চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্রষ্টা, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যুক্তফ্রন্টের হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামসহ মৃত্যু অবধি অসংখ্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির জীবনে শুভ প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হয়েছিল। শেখ মুজিব অজস্র স্বাধীনতা সংগঠকের দীক্ষাগুরু ছিলেন, ছিলেন নয়নের মণি, আত্মার আত্মীয় ও পথ প্রদর্শক। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাকমূহুর্তে তাঁর অঙ্গুলি নির্দেশেই পূর্ব পাকিস্তান পরিচালিত হতো। অসাধারণ বাগ্মি, দূরদৃষ্টি, শত্রুকে আপন করে নেওয়ার অপার মানসিকতা, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি সুমহান স্নেহ ও অগাধ ভালবাসা ব্যক্তি শেখ মুজিবকে অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছিল। শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন: আমি হিমালয় দেখিনি তবে মুজিবকে দেখেছি।

শেখ মুজিবের দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণেই মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে আমাদের স্বাধীনতার লালিত স্বপ্নকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। কী অসাধারণ যোগ্যতা ছিল বঙ্গবন্ধুর, যার বদৌলতে তিনি একমাত্র নেতা এবং দীক্ষাগুরু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশেষ করে লোকজ ভাষা সংস্কৃতির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লোকায়ত জাতি চেতনার সৃষ্টি হয়ে তিনি মহান নেতা হিসেবে সকলের অকুন্ঠ সমর্থন পেয়েছিলেন। মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর মুখের এক একটি বাণী এবং নির্দেশ বাঙালি জাতির প্রতিটি মানুষের কাছে পথ্যের ন্যায় বিবেচিত হয়েছিল। আর ৭ মার্চের সেই ক্ষণজন্মা ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছিল, বাঙালি জাতি তাদের মুক্তির জন্য কতটা কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, আর সেটি কেবল সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর পাহাড়সম তীক্ষ্ম এবং তেজোদীপ্ত নেতৃত্বের জন্যই। যার জন্য তিনি তিলে তিলে বাঙালিকে বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রস্তুত করতে পেরেছিলেন সংঘবদ্ধ এবং প্রতিবাদী জাতি হিসেবে এবং যার প্রত্যক্ষ ফলাফল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা। তবে সে সময়কার পাকিস্তানের দোসরদের (রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও অন্যান্য) গোষ্ঠীর মুখে এখনো মাঝে মধ্যে শোনা যায়, শেখ মুজিব প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করেননি, গ্রেফতারের পূর্বে কোন দিক নির্দেশনা দিয়ে যাননি। সেই সব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সত্য মিথ্যা নিরূপণে সঠিক তথ্য তুলে আনা নতুন প্রজন্মের গবেষকদের নৈতিক দায়িত্ব মনে করি। প্রকৃত অর্থে, শেখ মুজিব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটিকে আলাদা করে অন্যটির প্রাচুর্য বা মাহাত্ম্য বর্ণনা করা অর্থহীন। তার নিমিত্তেই কিছু কিছু ঘটনার উদাহরণ ও মর্মার্থের বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এ নিবন্ধটি ঘটনার যথার্থতা আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেই বিশ্বাস।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মাহেন্দ্রক্ষণ হয়ে এল ৭ মার্চ, দিনটি ছিল রোববার, ঝলমলে আকাশ, প্রতিবাদী মানুষের কন্ঠে সোচ্চার ছিল ঢাকার আকাশ বাতাস। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভবন ভোলানো, জগদ্বিখ্যাত মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের মহিমান্বিত দিন। কী অসাধারণ দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম ছিল বঙ্গবন্ধুর, ১০৪ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে সভামঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন। এটি এমন এক আবেগিত, তেজোদীপ্ত, অনুপ্রেরণাময়ী, মর্মস্পর্শী এবং উদ্বেলিত ভাষণ যেটি বিগত ২৫০০ বছরের মধ্যে যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে উদ্দীপনা এবং উৎসাহ প্রদানে সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছে বাস্তবায়ন সাপেক্ষে। ভাষণটির প্রত্যেকটি শব্দ মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল বলেই বাঙালি জাতি অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছিল। জ্যাকব এফ ফিল্ডের গ্রন্থে গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টির যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়েছে। ১৮ মিনিটের হৃদয়নিংড়ানো, বিশ্ব শ্রেষ্ঠ এবং দায়িত্বশীল ভাষণে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ তুলে দিলেন আমজনতার হাতে, শুধু কি সনদই, তা বাস্তবায়নের জন্য সমস্ত কলাকৌশল অত্যস্ত সুনিপুণভাবে কবির কাব্যের মত এবং শিল্পীর রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সে দিনের অগ্নিমঞ্চে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিকামী জনতার যে ঢল নেমেছিল তা ছিল অগ্নিগর্ভ, দুর্বিনীত এবং প্রাণোউল্লাসের। জনসমুদ্রে আগমনকারী জনতা ছিল নিশ্চুপ, মনোযোগী ছাত্রের ন্যায়, কবির কন্ঠে তেজোদীপ্ত বাণী এবং নির্দেশ শোনার অপেক্ষায়। পরবর্তীতে সে ভাষণের প্রত্যেকটি শ্লথ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হওয়ার স্বাক্ষরও বাঙালি জাতি রেখেছিল মহান স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমেই।

