চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হিরোর ‘হিরো’ হয়ে যাওয়া

একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ রাজনৈতিক দলগুলো দশ হাজারের বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। এই ক্রেতাদের মধ্যে রাজনীতির বাইরের মানুষজনও আছেন। ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা ও পেশাজীবীদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার ইচ্ছার শুরু আগেই হয়েছে। এবার অন্য অনেক সেক্টরে এর প্রভাব পড়েছে জোরেশোরে।

টেলিভিশন নাটক, সিনেমা, সংগীত এ সকল মাধ্যমের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলম। এই হিরো আলমের নাম যে আশরাফুল আলম হোসেন সেটা বিভিন্ন গণমাধ্যমে মগ্ন পাঠক ছাড়া অনেকের কাছেই হয়ত অজানা, তবে হিরো আলম নামটা সবিশেষ পরিচিত-আলোচিত। এই পরিচিতি আগে ছিল অনেকটা হাসিঠাট্টা কিংবা কৌতুকের, এখনও অনেকটাই তেমন। তবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তার সংসদ সদস্য হতে চাওয়ার মনোনয়ন ফরম কেনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার নামে প্রচারিত কথামালা।

হিরো আলমের জীবনটা সংগ্রামের। একেবারে প্রান্তিক পর্যায় থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও দেশবিদেশের বিভিন্ন মাধ্যমের আলোচনায় আসা এই সংগ্রামের সাফল্য স্মারক নিঃসন্দেহে। এক্ষেত্রে তাকে ঠাট্টা করা যায়, কৌতুক করা যায় কিন্তু তাকে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ বগুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের এক যুবক সিডি বিক্রির ব্যবসা থেকে শুরু করে কেবল লাইন সংযোগের ব্যবসা হয়ে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ, অভিনয়, নির্দেশনা সব করেছেন। এমন হয়ত সারাদেশের অনেকেই করেন, কিন্তু ক’জন সফল হন বা কজনইবা আলোচনায় আসেন। হিরো আলম তার ব্যবসাক্ষেত্রে সফল কিনা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও তিনি যে আলোচনার খোরাক হয়েছেন সেটা বলা যায় নিঃসন্দেহে। এই আলোচনাকে স্রেফ নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে সাফল্যের একটা প্রপঞ্চ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

হিরো আলমের বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ পর্যন্ত তার ৫০০ মিউজিক ভিডিও, ৮০ স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা, একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা রয়েছে তার। তিনি নাকি বলিউডের একটি সিনেমাতেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এগুলোর কতখানি সত্য এনিয়ে কখনও ভেবে দেখিনি, খবর নেওয়ারও প্রয়োজন হয়নি। তবে এটা ঠিক ফেসবুকে তার পেজের লাইকদাতার সংখ্যা সোয়া তিন লাখ। বাস্তবতা বিবেচনায় এই সংখ্যাটা ভক্ত-অনুরাগীদের নয়, তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যাও। তবে তাকে নিয়ে যতই কৌতুক করা হোক না কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে না উঠলেও আলোচনার মাঝেই চলে এসেছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন ফরম বিক্রির একটা পর্যায়ে যখন সংবাদ বেরুল হিরো আলম ‘এমপি’ হতে চান, তখন ফেসবুক সহ বিভিন্ন গণমাধ্যম তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। বিভিন্ন মিডিয়ার নানামুখী প্রতিবেদনের এই ফল্গুধারায় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, অনলাইন মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া ও টেলিভিশনগুলোও তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

প্রতিদিন বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে নিয়ে নানামুখী প্রতিবেদন আর তার নামে প্রকাশিত ‘টুইস্টেড’ বক্তব্যগুলো পড়ে মাঝে মাঝে মনে হয় আদৌ এভাবে বলছেন হিরো আলম? এখানে যে সন্দেহ প্রকাশ করছি সেটা মিডিয়ার একজন হয়ে কিছু মিডিয়ার প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন অবিশ্বাস থেকে। হয়ত আমি শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারি, তবে এই সন্দেহ নিশ্চিতভাবেই অমূলক নয়। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তৃতি ও ব্যাপ্তিতে মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মাস মিডিয়ায় খবর হয়, এবং সেগুলোর অধিকাংশে সূত্রবিহীন সূত্রের যোগের বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না।

