চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষায় মধ্য এপ্রিলে করোনা বিস্ফোরণের শঙ্কা

লকডাউনে অবাধে রাজধানী থেকে নিজ শহরে ফেরা, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা, নতুন ধরন (ভেরিয়েন্ট) অতি সংক্রমণশীল থাকায় এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে করোনা সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে।

এক্ষেত্রে দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অনেক বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশে নতুন ধরন (ভেরিয়েন্ট) শনাক্ত হবার পর বর্তমানে শনাক্তের হার ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। যা কিনা দুই শতাংশে ছিল। নতুন ধরনের বিরুদ্ধে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এই ধরনগুলো ৭০ থেকে ৮৯ ভাগ বেশি সংক্রমণশীল।

কেন মধ্য এপ্রিলে করোনা বিস্ফোরণের শঙ্কা
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘করোনাভাইরাস মানবদেহে ১৪দিন পর্যন্ত রোগ তৈরি করে। এই লকডাউনের আগের দিন মানুষ যেভাবে ঢাকা ছেড়ে নিজ শহরে যাবার জন্য ভিড় তৈরি করলো তাতে তাদের মধ্যে সংক্রমিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের ১৪ দিন পর অর্থাৎ এ মাসের ১৫ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত রোগটি ফুটে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়াও চলতি মাসের শুরুর দিকে মেলা, খেলাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমেও কিন্তু এ মাসের ১৫ থেকে ২১ তারিখে রোগটি বিকশিত হয়ে উঠতে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘করোনা স্বাভাবিকভাবে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে তিনজনকে সংক্রমণ করে। কিন্তু নতুন ধরনে (ভেরিয়েন্ট) দেখা যাচ্ছে দ্বিগুণ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এটা ৪০ থেকে কমপক্ষে এক’শ ভাগ বেশি দ্রুত সংক্রমণিত করে। আগে যেখানে একদিনে যে পরিমাণ রোগী সংক্রমিত হতো এখন সেখানে দ্বিগুণ বেশি শনাক্ত হচ্ছে। তাই আমরা বলছি এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ ১৫ থেকে ২০ তারিখ থেকে করোনার একটি বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে।’

গত বছর দেশে ইটালীয় ধরনে অ্যান্টবডি তৈরি হলেও বর্তমানে নতুন ধরনে কোনো অ্যান্টিবডি কাজ করছে না। ছবি: তানভীর আশিক

নতুন ধরনে (ভেরিয়েন্ট) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে বিদেশ ফেরতদের কোয়োরেন্টাইন, আইসোলেশন করাতে না পারায় দেশে ইউকে, ব্রাজিলীয়, ক্যালিফোনিয়া ধরনগুলো (ভেরিয়েন্ট) এসেছে। স্বাভাবিকভাবে বিদেশী ধরন হওয়ায় সেটার বিরুদ্ধে আমরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। তাছাড়া এই বিদেশি ধরনগুলো (ভেরিয়েন্ট) ৭০ থেকে ৮৯ ভাগ বেশি বেশি সংক্রমণশীল।’

গবেষণালব্ধ প্রতিষ্ঠান না থাকায় দেশীয় আঞ্চলিক ধরন নির্ণয় হয়নি
অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, ‘মহামারির সময় ভাইরাস একটা পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকে। আমাদের দেশেও আঞ্চলিক ধরন (রিজিওন্যাল ভেরিয়েন্ট) থাকতে পারে। যা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশে করোনার শনাক্তকরণ কিংবা আঞ্চলিক ধরনের কোনো গবেষণা হয়নি। কারণ গবেষণালব্ধ প্রতিষ্ঠান নেই, বাজেট নেই, আমরা শুধু বিদেশী গবেষণার ওপর নিরর্ভরশীল। এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা।’

অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু

তিনি বলেন, ‘‘ভ্যাকসিন আমাদের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। কিন্তু আমাদের পরিবেশে যে ধরনগুলো রয়েছে সেগুলো যেন সবার দেহে কাজ করবে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যেমন ব্রিটেনের ধরন (ভেরিয়েন্ট) সেটা সেখানকার পরিবেশ, খাদ্যাভাস, জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত, আমাদের দেশের সাথে যা কিনা অনেক পার্থক্য। আমরা যদি আমাদের দেশের ধরন নিয়ে গবেষণা করতে পারতাম তাহলে ভ্যাকসিন অনেক কার্যকর হতো। কারণ ব্রিটেনের সমাজ, পরিবেশ, খাদ্যাভাসের সঙ্গে আমাদের অনেক পাথর্ক্য রয়েছে।’’

