চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাতে কাজ নেই, গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন মেকআপ আর্টিস্ট-প্রোডাকশন বয়

করোনাকাল: কাজ সংকটে চলচ্চিত্রের কলাকুশলীরা

অভিনেতাদের এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে যেতে রূপদান করেন মেকাপ আর্টিস্ট। যুগযুগ ধরে মেকআপ আর্টিস্টদের ক্যারিশমায় শিল্পীরা পর্দায় বিভিন্ন লুকে হাজির হতে পারেন। অন্যদিকে ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ’ পরিচালক হলেও শুটিংয়ে যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে কাজ সহজ করে দেয় প্রোডাকশন বয়রা।

কিন্তু করোনাকালের এই দুঃসময়ে কাজ না থাকায় চলচ্চিত্রের মেকআপ আর্টিস্ট ও প্রোডাকশন বয়রা ভালো নেই। উপায় না পেয়ে অনেকে গ্রামের পথ ধরেছেন তাদের অনেকেই।

বিজ্ঞাপন

শাকিব ও শ্রাবন্তীর সঙ্গে শুটিংয়ের ফাঁকে মেকাপম্যান সবুজ

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রে ১৯৮২ সাল থেকে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন সেলিম মোহাম্মদ। দীর্ঘ ৩৮ বছরের কর্মজীবনে নায়করাজ রাজ্জাক, রাজীব, আলমগীর, ফারুক, ইলিয়াস কাঞ্চন, শাকিব খান, দিতি, ববিতা, শাবানা, রোজিনা, মৌসুমী, শাবনূর, অপু বিশ্বাসসহ সব ক্যাটাগরির শিল্পীর মেকআপের কাজ করেছেন। অথচ করোনার মধ্যে প্রায় ৪ মাস ধরে বেকার দিন কাটাচ্ছেন সেলিম মোহাম্মদ।

তার ভাষায়, ‘সেই মার্চে শিল্পকলা একাডেমির ‘উড়াল’ নামে একটি ছবির মেকআপের কাজ করেছিলাম, তারপর থেকে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়।’

চলচ্চিত্রে শুটিং না থাকার ১ জুলাই একটি নাটকের শুটিংয়ে কাজ করলেন সেলিম মোহাম্মদ। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, আগে প্রতিমাসে কমপক্ষে ১৫ দিন শুটিং থাকতো। কিন্তু গত চারমাস একেবারে বেকার ছিলাম। জমানো টাকা ভেঙে চলতে হয়েছে। অন্য কোনো ব্যবসাবাণিজ্য নেই যে সেখান থেকে কিছু ইনকাম আসবে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হচ্ছে কাজ না থাকার পরেও প্রতিমাসে ঘর ভাড়া দিতে হয়েছে। বাড়িওয়ালা একটা টাকাও কম রাখেনি। জমানো টাকাও প্রায় শেষ। সংসারে টানাটানির সময় আসছে। তাই উপায় না পেয়ে নাটকের কাজে নেমে পড়েছি। এ অবস্থায় চলচ্চিত্রে কেউ কাজ করছেন না। এখন আমাদের বেকারত্ব বাড়ছে। ভবিষ্যতে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখছি না।

ফিল্ম মেকআপ আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সেলিম মোহাম্মদ বলেন, চলচ্চিত্রের সব মেকআপ আর্টিস্ট সামর্থবান নয়। অনেকেই কাজ না থাকায় ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। সমিতি থেকে সদস্যদের টুকটাক সাহায্য দেয়া হয়েছে। তবে ওই সাহায্যের টাকায় পরিবার নিয়ে পুরোমাস টিকে থাকা সম্ভব নয়।

শুটিংয়ের ফাঁকে বুবলীর সঙ্গে মেকাপম্যান ও প্রোডাকশন বয়

করোনায় এই খারাপ সময়েও চলচ্চিত্রের কিছু শিল্পী তাদের সামর্থের মধ্যে সহযোগীতার মাধ্যমে পাশে থেকেছেন উল্লেখ করে সেলিম মোহাম্মদ বলেন, নায়ক আলমগীর, শাবনূর, নিপুণ, ববিসহ কয়েকজন শিল্পী প্রযোজক মেকআপ আর্টিস্টদের সহযোগীতা করেছেন।

