চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বৈরাচারের দায়মুক্তি

সমালোচনার দৃষ্টিতে না দেখলেও জাতীয় পার্টির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে অনেক পরিচয়ে তুলে আনা যায়। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক স্বৈরাশাসক, সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিশেষ দূত- কত কী! জীবদ্দশায় সবগুলো পরিচয় তিনি হাসিল করেছিলেন। মৃত্যুতে যোগ হলো আরও এক পরিচয়, ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’, ‘প্রবীণ রাজনীতিবিদ’ ও ‘সফল সমাজসেবক’।

মৃত্যু পরবর্তী এই পরিচিতি কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ-সেমিনার কিংবা কোনো নেতার বক্তব্য থেকে আসেনি। এসেছে খোদ জাতীয় সংসদ থেকে, এবং সেটা জাতীয় সংসদের রেকর্ডে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। এই প্রস্তাব পাস হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে। বলা যায়, সংসদের সর্বসম্মত প্রস্তাব এটা যেখানে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল দলের সাংসদদের উপস্থিতি ছিল।

বিজ্ঞাপন

৮ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশনে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে জাতীয় সংসদ যে প্রস্তাব পাস করে সেখানে এরশাদকে ‘প্রবীণ রাজনীতিবিদ’, ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’ ও ‘সফল সমাজসেবক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাবেক এই স্বৈরাচারের জীবনে এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে কিনা সন্দেহ।  জীবদ্দশায় তাকে ‘পল্লীবন্ধু’ কিংবা ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে দাবি করতে পারে তার দল কিন্তু এমন সর্বসম্মত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না। গত ১৪ জুলাই মৃত্যুর কাছে হারলেও পৌনে দুই মাসের মাথায় আদতে জিতে গেলেন এরশাদ। 

নব্বই বছরের দীর্ঘ জীবন তার সার্থক হয়েছে এমন স্বীকৃতিতে। স্বীকৃতি তাকে তারাই দিয়েছে যারা একটা সময়ে তার সরকারের নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, স্বীকৃতি তারাই দিয়েছে যারা তার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল তীব্র গণআন্দোলনে। এরশাদের জন্যে নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন এটা।

যে সংসদ এরশাদের এমন স্বীকৃতি দিয়েছে সেই সংসদে একই দিনে নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার এই এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এজন্যে প্রধানমন্ত্রী রেফারেন্স টানেন আদালতের রায়ের। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘আদালতের রায় অনুযায়ী সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদের শাসনামল অবৈধ। এ দু’জনের কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা বৈধ নয়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ হয়েছে।’

আদালতের রায় ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে এরশাদের রাষ্ট্রপতিত্ব যদি অবৈধই হয় তবে তিনি কীভাবে ‘সফল রাষ্ট্রনায়কের’ স্বীকৃতি পান? এখানে জাতীয় সংসদ কি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে এড়িয়ে গেল? প্রশ্নটা স্বাভাবিক। জাতীয় সংসদে এরশাদকে সফল রাষ্ট্রনায়কের এই স্বীকৃতিকে হালকা করে দেখার অবকাশ নাই। এই শোকপ্রস্তাব ও গ্রহণ ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়। জাতীয় সংসদের রেকর্ডে থাকছে ব্যাপারটা। এটা এরশাদ ও জাতীয় পার্টির জন্যে সুখের এক দলিল হয়ে গেল, একই সঙ্গে ইতিহাসের অংশও।

বন্দুকের নল দেখিয়ে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে দৃশ্যপটে এসেছিলেন এরশাদ। এরপর টানা নয় বছর করেছিলেন দেশ শাসন। দেশ শাসনের এই সময়ে গণতন্ত্র ছিল অবরুদ্ধ। অবরুদ্ধ সেই গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগসহ অপরাপর দলগুলো আন্দোলন করেছিল। সেই আন্দোলনে সরকারবিরোধীদের ওপর নির্মম নির্যাতনসহ অসংখ্য গণতন্ত্রকামী মানুষ প্রাণ হারায়। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেসময় প্রাণনাশের হুমকিতে ছিলেন। তার ওপর একাধিকবার হামলাও চালানো হয় সেই এরশাদের সময়ে। এগুলো ইতিহাসের অংশ।