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক শাহানা বানু বলেন, ‘দেশে আঞ্চলিক ধরন (রিজিওন্যাল ভেরিয়েন্ট) দিয়ে যদি ভাইরাসটাকে উৎপাদান করা যেত তাহলে তা অনেক কার্যকরী হতো। সেটা আমরা করতে পারি নাই। সেজন্য অনেকে ভ্যাকসিন নিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে। আর আমাদের দেশের মানুষের অবাধ চলাফেরা অনেকাংশে দায়ী। এক ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে তারা মনে করেছে আমরা করোনা জয় করে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘‘আগের করোনাভাইরাসটি প্রথমে নাকে বংশবিস্তার করত পরে ফুসফুসে যেত, এখনকার নতুন ধরন সরাসরি ফুসফুসে বংশবিস্তার করে, দ্রুত রোগীকে ভাইরাল নিউমোনিয়া করে তোলে।’’

ইর্মাজেন্সি অক্সিজেন সাপোর্ট সেন্টার ও মোবাইল টিম রাখার তাগিদ
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের ইর্মাজেন্সি অক্সিজেন সাপোর্ট সেন্টার ও মোবাইল টিম গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতালে সিট বাড়ানোর একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু রোগী বাড়লে সেখানে জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে যারা মৃদু ও মধ্যম আক্রান্ত তাদের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। এবং যারা তীব্র আক্রান্ত তাদের শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে।’

ডা. লেলিন চৌধুরী

‘‘পাশাপাশি আমাদের ইর্মাজেন্সি অক্সিজেন সাপোর্ট সেন্টার গড়ে তুলতে হবে, যাতে অসুস্থ রোগীরা সেখানে অক্সিজেন নিতে পারবে। এ ছাড়াও প্রত্যেকটা জায়গায় মোবাইল মেডিকেল টিম করতে হবে। বাড়িতে থাকা রোগীরা সেখানে বার্তা পাঠাবে মেডিকেল টিম গিয়ে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে, যদি হাসপাতালে নিতে হয় সেটা করবে অন্যথায় উন্নত চিকিৎসা সেবা দিবে।”

মাস্ক ছাড়া বের হলেই জরিমানা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। যতোটুকু সম্ভব সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

এছাড়া সমষ্টিগত পর্যায়ে, পাড়ায় মহল্লায় এলাকায় গণ তদারকি কমিটি গঠন করা দরকার। যারা ওই এলাকার মানুষ যারা মাস্ক না পড়ে বাইরে বের হয় তাদের বাড়িতে ফেরত পাঠাবে। একাধিকবার ওই মানুষগুলো যদি মাস্ক ছাড়া বের হয় তাহলে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে হবে।

এবং সরকারী পর্যায়ে, কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। মাঠে পুলিশ নামাতে হবে যেন জনাসাধারণ মাস্ক না পড়লে জরিমানা করে।’’

তিনি বলেন, ‘‘অন্যান্য সেক্টরে শপিং মল থেকে শুরু করে অফিস, বেসরকারী অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আলাদা আলাদা বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক। সেটা তদারকির জন্য মাঠ পর্যায়ে পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে। একই সাথে শপিং মল, দোকানপাঠ, অফিসের সময় ছয় ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি করোনার টিকা দেবার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’’

একজন থেকে একের অধিক ব্যক্তি সংক্রমিত হচ্ছে। এ হার একের নিচে নামাতে না-পারলে আক্রান্ত কমানো সম্ভব হবে না। ছবি: তানভীর আশিক

ডা. লেলিনের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। কমপক্ষে ছয় ফিট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। রাস্তায়, গণপরিবহণে, অফিসে সব জায়গায় সব সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পড়তে হবে। আমাদেরকে আরও কয়েক বছর করোনাকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হবে। তাই করোনা সংক্রমণের পর যতোটা ঝুঁকি, তার চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিরোধ করাটাই সহজ। পাশাপাশি আমাদের তৃতীয় ঢেউ যদি আসে তখন কী করণীয় হবে সেটা এখন থেকেই সংশ্লিষ্টদের চিন্তা করতে হবে।’’