক কথা শেষে এপর্বের যবোনিকা করে সুজানা কাছাকাছি মাঠের গাছ তলার এক স্থায়ী চেয়ার দেখিয়ে তাতে বসে আরও কথা বলার আগ্রহ জানালে আরও কিছুক্ষণ কথা চলে তার সাথে। তবে এ সময় ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই বেশী কথা হয়।
সুজানা প্রথমেই জানতে চাইলো – ‘আমি কবে বিয়ে করেছি’। যখন জানলো বিয়ের বয়স তখনও বছর গড়ায়নি তখন অনেকটাই আশ্চর্য হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশী সারপ্রাইজ হয়েছিল তখনই – ‘আমার স্ত্রীকে কত দিন ধরে চিনি’ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে। আমি যখন বললাম – ‘বিয়ের আগে আমার স্ত্রী’কে কখনও দেখাই হয়নি’, সুজানা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। সে তো বলেই ফেললো ‘ডোন্ট টেল মি দেট – হাউ কেন ইট বি পসিবল’!
এরপর বলতে থাকলো –
-‘একটা মেয়ে যাকে কখনও দেখোইনি, চিনো না, জানো না – তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার সাহস তোমার হলো কি করে?
-‘আমাদের ধর্ম ও দেশের সামাজিকতায় এটাই স্বাভাবিক। পেরেন্টস্ ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের পছন্দ করা কনের সাথেই আমাদের দেশে সাধারণত বিয়ে হয়ে থাকে’।
আমার এ বক্তব্য শুনে সুজানা’র যে প্রতিক্রিয়া ও ভাবভংগী হয়েছিলো তা দেখে মনে হলো সে অষ্টমাশ্চর্য্য কিছু একটা শুনতে পেলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো যা আমাকে অনেকটাই বিব্রত করে ফেলেছিলো। সে সময় সুজানা যে অনেকটাই ইমোশনাল হয়ে পড়েছে তার সাদা চেহারা অনেকটাই লাল হয়ে যাওয়া দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না আমার। তার দিকেও আমি তাকাতে অস্বস্থিবোধ করছিলাম। এরপর সুজানা বলতে লাগলো:
–Your wife must be very lucky to have you husband, so devoted, so trusted, so caring, inclined…. (তোমার বৌ তো সত্যিই ভাগ্যবান, তোমার মত স্বামী পেয়েছে যে, এত অনুগত, এত আস্থাশীল, এত যত্নশীল, অনুরক্ত….)
এরপর ছবি দেখতে চাইলে নোটবুকে রাখা বৌ-বাচ্চার ছবি এক সাথে দেখেই বলে উঠলো: Oh my God, she is just angle… your wife is really beautiful, you too a lucky guy…. (ওহ আমার ঈশ্বর, সে তো দেখি পরী একটা, তোমার বৌ সত্যিই খুব সুন্দর, তুমিও অনেক সৌভাগ্যবান)

সুজানার মুখে বৌ এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনে যুগোপদ আনন্দিত ও শরমিন্দা দুই’ই হয়েছিলাম। এরপর, সে আবারও বলতে লাগলো:
-জানো মেজর, সারাটা জীবন তোমার মত একজন ‘শুধু বিশ্বস্ত’ মানুষ খোঁজ করে আমি এখন ক্লান্ত। শুধুই মরিচিকার পিছনে ছুটে বেড়ালাম। কখনও কারো মাঝেই আস্থার বিশ্বাসটি পাইনি…আমি কিন্তু সব সময়ই খুব সৎ ছিলাম…।
বলতে বলতে সুজানা একসময় ফুপিয়ে উঠে। চোখের কোণে স্পষ্ট জল পড়তে দেখে একটু ইমোশনাল আমিও হয়ে গিয়েছিলাম বৈকি। সেই সাথে অনেক বিব্রতও। ইতিমধ্যে তার প্রতি কিছুটা মায়াও জন্মে গেছে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই চারদিক তাকালাম এই ভেবে কেউ না আবার দেখে ফেলে। তখন কি না কি ভেবে বসে! কি বলে – কি করে তাকে যে শান্ত করবো বুঝতে পারছিলাম না।

যাহোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজকে সামলে উঠে সুজানা। সরি বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নেয়ারও চেষ্টা করে। তবে আমিই তখন আর স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। বার বারই মনে হচ্ছিল কি বাংলাদেশ আর কি আমেরিকা – সব জায়গায় মেয়েদের আজন্ম আন্তরিক চাওয়ায় কোন পার্থক্য নেই। একটা শক্ত ভরসার ও আস্থার অবলম্বন আমেরিকার মত একটা যান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বেশীরভাগ অবলাদের জন্য সোনার হরিণই রয়ে গেছে। সেখানে অনেক মেয়েরাই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাংসারিক সুখ খুঁজে না পেয়ে যে হতাশা বহন করে বেড়ায় তারই একটা রূপ সেই দিন সুজান’র মাঝে হয়তো ফুটে উঠেছিলো। এগুলো তো আমাদের দেশে অনেকের কাছেই অজানা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)