চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিলেবাস শেষ না হলেও পরীক্ষা শেষ করতে চান ঢাবি শিক্ষার্থীরা

করোনাভাইরাসের কারণে পরীক্ষা বন্ধ ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। নানা পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সর্বশেষ অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩. ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে তাদের সিলেবাস সম্পন্ন করতে পারেননি। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষা শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। আর অনলাইনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার পক্ষে মতামত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকিরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি যে কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা দেবেন।

অনলাইনে পরীক্ষায় অনিচ্ছুকদের কারণ হিসেবে নেটওয়ার্কের সমস্যা, ডিভাইসের অপর্যাপ্ততা বা ত্রুটি থাকা এবং বাড়ির প্রতিকূল পরিবেশের কথা উল্লেখ করেছেন বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের সোস্যাল সায়েন্স রিসার্চ টিম গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করে।

১ জুন থেকে শুরু হওয়া জরিপটি চলে প্রায় মাসব্যাপী। জরিপে ৩৭৩০ জন শিক্ষার্থী তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। যাদের মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ১০৩৬, কলা অনুষদের ৯৬৯,  সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৬৭৯, ইন্সটিটিউটসমূহের ৩৯৯, জীববিজ্ঞান অনুষদের ২৩৯, বিজ্ঞান অনুষদের ১৫৭, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের  ৭৯, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের ৭৩, আইন অনুষদের ৬২, ফার্মাসি অনুষদের ২৭ ও চারুকলা অনুষদের ১০ জন। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৫.৫ শতাংশ ছাত্র এবং ৪৩. ৪ শতাং ছাত্রী এবং ১.১ শিক্ষার্থী নিজেদের লিঙ্গ প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলো। ব্যবসায় শিক্ষা ও কলা অনুষদ থেকে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। যথাক্রমে ২৬.৯ ও ২৬ শতাংশ। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের ৪৪.৫শতাংশ গ্রাম, ১৫.৭ শতাংশ ছোট শহর, ১৯.৩শতাংশ শহর ও ২০.৩% মহানগর এলাকায় অবস্থান করছেন।

জরিপে দেখা যায়, সমাপ্ত হওয়া অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে অসন্তুষ্টির পাল্লাই ভারি। অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে ২৩.১ শতাংশ শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট ও ২৩.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী খুব বেশি অসন্তুষ্ট বলে মত প্রকাশ করেছেন। তথা ৪৬.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট। অন্যদিকে ২৩.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী মোটামুটি সন্তুষ্ট, এবং মাত্র ২.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে সন্তুষ্ট বলে মতামত দিয়েছেন। বাকি ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট-কোনো মতামত দেননি।

বিজ্ঞাপন

জরিপ অনুযায়ী, ঢাবির শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাসের জন্য ৯৭.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জুম ও ৩৩.৭ শতাংশ গুগল মিট প্লাটফর্ম ব্যবহার করেন। সবচেয়ে বেশি, ৮৫.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী মোবাইল ও ১১.৭ শতাংশ ল্যাপটপের মাধ্যমে ক্লাসে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ৬৪.১ শতাংশ শিক্ষার্থী মোবাইল ডেটা, ৩৩ শতাংশ ওয়াইফাই, ২.২ শতাংশ ব্রডব্যান্ড এবং কিছু শিক্ষার্থী মোবাইল ডেটা ও ওয়াইফাই দুটোই ব্যবহার করেছিলেন।

ক্লাস-সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা থাকার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮৭.৪ শতাংশ অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে আগ্রহী। এছাড়াও ওপেন বুক পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিতে চান ২১.১ শতাংশ, এমসিকিউ পদ্ধতিতে ১৯.৭ শতাংশ,  সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তরে ১৯.৪ শতাংশ এবং বড় প্রশ্নোত্তর ৫.৪ শতাংশ পদ্ধতিতে এবং শুধুমাত্র ৪.২ শতাংশ শিক্ষার্থী লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