বিজ্ঞাপন

এরশাদের এই ক্ষমতা দখল ও দেশশাসনকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এরশাদের সঙ্গে এই তালিকায় ছিলেন আরেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানও। অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের কারণে আদালতের রায়ে জিয়া ও এরশাদের শাসনামল তাই অবৈধ। সেই অবৈধ শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’ কীভাবে হতে পারেন এরশাদ? যার শাসনামলই অবৈধ, যার রাষ্ট্রপতিত্বই অবৈধ তিনি কীভাবে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সফল? এটা স্ববিরোধিতার পর্যায়ে কি পড়ে না? এছাড়া এরশাদের অবৈধ শাসনামলের উল্লেখ শোকপ্রস্তাবের আলোচনায় এসেছিল খোদ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই।

সংসদ নেতা অবশ্য তার বক্তব্যের অন্য অংশে এরশাদের সাম্প্রতিক রাজনীতির প্রশংসা করেছেন, কিন্তু এটা যে রাজনীতির প্রয়োজনে রাজনৈতিক বক্তব্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ব্যক্তিজীবনে এরশাদ অমায়িক ছিলেন, মানুষের প্রতি ছিল তার দরদ’। এই প্রশংসা ব্যক্তি এরশাদের ব্যক্তিজীবনের ‘সফল রাষ্ট্রনায়কের’ স্বীকৃতির জন্যে যথেষ্ট নয় বলে মনে করি।

সংসদে আনা শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সফল রাষ্ট্রনায়ক এবং নিবেদিত সমাজসেবককে হারাল।’ প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ‘এরশাদ ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একনাগাড়ে প্রায় আট বছর ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ দেশে অসংখ্য উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজ করেন।’  অবৈধ শাসকের এমন স্বীকৃতিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বাকি দলগুলোর নেতাদের অনেকেই বক্তব্য দেন। সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তার বক্তৃতায় বলেন, ‘জেনারেল এরশাদ জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের আশ্রয় দিয়েছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন।

এমনকি একটি তথাকথিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কর্নেল ফারুকের মতো ঘৃণিত খুনিকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করেছিলেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক। যেটা আমি ভুলে যেতে চাই। আজকের দিনে স্মরণ করতে চাই না। তবে, বলতে চাই এ জন্য যে এটা রেকর্ডে থাকবে।’ মোহাম্মদ নাসিম বক্তব্যে এরশাদের কিছু জিনিস ভুলে যেতে চাই বলেও উল্লেখ করেছেন, এর কারণও তিনি বলেছেন সংসদের রেকর্ডের জন্যে। তার সবগুলো কথা সংসদে রেকর্ড থাকছে, যেমনটা থাকবে ‘প্রবীণ রাজনীতিবিদ’, ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’ এবং ‘নিবেদিত সমাজসেবক’ হিসেবে সংসদে দেওয়া স্বীকৃতিও।

এরশাদমানুষ মারা গেলে সবকিছু ঊর্ধ্বে কি ওঠে যায়? মৃত মানুষের ক্ষমতা থাকে না নতুন কিছু করার, কিন্তু জীবদ্দশায় কৃত কাজের জন্যে তার প্রশংসা-সমালোচনার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা না। এটা যদি বন্ধ করার চেষ্টা হয় বা এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত আসে তবে অন্যান্যরা সেখান থেকে শিক্ষা নেবে না।  এরশাদের দীর্ঘ সামরিক শাসন, গণতন্ত্র হরণ, গণতন্ত্রকামী মানুষদের নিপীড়ন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পুনর্বাসন, রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হরণ- সবকিছুই কি ভুলে যাওয়ার মত? এর প্রায়শ্চিত্ত কি তিনি ও তার উত্তরসূরিরা করবে না? করার তো কথা, তা না হলে এদেশের মানুষ মনে করবে গণতন্ত্র হরণ করে, নানা অপরাধ করেও দায়মুক্তি পাওয়া যায়। সংসদে আনা শোকপ্রস্তাবের বাক্যগুলো কি এরশাদকে দায়মুক্তি দিলো না?

স্বৈরশাসক এরশাদ নানা অপরাধ করে বিচারের মুখোমুখি হয়েও কোনো শাস্তি পাননি। স্বাভাবিক মৃত্যুও হয়েছে তার। আর এবার পেলেন দায়মুক্তি। তার এই দায়মুক্তি এই সময়টাকে আগামী দিনে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে কী জবাব থাকবে আমাদের? জবাব কি কিছু দেওয়ার আছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View