চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাইকেল: করোনাপরবর্তী পাবলিক ট্রান্সপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ সমাধান

সাম্প্রতিক সময়ে একটা আশ্চর্য বিষয় খেয়াল করলাম, সরকার যা করছে তাতেই মানুষ বিরক্ত। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পুরো দেশবাসী যখন লকডাউন প্রত্যাশা করছিলো সরকার তখন ছুটি ঘোষণা করলো। মানুষ প্রচণ্ড বিরক্ত হলেও ছুটিকেই লকডাউন মনে করে যে যার অবস্থা থেকে মেনে নিতে চেষ্টা করেছে। আবার এ লকডাউন না মানার প্রবণতাও আছে। পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। একের পর এক বাড়ছে মৃতের ও আক্রান্তের সংখ্যা। কমার কোনও লক্ষণ নেই। কিন্তু দেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায়ই হোক বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক ‘লকডাউন’ শিথিল করার ঘোষণা দিতে হচ্ছে সরকারের। মানুষকে কাজে ফিরতেই হবে। নইলে আর কিছুদিন পরে করোনার চেয়ে হয়তো না খেয়ে থেকেই বেশি মানুষ মারা যেতে পারে এমন আশঙ্কা তো থাকেই।

পরিস্থিতি দেখে চারপাশের মানুষের সাথে যত কথা বলি, ততই উৎকণ্ঠা প্রকাশ পায়। ধারণা করা যায় ঈদ-উল-ফিতরের পর লকডাউন বা সাধারণ ছুটি তুলে নেয়া হবে। প্রচুর কাজের চাপ থাকবে মানুষের। হন্তদন্ত হয়ে আবার মানুষ রাজধানীতে ফিরবে। এক সপ্তাহেই হয়তো আবার স্বাভাবিক চেহারায় ফিরবে ঢাকা। আর চারশ বছরের পুরনো এই শহরের স্বাভাবিক চেহারা মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের চেহারা। এর মধ্যে গোপনে বাড়তে থাকবে করোনার সামাজিক সংক্রমণ। পাবলিক বাস, ট্রেন, লঞ্চে। সবখানেই গিজগিজ করা মানুষের মধ্যে একজন করেও যদি সংক্রমিত মানুষ ভুল করে উঠে যায় তাহলে ওই পরিবহনের অধিকাংশের তো বটেই সকলেরই সংক্রমিত হবার আশঙ্কা থাকে।

বিজ্ঞাপন

দুই কোটি মানুষের সমুদ্রে কত হাজার মানুষ একসাথে আক্রান্ত হবে তার চিন্তা করতেই সবাই ভয় পায়। আর অধিকাংশ মানুষের আশঙ্কা এই আক্রান্তের বড় জায়গা হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। আমিও তাদের সাথে তাই মনে করি। সন্ধ্যায় যখন অফিস ছুটি হয়, তখন উপসর্গ ছাড়া কোনও করোনাআক্রান্ত মানুষ যদি মতিঝিল, ফার্মগেট বা এমন জনাকীর্ণ স্থানে বাসে উঠতে চেষ্টা করে তাহলে তা কত সহজেই না ছড়াবে!

বিজ্ঞাপন

এমন আতঙ্কের মধ্যে তাহলে কি জীবন যাপন স্বাভাবিক হবে না? মানুষ কাজে যাবে না? অবশ্যই যাবে। কিন্তু সেটা কীভাবে সেটাই এখন প্রশ্ন।

এ অবস্থায় ঢাকা শহরের জন্য সবচেয়ে আদর্শ হতে পারে ব্যক্তিগত যানবাহন। কিন্তু রাজধানীর শতকরা নব্বই ভাগ মানুষেরই ব্যক্তিগত যানবাহন এফোর্ড করার ক্ষমতা নেই। তার মানে কি মানুষ এক প্রকার অনিশ্চিত মৃত্যুকে ডেকে আনবে ঘরে?

এ পরিস্থিতি থেকে রাজধানী ঢাকার মানুষকে বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকরি উপায় হতে পারে বাইসাইকেল। ব্যক্তিগত যানবাহন হওয়ায় করোনা পরিস্থিতির পর যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন তার জন্য সাইকেলের চেয়ে ভালো যোগাযোগ মাধ্যম আর হতে পারে না।

