চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিনহা হত্যা: এসপি মাসুদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডে দেয়া চার্জশিটে কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেনের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‍্যাব।

মূলত টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের ইয়াবা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ভিডিও ইন্টারভিউ চাওয়ায় প্রথমে হুমকি ও পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রোববার কারওয়ান বাজারের র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা খুব স্পষ্টভাবেই একটি বিষয় সামনে এনেছেন। ঘটনায় সাক্ষী, আলামত, আসামিদের জবানবন্দির মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠভাবে নিশ্চিত হয়েছেন- এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

‘‘এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ। হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এবং অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’’

তিনি জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা মোট ৮৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ধরণের আলামত ও ডিজিটাল কনটেন্ট সংগ্রহ করে এটি হত্যাকাণ্ড বলে আাদালতে চার্জশিট দিয়েছেন।

‘‘ওসি প্রদীপের ষড়যন্ত্রে আরও পাঁচজন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন। তারা হলেন, পুলিশের সোর্স নুরুল আমিন, মো, আইয়াজ ওরফে আয়াজ, মো. নিজামউদ্দিন, পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দদুলাল এবং এপিবিএন এর তিন সদস্যের সহায়তায় এই সিনহা হত্যা সংঘটিত হয়।

পরে ফাঁড়ির এসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুল করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন আজাদ, কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল মামুন হত্যা নিশ্চিতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও ওসি প্রদীপকে সহায়তা করেন।’’

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘এখানেই শেষ নয়, ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি নাটক সাজানো হয়। সিনহার গাড়ীতে মাদক উদ্ধারের নাটক সাজান পলাতক সাগর দে ও রুবেল শর্মা। এর সবই করা হয় পূর্ব পরিকল্পনায়।’

বিজ্ঞাপন

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের একটি অডিও প্রকাশ পেয়েছিল। সে বিষয়ে তদন্তে কি মিলেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগ থেকেই ওসি প্রদীপ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এসেছিল। তা নিয়ে এসপি মাসুদ অত্যন্ত উদাসীন ছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফাসহ স্থানীয়দের নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যম আসার পরেও পুলিশ সুপার সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন।’

‘‘এছাড়া ঘটনা ঘটার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করে আহত মেজর সিনহাকে চিকিৎসা ব্যবস্থা না করাসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্ত কর্মকর্তা আমলে এনেছেন। পুলিশ সুপারের অপেশাদার আচরণ এবং দায়িত্ব পালনে আরো বেশি সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল বলে মনে করেন তদন্ত কর্মকর্তা।’’

র‌্যাব মুখপাত্র আরও বলেন, ‘সার্বিক ঘটনা বিবেচনায় একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ পুরা ঘটনা তদারকিতে ঘাটতি ছিল। এই পরিপেক্ষিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা মাসুদের আচরণের বিরুদ্ধে এবং দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন।’

‘‘তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন ঘটনার দিন রাতে নীলিমা রিসোর্টে অভিযান চালায় টেকনাফ থানা পুলিশ। পরবর্তীতে সেখান থেকে সিনহা মোহাম্মদ রাশেদের ল্যাপটপ উদ্ধার করেন। সেই ল্যাপটপ সর্বপ্রথমে টেকনাফ থানায় নিয়ে যায়। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে  নিশ্চিত হওয়া যায়। সিনহার ল্যাপটপে যে ডিজিটাল কনটেন্ট ছিল। সেগুলো তারা থানায় বসে ধ্বংস করেন।’’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন,  ‘ল্যাপটপে এমন কিছু ভিডিও ছিল যা প্রদীপ ও লিয়াকতের অস্তিত্ব সংকটে ফেলতে পারে। আমরা ডিজিটাল ডকুমেন্ট অনেক কিছু উদ্ধার করতে পারলেও ওই ভিডিওগুলো উদ্ধার করতে পারিনি।’

তিনি জানান, জুলাই মাসের ৭ তারিখে মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত, রূপতি তারা নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও ডকুমেন্টারি করার জন্য তারা টেকনাফ গিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে রূপতি ফিরে আসে। সে সময় সেখানে বেশ কিছুদিন থাকাকালীন সময়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আন্তরিকতা গড়ে ওঠে। তাদের কাছ থেকে ওসি প্রদীপের ইয়াবা বাণিজ্য নিয়ে নানা বিষয় জানতে পারেন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ।

এ বিষয়ে সিনহা ক্যামেরাসহ ওসি প্রদীপ এর কাছে বক্তব্য নিতে যান। সে সময়ে ওসি প্রদীপ তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে যায়। বক্তব্যের পরিবর্তে তাদেরকে টেকনাফ ছেড়ে চলে যাবার সরাসরি হুমকি দেন।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মূলত দুটি কারণে ওসি প্রদীপ এই ঘটনাটি ঘটান। একটি ওসি প্রদীপ এর ইয়াবা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়। অন্যটি সিনহা এই তথ্য যেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানতে পারেন। হুমকির পারেও যখন মেজর সিনহা রাশেদ তাদেরই ইউটিউব এর কাজ ও ইয়াবা অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। তখন ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও ওসি প্রদীপ সহ অন্যরা পরিকল্পনা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।’

‘‘হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ভার র‍্যাব পাওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম, ৪ মাস ১০ দিন পর আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছেন। ৮৩ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করে, ২৬ পৃষ্ঠার এই চার্জশিটে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করেছেন। এই ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন টেকনাফ থানায় বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য, তিনজন বরখাস্তকৃত এপিবিএন সদস্য, এবং তিন জন বেসামরিক ব্যক্তি। তাদের ১৪ জন কারাগারে আছেন। একজন পলাতক রয়েছেন। কারাগারে থাকা ১৪ জনের ভেতর ১২ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত দুজন সদস্য ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাশ, এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা জবানবন্দি দেননি।’’

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ খান।