জরিপে অনলাইনে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা ভালো নেটওয়ার্ক সংযোগ না থাকায় ৫৭.৪ শতাংশ, বিদ্যুতের সমস্যা থাকায় ৩৮.১ শতাংশ, বাড়িতে পরীক্ষা দেওয়ার পরিবেশ না থাকায় ৪৫.৮ শতাংশ, প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকায় ২২.২শতাংশ, ডিভাইস বা ডেটা কেনার সামর্থ্য না থাকা ১৬.৬ শতাংশ, পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান থাকা ৫৭.৪ শতাংশ, অনলাইন পরীক্ষার অভিজ্ঞতা না থাকা ৪০.৬ শতাংশ এবং প্রস্তুতি না থাকাকে ২৭.৩  শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করেছেন। তাদের মধ্যে ৫২.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী স্বশরীরে পরীক্ষার হলে বসতে আগ্রহী এবং ১৭.১ শতাংশ শিক্ষার্থী অটো প্রমোশনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাছাড়া অনলাইন পরীক্ষার ব্যাপারে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীই হতাশ ২৬ শতাংশ, বাকিরা চিন্তিত ২৫.৭ শতাংশ, দ্বিধান্বিত ২৩.৯ শতাংশ, কিছুটা উচ্ছ্বসিত ১৭.৪ শতাংশ, এবং কিছু শিক্ষার্থী ৬.২ শতাংশ মন্তব্য নেই বলে মতামত দিয়েছেন।

অনলাইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল দক্ষতা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে ১২.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত দক্ষ, ২৯.৮ শতাংশ মোটামুটি দক্ষ, ২৪ শতাংশ কিছুটা দক্ষ, ১২.৪ শতাংশ দক্ষতার ব্যাপারে সন্দিহান এবং ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো দক্ষতা নেই বলে জানান। ইতোপূর্বে অনলাইনে অনুষ্ঠিত মিড-টার্ম বা সমমান পরীক্ষায় বিভাগ/ইনস্টিটিউট থেকে ৬২.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছিলেন, ২৩.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো রকম দিকনির্দেশনা পাননি এবং বাকি ১৩.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে মতামত দিয়েছেন।

জরিপে আরও দেখা যায়, বিভাগ/ইন্সটিটিউটে ডিভাইস বা আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করে সহায়তা পেয়েছেন মাত্র ৩.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী, ২৬.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আবেদন করেও এখনো সহায়তা পাননি এবং অবশিষ্ট ৬৭.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজে থেকেই আবেদন করেননি। অনলাইনে পরীক্ষার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত হলে সর্বোচ্চ ৩৯.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে, তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অন্তত ৩০-৪৫ দিন সময়ের প্রয়োজন পক্ষান্তরে মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী “আমি প্রস্তুত” ঘরে মত দিয়েছেন। ২৬.২ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের বিভাগ থেকে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স (বই পুস্তক, লেকচার শিট, রিডিং ম্যাটেরিয়ালস) পেয়েছেন, ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বেশিরভাগ কোর্স শিক্ষকের কাছ থেকে পেয়েছেন, ২৪.৯ শতাংশ কিছু পরিমাণে পেয়েছেন, ১৬ শতাংশ একদমই পাননি বলে মতামত জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল করিম  এবং কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডারস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপার্সন তাওহিদা জাহানের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধায়নে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ টিমের মো. তানবীরুল ইসলাম (টিম ম্যানেজার), সুমাইয়া ইমতিয়াজ (কো অর্ডিনেটর), মো. আতিকুজ্জামান, জাওয়াদ সামস, রাগীব আনজুম, মো. ওমর ফারুক ও সুমাইয়া আহমেদ। গবেষণা প্রবন্ধটি বিশ্লেষণ ও পুনর্বিন্যাসে সহযোগিতা করেছেন সংগঠনের সভাপতি নাসরিন জেবিন, সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক উদ্দিন, অর্থ সম্পাদক শাহরিন ফারাহ খান এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেক।

বিজ্ঞাপন