ভাষণের প্রত্যেক পর্যায়ে এবং ধাপে ধাপে তিনি বিভিন্ন উপায়ে এবং কৌশলে কর্মপদ্ধতির নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন আদর্শ শিক্ষকের ন্যায়। প্রথমাবস্থায় তিনি শোকাহত মানুষের হতাহতের পরিসংখানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। পাশাপাশি আন্দোলনের গোড়াপত্তনের সূত্রপাত তিনি বিভিন্ন ঘটনার আঙ্গিকে তুলে ধরেন। আন্দোলনকে জোরদার করতে সাধারণ জনগণের অবদান, আন্দোলনের ফলে আমাদের কি লাভ-ক্ষতি হয়েছে সে চিত্রও তিনি তুলে ধরেছেন দক্ষ শিল্পীর ন্যায়। তিনি অসহযোগ আন্দোলন ও হরতাল কর্মসূচি পালনের বিশেষ নির্দেশনা দেন এবং তিনি যদি কোন কারণে গ্রেফতার হন তাহলে কিভাবে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন নেতাকর্মীরা, সে নির্দেশনাও দিয়েছেন কবির ভাষায় চমৎকার শৈলীতে। এ্ ভাষণটি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা বারংবার শুনতে শুনতে উদ্বেলিত হতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করত বঙ্গবন্ধুর হৃদয় নিংড়ানো ভাষণ। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার যে অনুপ্রেরণা তিনি শিখিয়েছিলেন বাংলার মায়েরাও তা থেকে উদ্বেলিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধে আমরা অসংখ্য নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের চিত্রও দেখতে পাই। পরোক্ষভাবে হাজার হাজার নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে ইতিমধ্যে সর্বজন স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষণের অনুকরণে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সোপানের জন্য অনন্য অর্জন যা বাঙালি জাতির জীবনে চিরভাস্বর। ক্যারিশম্যাটিক লিডার হিসেবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য। রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রথিতযশা, তাই তো ২৫শে মার্চ বিকালের দিকেই তিনি জানতে পারেন যে ইয়াহিয়ার সঙ্গে সব ধরনের সম্ভাবনার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই তিনি তার প্রজ্ঞাবান এবং তেজোদীপ্ত সহকর্মীদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার নির্দেশ দেন। কিন্তু সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তিনি তাঁর বত্রিশ নম্বর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে পালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান, যাতে পাকিস্তানিরা কোন মিথ্যার আশ্রয় নিতে না পারে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন তাঁর “ম্যাসাকার” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃ মধ্যরাত অবধি বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে ঘটনা প্রবাহ আমূল পাল্টে যাচ্ছে। টেলিফোনের মাধ্যমে কামানের গোলার শব্দের সাথে সাথে নিরীহ মানুষের চিৎকারে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অধ্যুষিত সামরিক ঘাটিতে পাকিস্তানিরা আগে আক্রমণ করবে। তাই সেই রাতেই, ২৬শে মার্চে, বাঙালির অবিসংবাদিত জননেতা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে। সাথে সাথে জনৈক বন্ধুকে বেতার যোগে ঘোষণাটি পাঠাবার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।

রবার্ট পেইন লিখেছেন, বাণীটি ছিল নিম্নরূপঃ “পাকিস্তান সামরিক বাহিনী মাঝরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করেছে। প্রতিরোধ করবার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন।” বঙ্গবন্ধুর এই আহবান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে তাঁর সহকর্মী এবং মুক্তিকামী মানুষের কাছে পৌঁছে যায় নিমিষেই, এবং বাঙালি জাতি সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

বিজ্ঞাপন

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সচিব ও মুজিব বাহিনীর অন্যতম নেতৃস্থানীয় সর্বজনাব, বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা, জননেতা তোফায়েল আহমেদের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তিনি সহ-শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান এবং আব্দুর রাজ্জাককে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাড়িতে ডেকে নিয়ে একটি ঠিকানা মুখস্থ করতে বললেন। ঠিকানাটি ছিল: ২১ রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন রোড, ভবানীপুর, কলকাতা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আক্রান্ত হলে এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে। পরবর্তীতে সেই বাড়িতেই মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দ অবস্থান করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের রনকৌশল ঠিক করতেন। রাজেন্দ্র রোডের পাশেই থিয়েটার রোডে জাতীয় চার নেতা বাস করতেন যুদ্ধকালীন সময়ে। এ সব তদারকি কিন্তু বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের পূর্বেই ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন্। কারণ বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের জন্য প্লাটফরম তৈরি করেছিলেন যেগুলোর উপর ভিত্তি করেই মহান মুক্তিসংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল।