কেন হতে পারে না এ বিষয়ে বলি। তার আগে নিজের উদাহরণ দিয়ে নেই।

আমার অফিস থেকে বাসার দূরত্ব সোজা রাস্তায় ছয় কিলোমিটার। বাসের রাস্তায় আমি গেলে সেটা তিন কিলোমিটার বেড়ে যায়। সকাল আটটার অফিস করতে হলে আমাকে সোয়া সাতটার মধ্যে বাসে উঠতে হয়। সাতটা বিশ বেজে গেলে আমার অফিস পৌঁছাতে লেট হয় আধাঘন্টার বেশি। কিন্তু একই অবস্থান থেকে আমি যদি সাইকেলে যাই তাহলে আমার সময় লাগে বিশ থেকে ২৫ মিনিট। সব ধরনের ট্রাফিক সিগন্যাল মেনেই।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে আপনি যে অফিস কাজ করেন, সে অফিসে যেতে যতক্ষণ সময় লাগে আপনি নিশ্চয়ই তারচেয়ে কিছু বেশি সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হন। ধরুন মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে যেতে স্বাভাবিক জ্যাম মিলে আপনার সময় লাগে এক ঘণ্টা বা তার থেকে কিছুক্ষণ বেশি। মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসের রাস্তায় দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। এইটুকু রাস্তা বাসে যেতে এক থেকে দেড় ঘন্টার কাছাকাছি লাগে। কিন্তু একই রাস্তা যদি সাইকেলে যাওয়া যায় তাহলে সময় লাগবে সর্বোচ্চ চল্লিশ মিনিট। অতিরিক্ত যে সময়টা আরও বিশজন মানুষের সাথে ঘামের গন্ধে মিলে মিশে বসে থাকতে হয় তারো আগে বাসায় পৌঁছে রেস্ট নেয়াও সম্ভব হয়। এরচেয়ে বড় বিষয় হলো অপরিচিত মানুষ থেকে দূরে থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। এবং সেটা খুবই নিরাপদ পদ্ধতিতেই।

শহরভিত্তিক মানুষের জন্য সাইকেলের কথা বললেই সবার আগে যে প্রশ্নটা মনে আসে সাইকেল কি নিরাপদ কি না! এর উত্তরে বলা যায় বাস-মোটর সাইকেল যতটা দুর্ঘটনার কারণ তারচেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ সাইকেল। ঢাকা শহরে বাস দুর্ঘটনার যেমন তারচেয়ে তিনগুণ বা তারও বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার। কিন্তু সাইকেল দুর্ঘটনার হার সে ক্ষেত্রে খুবই কম। আর এই যানবাহনের গতি তুলনামূলক কম হওয়ায় অন্য যানবাহনের চেয়ে এর মাধ্যমে দুর্ঘটনায় মৃত্যুহারও কম।

কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, যে ঢাকার রাস্তায় তো একা নিরাপদ যানবাহন চালালেই দুর্ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কী? যেখানে একই সড়কে ভারি-হালকা-দ্রুতগতির ও স্বল্প গতির যানবাহন চলে সেখানে তো দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেশি। হ্যাঁ এ কারণেই ঢাকার রাস্তার সাইকেল চালকরা দীর্ঘদিন ধরেই একটা সাইকেল লেনের দাবি জানিয়ে আসছে। যাতে সাইক্লিংটা আরও নিরাপদ হয়। সাইকেলের পথ নিরাপদ হলে যে ঢাকার রাস্তায় সাইক্লিস্টের সংখ্যা বাড়বে এটা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।

পাবলিক ট্রান্সপোর্টের এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যম ছাড়াও সাইক্লিং অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর একটি ব্যায়াম। একটা স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের দিনে অন্তত দশ হাজার স্টেপ হাঁটা উচিত। চিকিৎসকরা এমন পরামর্শ সব সময়ই দিয়ে থাকে। কিন্তু শতকরা একজনও এই কথা মানে না। আমরা হাঁটি না। আমাদের শরীরে স্থুলতা বাসা বাধে। আর এক সময় ডায়াবেটিস ও ব্লাডপ্রেসার বাড়ে সাথে যোগ হয় হৃদরোগের আশঙ্কা। অথচ নিয়মিত সাইকেল চালালে হাঁটার কাজটা হয়। জ্যামে বসে অন্য মানুষও ঘুমাতে ঘুমাতে ঘাড়ের ওপর পড়ে যায় না।

এ ছাড়াও আরেকটা বিষয় আছে যেটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চোখে পড়ে না। সেটা অর্থনৈতিক। আপনি যদি সাইকেল চালান, তাহলে সারা বছর আপনার বাসের ওপর নির্ভরতা কমবে। আপনি যখন-তখন নিজের সুবিধামতো চলতে পারবেন। কেবল অফিস-বাসা বা বাসা-অফিস না অন্য সময়ও আপনার অন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ঝামেলা মেটাতে সক্ষম একটা সাইকেল। পাশাপাশি সাইকেল যে একটা পরিবেশবান্ধব যান সেটা কে না জানে!

জাতিগত স্বাস্থ্য ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে সরকারের উচিত তাই সাইকেল চালানোকে উৎসাহ দেয়া। একজোড়া কাজের মাধ্যমে সরকার এই উৎসাহটা খুব সহজে দিতে পারে। প্রথমত একটা সাইকেল লেন চালু করা। দ্বিতীয়ত সব ধরনের কর্মজীবীদের জন্য সাইকেল কেনার জন্য বিনা সুদে ঋণ দেয়ার ঘোষণা। এই দুই সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন আরেকটা সেক্টরকে শক্তিশালী করবে।

এখানে আরেকটা তথ্য যোগ না করলেই নয়, বাংলাদেশে তৈরি বাইসাইকেল এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সরকার সাইক্লিংকে অনুপ্রাণিত করে তাহলে একটা নগরভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বনির্ভর জাতি সৃষ্টি হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এর জন্য প্রয়োজন সবার আগে ইচ্ছা ও একটু চেষ্টা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)