Advertisement

মনোনয়ন ফরম ক্রয়ের পর হিরো আলমকে যেভাবে বিভিন্ন মিডিয়া উপস্থাপন করছে তাতে মনে হচ্ছে তাকে ‘এমপি ভেবেই’ এমন প্রশ্ন করা হচ্ছে। এমপি পদের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করাটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু প্রশ্নভঙ্গি ও প্রশ্নের ধরণগুলো সে প্রমাণ দিচ্ছে। আর কিছু কিছু তাকে হেয় করতে করার চেষ্টা বলেই মনে হয়। ‘গণমাধ্যমে’ যেখানে ‘গণ’ শব্দের উপস্থিতি তখন সেই মাধ্যম এভাবে কি ব্যক্তিক হতে পারে? প্রশ্ন থাকছে!

সম্প্রতি কয়েকটি মিডিয়া হিরো আলম ‘মন্ত্রী হলে কী করবেন’ এমন প্রশ্নও করেছে। এই প্রশ্ন এখনই কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়। কারণ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি ভিন্ন হলেও আর যাই হোক সেখানে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতে পারে না। এখানে সংশ্লিষ্টদের গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।

হিরো আলমকে নিয়ে এই হাসিঠাট্টা, রসিকতা, কৌতুক, হেয় প্রবণতা উচিত হচ্ছে না। তার উচ্চারণভঙ্গি, তার স্টাইল আর চেহারা পছন্দ নাও হতে পারে আমাদের, কিন্তু এগুলোকে উপজীব্য করে টানা এমন অপমানের চেষ্টার রাশ টানা উচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যেহেতু অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যম সেহেতু সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরোপের যথাযথ কোন ব্যবস্থার সুযোগ দেখছি না। তবে ওই মাধ্যমে ব্যক্তি হিসেবে আমরা নিজেরা যখন নিজেদের সংযত রাখাটা শিখব, তখন এর বিস্তার রোধ হবে। এর বাইরে গণমাধ্যমগুলোকে তাদের প্রতিবেদনের ধরন নিয়ে ভাবতে হবে। গণমাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে ব্যক্তির সম্মানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান মিলবে বলে বিশ্বাস করছি।

আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলম বগুড়া থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছাপোষণ করেছেন। তিনি এখনও মনোনয়ন পাননি, পাবেন কিনা তাও জানিনা। তবে স্রেফ হাজার বিশেক টাকা খরচায় এখন তিনি নিজেকে ‘এমপি’, এমনকি ‘মন্ত্রী’ হিসেবে ভাবতে পারছেন; এবং সেটা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের কারণে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া হিরো আলম দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার (সদস্য) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন, তবে এবার ঠিকই জিতেছেন ‘এমপি’ পদে; এবং তার সেই জয় নির্বাচনের আগেই, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগেই। এতে করে সংসদ সদস্য পদ-প্রতিষ্ঠানকে তিনি কীভাবে দেখছেন জানি না, তবে অনেকের ভাবভঙ্গিতে এই পদ-প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী মনোনয়ন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

তুলনা করছি না, তবে বলছি হাসিঠাট্টা, কৌতুক কিংবা রসিকতার চরিত্র হিরো আলমও ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেলতে পারেন কোনো একদিন। আশির দশকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন সিলেটের ছয়ফুর রহমান ওরফে ছক্কা ছয়ফুর। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনের একটা পর্যায়ে সিলেটের সদর উপজেলা নির্বাচনে ‘ছক্কা ছয়ফুর’ ঠিক ঠিক ‘ছক্কা মেরেছিলেন’ নির্বাচনে জিতে গিয়ে; হিরো আলম কোনোদিন পারবেন না সেটাও বলা যাবে না এখনই। তবে শেষ পর্যন্ত হিরো আলমের পরিণতি কী হয় কে জানে তবে এখন বলা যায় নির্বাচনের আগেই তিনি স্বনির্ধারিত নামের মতই ‘হিরো’ হয়ে গেছেন।

হিরো ‘হিরো’ হয়ে যাওয়ার পর এবার না হয় আগামীতে নিশ্চয়ই ছক্কা ছয়ফুর কিংবা তার সিনেমার নামের মত ‘ছক্কা’ মারতে চাইবেন! তবে এখনকার অবস্থায় তিনি নির্বাচনের আগেই জিতে গেছেন, আমরাই তাকে জিতিয়ে দিয়েছি; আর এই জয়ী করার প্রচেষ্টায় আমাদের কী লাভ জানি না তবে তার লাভ অপার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)