শেখ মুজিবের পক্ষ হতে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভারতীয় দূতাবাসের সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছিল। সেটি এখন বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত। তৎকালিন ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কেসি সেনগুপ্তের সহিত শেখ মুজিবের পক্ষে ক্যাপ্টেন সুজাত আলী নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। তাছাড়া অপারেশনের সার্চ লাইটের পূর্বে ২ মার্চ ভারতীয়দের যে নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশকে কোন প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সহযোগিতা করা যায় সে ব্যাপারে বিশদ আলোচনা হয়। কিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে, অস্ত্র কিভাবে সরবরাহ করা হবে, শরণার্থীদের বিষয়েই বা ভারতীয়দের ভূমিকা কেমন হবে ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল ঐ বৈঠকগুলোতে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এ আলোচনার পূর্বে অবশ্যই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেভাবেই যোগাযোগ রক্ষা করা হয়েছিল শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই।

ডা. আবু হেনা (সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন এবং ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা) যিনি ছিলেন শেখ মুজিব ও ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম। তাঁর ভাষ্যমতে, পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি ভারতীয়দের অনুরোধ এবং শেখ মুজিব ও শেখ মণির পরামর্শক্রমে ভারতে যান। তিনি বিভিন্ন ভাষায় (উর্দু, হিন্দি এবং ইংরেজি) পারদর্শী ছিলেন, বিচক্ষণ ও গোপনীয়তার ক্ষেত্রে অনন্য থাকায় শেখ মুজিব তাঁকে এ বিশেষ দায়িত্ব দেন। হেনার সাথে ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রথম সাক্ষাতে সীমান্ত খুলে দেওয়া, রেডিও স্টেশন স্থাপন, আগতদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। চিত্তরঞ্জন সূতার, ১৯৫৪ সালে বরিশাল থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, যাকে বহু আগেই শেখ মুজিব কলকাতাতে পাঠিয়েছিলেন; তার মাধ্যমেই মূলত হেনা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পেরেছিলেন্। এ আলোচনার প্রত্যেকটি বিষয়বস্তু তথা সারসংক্ষেপ শেখ মুজিবের নখদর্পণে ছিল।

প্রখ্যাত লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার “আমার একাত্তর” বইয়ে শেখ ফজলুল হক মণির সাথে লেখকের কথোপকথনের বিষয়টি তুলে ধরেন। বক্তব্যে দেখা যায়, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যাওয়ার জন্যে চেষ্টা করেন এবং সে মোতাবেক গাড়িতে একটি স্যুটকেসও তুলেন। কিন্তু সেই সময়েই একটি বিশ্বস্ত ফোন আসার পরমূহুর্তেই বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পুনরায় বাড়ির ভিতর চলে যান এবং সেই বিশ্বস্ত ফোনটি যে তাজউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে আসা সে বিষয়টিও মণি আঁচ করতে পারেন বলে লেখক বইয়ে উল্লেখ করেন। সুতরাং প্রতীয়মান হয়, সে সময়েই বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিনের সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা, গ্রেফতার পরবর্তী কিভাবে সরকার গঠন করবেন, যুদ্ধ কিভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয় নিয়েই আলোচনা করে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশকারীরা দেশ ও জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

তাছাড়া, তাজউদ্দিন আহমেদের সহকারী মঈদুল হাসানের ভাষ্যমতে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এবং তাজউদ্দিন আহমেদের প্রথম সাক্ষাৎকারে পর্বে ইন্দিরা গান্ধীর নিকট থেকে প্রথম প্রশ্ন ছিল; শেখ মুজিব কোথায়? তিনি কেন গ্রেফতার হলেন? প্রত্যুত্তরে তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন “শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, সরকার গঠন করেছেন, তারপর একটা বিভ্রাটে পড়ে গ্রেফতার হয়েছেন”। সুতরাং তাজউদ্দিনের এ উক্তি কী বহন করে সেটা বোঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি গ্রেফতার হতে পারেন, তাই তার বিচক্ষণতা দিয়ে গ্রেফতারের পূর্বে অন্যতম সিপাহশালার তাজউদ্দিন আহমেদকে সব কিছুর জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। নির্দেশ মোতাবেক মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং স্বাধীনতা পরিচালিত হয়।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দৃশ্যমান হয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ধারক ও বাহক। কুপমুন্ডকরা অনেক সময়ই বলে থাকেন, স্বাধীনতা যুদ্ধাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা ছিল না। ছোট এই আর্টিকেলটি তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যই যথেষ্ট এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গঠিত সরকার বঙ্গবন্ধুরই পরিকল্পনার ফসল। মূলত তার দিকনির্দেশনাই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং এতে দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। আর যারা এর পরেও সন্দেহের সুযোগ খুঁজবে তাদের দেশপ্রেমে যথেষ্ট ঘাটতি আছে ধরে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশের পাশাপাশি বর্হিবিশ্বেও মুক্তি-স্বাধীনতার জন্য শেখ মুজিব বহু নেতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিধায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই বিশ্ববিবেক সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ববিবেকের জনমত স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের সাহস এবং অনুপ্রেরণাকে আশান্বিত করেছিল। সুতরাং আমরা বলতেই পারি, বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের মুক্তি স্বাধীনতা একই সূত্রে গাঁথা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)