তিনি বলেন, আমাদের কাজটা এমন যে মানুষের স্পর্শে থাকা। আর করোনার জন্য দূরে থাকতে বলা হচ্ছে। এতে করে আমরা কাজ করতে পারছিনা। আমাদের বেকারত্ব বেড়েই যাচ্ছে।

চলচ্চিত্রের সুপরিচিত মেকআপ আর্টিস্ট সবুজ খান। তিনি জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের ব্যক্তিগত মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন। সবুজ জানান, তার তত্ত্বাবধানে কাজ করেন আরও ১৩ জন মেকআপ আর্টিস্ট। করোনায় প্রত্যেকেই বেকার হয়েছে। গত ৪ মাস ধরে তারা প্রত্যেকেই সবুজের বাসায় থাকছেন।

সবুজ জানান, সার্বিকভাবে কাজ না থাকায় কেউ ভালো নেই। তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যয় ভারও আমাকে দিতে হচ্ছে। প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিতে হচ্ছে। কাজ নেই, অথচ জমানো টাকা থেকে খরচ হচ্ছে।

করোনা সংক্রমণের পরই লকডাউনের সময় এই মেকআপ আর্টিস্ট ফিরে যান তার গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরে। বেকারত্ব ঘুচাতে ওয়াইফাই ব্যবসা ও মুরগীর খামার দিয়েছেন। তিনি বলেন, করোনার যে অবস্থা কবে আবার কাজ শুরু হয় ঠিক নেই। এজন্য আগেই শাকিব ভাইয়া আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ব্যাকআপের জন্য বিকল্প কিছু করতে। তার পরামর্শে গ্রামে গিয়ে ব্যবসাগুলো চালু করে এসেছি।

চলচ্চিত্রে প্রায় ১২০ জনের মতো মেকআপ আর্টিস্ট রয়েছে। সবুজ খান তাদের মধ্যে ব্যস্ত মেকআপ আর্টিস্ট। সর্বশেষ ‘আকবর’ ছবির শুটিংয়ে কাজ করেন। তিনি জানালেন, তার ১৭ বছরের কর্মজীবনে করোনাকালই সবচেয়ে খারাপ সময়। এত সংকট কখনো অনুভব করেননি। তিনি বলেন, প্রায় সাড়ে ৪ মাস পর পাবনায় একটি বিয়ের মেকআপের কাজ পাই। সেজন্য ঢাকা থেকে পাবনা গিয়ে কাজটি করেছি। একেবারে বসেই ছিলাম। উপায় না পেয়েই বিয়ের কনে সাজানোর কাজটি করলাম।

শাবনূরের সঙ্গে মেকাপম্যান…

সবুজ বলেন, কাজ ছাড়া এমন অবস্থা এবং আগে কখনো এতো লম্বা সময় বেকার থাকিনি। এ দুঃসময়ে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দিচ্ছেন আমার বস (শাকিব খান)। সহযোগীতা যতটুকু সবটুকুই বসের কাছ থেকে পাচ্ছি। যখন যেটা দরকার হচ্ছে বলা মাত্রই তিনি উপকার করছেন। সবসময় উনি খোঁজখবর রাখছেন। তার জন্যই এখনো ভালোভাবে টিকে আছি। নইলে আমাকেও হয়তো ঢাকা ছেড়ে অন্যদের মতো গ্রামে ফিরতে হতো।

গত ৬ বছর ধরে চলচ্চিত্রে মেকআপম্যান হিসেবে কাজ করছেন নিয়ামত আকাশ। আগে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে তিনি কাজ করতেন। তারপর একটি বেসরকারিতে টিভিতে মেকআপম্যান হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছেন। গত বছর শাপলা মিডিয়াতে মেকআপম্যান হিসেবে চাকরী নিয়েছেন। নিয়ামত আকাশ বলেন, প্রায় দুই মাস গ্রামে ছিলাম। গত মাসে ঢাকা ফিরে টুকটাক কাজ করছি। আমি নায়ক শান্ত খানের ব্যক্তিগত মেকআপ আর্টিস্ট। তাদের শাপলা মিডিয়া থেকে ঠিকমত বেতন পাচ্ছি। শান্ত ভাইয়ের জন্য আমি এখনও আর্থিক অসুবিধায় পড়িনি। তবে আমার পরিচিত অনেক মেকআপম্যান ভালো নেই। কেউ কেউ গ্রামে ফিরে গেছেন।

