চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য

রোযা ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের তৃতীয় বুনিয়াদ। দ্বিতীয় হিজরিতে এর ফরয বিধান মুমিনদের প্রতি অবতীর্ণ। ফরযের নেপথ্যে রয়েছে মহান উদ্দেশ্য।

ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় পর্যায়ে রোযা-সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্যবলি পর্যালোচনা করলে একথা প্রতীয়মান যে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি মুমিনজীবনে এক অনন্য মাত্রার সংযোজন, বড্ড কৃপাদান।

রব্বে কায়েনাত ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর।  যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

তাকওয়া বা পরহেজগারির শক্তি অর্জনে রোযার বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার ক্ষেত্রে এর রয়েছে এক দৈবশক্তি ; যা তাকওয়ার অন্যতম ভিত্তি।

একজন সুস্থ মানুষের শারীরিক সুরক্ষায় যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি আত্মার সুরক্ষায় ইবাদত।  পুষ্টিকর আহার দৈহিক শক্তির প্রধান উৎস। ভেজালমুক্ত খাবার শরীর সুস্থতার রক্ষাকবচ। অনুরূপ ইখলাসযুক্ত নিরেট ইবাদত-বন্দেগি আধ্যাত্মিক শক্তির অন্যতম হাতিয়ার। ইবাদত যতই রিয়া-লৌকিকতা মুক্ত হবে, তার গ্রহণযোগ্যতা তত দ্রুত এবং ফলপ্রসূ হবে।

পাক-কালামের ঘোষণা, ‘সেদিন (কিয়ামত দিবস) কোনো কাজে আসবে না সম্পদ ও সস্তানসন্ততি।  তবে যে মহান আল্লাহর নিকট পৌঁছবে নিষ্কলুষ অন্তঃকরণ নিয়ে’ (আসুরা আশ-শু‘আরা, আয়াত ৮৮-৮৯)।  রোযা অন্যতম রিয়ামুক্ত ইবাদত। নামায, হজ্ব, যাকাত, তিলাওয়াতে কুরআন ও অন্যান্য ইবাদতে বান্দা রিয়ামুক্ত হওয়া অনেকাংশে অসম্ভব; কিন্তু রোযা এমন ইবাদত, যা পালনে বান্দা সম্পূর্ণ রিয়ার ছোঁয়ামুক্ত।

জানতে পারলাম, রোযা-সিয়ামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো-তাকওয়া অর্জন। আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য এ রোযা চিরন্তন। হযরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘রোযা পালন অতি পূণ্যময় কাজ।

মানুষের দুটি শক্তি ; ফেরেশতা শক্তি ও পাশবিক শক্তি। রোযা-সিয়ামের মাধ্যমে পরাশক্তি পাশবিকতা লোপ পায়, প্রতিষ্ঠিত হয় ফেরেশতা শক্তি। আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রবৃত্তির দমনে রোযা একটি কার্যকরী হাতিয়ার’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, পৃ.৮৩)।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে এ মাসের নাম পর্যালোচনা আলিমগণের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-‘রমাযান’ শব্দটি ‘রমাযুন’ ধাতু হলে উৎকলিত। অর্থ-জ্বালিয়ে দেয়া, ভষ্মিভূত করা। সিয়ামসাধনার মাধ্যমে মানুষের দেহ ও অন্তর থেকে গুনাহসমূহ জ্বালিয়ে ভষ্মিভূত করে হৃদয়মূল এবং আত্মাকে পবিত্র করে বিধায় এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে ‘রমাযান’ বলে।

হযরত শায়খ আবদুল কাদের জিলানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘এ মাস (মাহে রমাযান) মানুষের শরীরকে গুনাহ থেকে বিধৌত করে এবং অন্তরসমূহকে পূতপবিত্র করে’ (গুনিয়াতুত তালেবিন, পৃ. ৩৭১)।

তাই, রোযা রেখে যাবতীয় অপকর্ম পরিহার করা নিতান্ত প্রয়োজন। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা, বিদ্বেষ, পরচর্চা, নিন্দা ও গিবতসহ সমুদয় গর্হিত কাজ বর্জনই রোযা কবুলের উপযুক্ততা। নতুবা এসব গুনাহের কাজ রোযার নিহিত পূণ্যের অন্তরায়। পাশবিক ক্রিয়ামুক্ত রোযার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ! (হাদিসে কুদসি)।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘রোযা-সিয়াম ৩ ধরণের।  যথা :

(১) সাধারণ লোকদের রোযা। আর তা হলো কেবল উদর ও লজ্জাস্থানকে প্রবৃত্তি হতে বিরত রাখা।

(২) বিশেষ লোকের রোযা। তা হলো সকল প্রকার গুনাহ থেকে শরীরকে মুক্ত রাখা।

(৩) সর্বোচ্চ স্তরের রোযা। তা হলো বান্দা নিজেকে আল্লাহ ব্যতিত সবকিছু হতে মুক্ত রাখা। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, রোযার রহস্য অধ্যায়।)

শেয়ার করুন: