চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সীমান্তে কান্না কবে থামবে?

সভ্যতার বিকাশে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। আধুনিক বিশ্ব দেখতে, অনেকটা হাতের মুঠোয়। ঘরে বসেই আমরা চাইলে সবকিছু হাতের কাছে পাচ্ছি। বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব যোগাযোগের আমূল একটা পরিবর্তন হয়েছে। ইন্টারনেট বিশ্ব সেক্ষেত্রে আমাদের বিরাট একটা সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। দিন দিন মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তাধারা সমাজ পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রাখছে। তবে সমাজের এ পরিবর্তন কী কেবল পরিবর্তনই ঘটছে, নাকি ভয়ঙ্কর এক বিপর্যয়ের দিকেও আমরা এগোচ্ছি?

সময় যত বাড়ছে, আমরা মানুষ মারার তত ফন্দি আঁটছি। পারমাণবিক বোমাসহ বিধ্বংসী অস্ত্র উৎপাদনে আমরা কে পিছিয়ে আছি? ভাবতেই অবাক লাগছে, তাই না? মানুষ মারার কঠিন কঠিন আবিষ্কার আমরা মানুষরাই করছি! প্রাণঘাতী অস্ত্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছি, নিজেদের শক্তিশালী থেকে মহাশক্তিশালী করার নানান চেষ্টা আমাদের থেমে নেই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

অথচ, আমাদের এই উদ্ভবানী শক্তি হতে পারতো একটা আধুনিক মানবিক বিশ্বের। কিন্তু আমরা কেউ ই মানবিক না, কেউ না। শান্তির কথা, শান্তিচুক্তির কথা আমরা বারবার বলে মুখে ফেনা তুললেও বাস্তবে এ নীতির প্রশ্নে কতটুকু বিশ্বাসী? আবার শান্তিতে নোবেল পেয়েও আমরা অশান্তির রাজত্ব কায়েম করি এ ভূগোলেই! মিয়ানমারের মানবিক সরকার অং সান সূচি, শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দেখিয়ে ছাড়লেন, শান্তি মানে আগুনে জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে দাও সব। সীমান্তের ওপার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তিনি নিজ দেশ থেকে তাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেন। বাংলাদেশ মানবিক বলে এ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভাসানচরে বিশাল একটা জায়গাজুড়ে তাদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প নেয়া হয়েছে রাজকীয় হালতে।

কিন্তু, এ মানবিক বাংলাদেশের প্রতি কতটা মানবিক প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র? বাংলাদেশের সীমান্তের বেশিরভাগ একটা অংশজুড়ে ভারত। বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ২৭০২ দৈর্ঘ্যের ২৫৮২ মাইল ভারত আর বাকি ১২০মাইল মিয়ানমারের।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত একটি স্পর্শকাতর স্থানের নাম। সীমান্ত অতিক্রম করলেই আন্তর্জাতিক সীমানা বিরোধ আইনের লঙ্ঘন হয়। বিশ্বের অন্যান্য সীমান্তের ক্ষেত্রেও আইনটি আছে। সীমান্তে আইন লঙ্ঘন করার মানে এই নয় যে, গুলি করে মেরে ফেলা। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেভাবে মানুষ মারা হচ্ছে, এ নজির হয়তো বিশ্বের অন্য কোন সীমান্তে খোঁজ মিলবে না। কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ।

বিএসএফ বা বিজিবি সূত্র বলছে, সীমান্তে অপরাধের জেরেই এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। একটা প্রশ্ন খুবই পরিষ্কার যে, সীমান্তে হত্যার শিকার মানুষদের তালিকায় সবাই বাংলাদেশী। তাহলে, সীমান্তে কি একাই বাংলাদেশের লোকজন অপরাধে জড়িত? সীমান্তের ওপারে ভারতের লোকজন গরু বিক্রি, মাদকদ্রব্যসহ বিক্রিসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছে। আর এপার থেকে বাংলাদেশের লোকজন তা কিনতে গিয়ে মারা পড়ছেন। মৃত্যুর পরই থেমে থাকছে না, গরুচোর নয়তো অস্ত্রধারী মাদক ব্যবসায়ীর ট্যাগ নিয়ে লাম ফিরছে দেশে। যদিও বেশিরভাগ সময়ে নিহতদের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র বা মাদক পাওয়া যাচ্ছে না। সীমান্ত বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে মারা যাচ্ছে শত শত মানুষ, পঙ্গু অনেকেই।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিষয়ক নানা চুক্তি ও আলোচনায় বারবার যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার শূন্যের কোটায় নিয়ে আনা। সেটা না কমিয়ে বরং বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রে কাগজ-কলমে, সংবাদে এসব চুক্তিতে সম্মত হলেও সীমান্তে অহরহ হত্যা যেন কোনভাবেই থামছে না।

বিজ্ঞাপন

সীমান্তে সম্প্রতিও বেশ কিছু হতাহতের খবর মিলেছে। কুড়িগ্রামের বৌমারী সীমান্ত, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, ঠাকুরগাঁওয়ে সম্প্রতি প্রাণহানির খবর মিলেছে।

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের এভাবে হত্যা একদিকে যেমন থামছে না, অন্যদিকে মিলছে না বিচার। বাংলাদেশি নাগরিক ফেলানী খাতুন হত্যা ছিল একটি আলোচিত ঘটনা। ফেলানীকে হত্যার পর সীমান্তের কাটাতারে তাকে ঝুলিয়ে রেখেছিল বিএসএফ। শেষ পর্যন্ত ভারতের আদালতেও বিচার মেলেনি এ ফেলানী হত্যার।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র সূত্র বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান ৪১ জন, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ৩৫ জনকে, নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে। আর আহত হয়েছেন ২২জন, অপহরণ করা হয় ২২জনকে৷

সংস্থাটি আরও বলছে, গত ৫ বছরে এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে হত্যা করা হয়েছে ১৫৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে। ২০১৬ সালে হত্যা করা হয় ৪১ জন, ২০১৭ সালে ২৪ জন, ২০১৮ সালে ১৪ জন, ২০১৯ সালে ৪৩ এবং ২০২০ সাালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৪১ জন। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় সংখ্যাটা অনেকে বেড়েছে। যেভাবে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে আনার কথা থাকলেও বেড়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়ে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাইলের পর মাইল সীমান্ত পথে ঘুরেছি। সীমান্ত ছুঁয়ে যখন চলছি, তখন আমার হৃদয়টা যেন আঁতকে ওঠে। সীমান্তজুড়ে যেন এক ধরণের নিরব কান্না ভেসে আসে। থমথমে অবস্থা সবখানেই৷ সবটাজুড়েই আতঙ্ক। নির্বিচারে এভাবে গুলি করে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা যেন বিএসএফের নিয়ম হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের উচিত সীমান্ত হত্যা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া এবং সোচ্চার হওয়া। নিজ দেশের মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে, সে হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন ভূমিকা চোখে পড়ছে না। বরং অনেক মন্ত্রী-আমলাদের নিহতদের দোষারোপ করতে দেখা গেছে। সীমান্তে কারা চোরাকারবারের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও সরকারকে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ হবে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বাহিনীর কঠোরতার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সবাইকে আরও সোচ্চার হতে হবে। এছাড়া কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ালেই দেশে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা সম্ভব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)