এদিকে ফিল্ম মেকআপ আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুল আলমের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, অধিকাংশ মেকআপ আর্টিস্ট দৈনিক মজুরীতে কাজ করতো। চারমাস শুটিং বন্ধ থাকায় কেউ ভালো নেই। ৮০ ভাগ মেকআপম্যানই করোনার আগে আর্থিক টানাটানিতে ছিল। করোনায় চলচ্চিত্রে কাজ না থাকায় কেউ কেউ নাটকের কাজ করছেন। নাটকে অল্প অল্প কাজ হচ্ছে। তাই মেকআপ আটিস্টদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন।

তিনি বলেন, করোনার মধ্যে মেকআপ আর্টিস্টদের পাশে থেকেছেন আলমগীর, ববিতা, চম্পা, নিপুণ, ববি। তাদের সহযোগীতায় প্রায় ২ লাখ টাকার ফান্ড গঠন করে রোজার শুরুতে এবং ঈদের আগে দুই কিস্তিতে একেবারে অসচ্ছল মেকআপ আর্টিস্টদের সহায়তা দেয়া হয়েছে। যারা গ্রামে গেছেন বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেয়া হয়েছে।

১৫ দিন আগে ৮০ জন শিল্পীর তালিকা করে পরিচালক সমিতির মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সাহায্যের আবেদন জানায় মেকআপ আর্টিস্ট এসোসিয়েশন। এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সভাপতি শামসুল আলম বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো সদস্য সরকারি সহায়তার কথা জানতে চাইছেন। কিন্তু এখনো কিছুই পাইনি।

নিজের উদাহরণ টেনে ফিল্ম মেকআপ আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আমার কাজ নেই। মেকআপ ছাড়া অন্য কোনো কাজও শিখিনি। যে অবস্থা বিরাজ করছে আগামিতে আমিও আর্থিকভাবে বিপদে পড়তে পারি। এটা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। আমাদের মধ্যে ১০ জন মেকআপ আর্টিস্ট মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু লম্বা সময় বেকার থাকার কারণে কেউই ভালো অবস্থায় নেই। তবে এই দুঃসময়ে যেসব শিল্পীরা মেকআপ আর্টিস্টদের পাশে থেকেছেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।

এদিকে চলচ্চিত্রে ব্যস্ত প্রোডাকশন ম্যানেজার মো. জাকির কাজ করছেন একটি বেসরকারি টিভির সিরিয়ালে। তিনি বলেন, চলচ্চিত্র কবে হবে ঠিক নেই। অনেকেই পূর্বের প্রোডাকশনের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না। মুখে মুখে অনেকেই শুটিংয়ে ফিরতে চাইছেন কিন্তু ফিরছেন না কেউ। কাজ না থাকায় বাধ্য হয়েই নাটকে নেমেছি। করোনার মধ্যে মোট ১০ দিন হল কাজ করছি।

যোগ করে তিনি বলেন, রোজার আগে ডিপজল এবং অনন্ত জলিল দুজনের তাদের পক্ষ থেকে প্রোডাকশনে যারা কাজ করে তাদের সহায়তা দিয়েছেন। আরও বলেন, চলচ্চিত্রে ১৭৫ জন প্রডাকশন ম্যানেজার এবং ২৮০ জনের প্রোডাকশন বয় রয়েছে। অধিংকাশই করোনার কারণে গ্রামে ফিরে গেছেন।

করোনার মধ্যে মেকআপ আর্টিস্ট ও প্রোডাকশন বয়দের কষ্টের কথা উল্লেখ করে চলচ্চিত্র পরিচালক মালেক আফসারী বলেন, অনেকেই অভাব সইতে না পেরে গ্রামে ফিরে গেছেন। কেউ কেউ আবার পেশা পরিবর্তন করেছেন। আমারই এক প্রোডাকশন বয় দুদিন আগে ফোন করে কান্নাকাটি করে বলেছিল, সে উত্তর বাড্ডায় থাকে। মাসিক ৭ হাজার টাকায় ৩ মাসের ভাড়া দিতে পারে না বলে বাড়ীওয়ালা আটকে রেখেছে। আমি সেখানে গিয়ে নিজ টাকায় জিম্মা হয়ে প্রোডাকশনে কাজ করা ছেলেকে ছাড়িয়ে নেই। পরে সে গ্রামে ফিরে গেছে।