চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সরকার কী আসলেই করোনা আক্রান্তের তথ্য গোপন করছে

দিন যতই যাচ্ছে ততই নোবেল করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা তীব্র হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। প্রতিষেধক বা পরিত্রাণের পথ হিসেবে বলা হচ্ছে- নিয়মিত হাত ধোয়া,স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, আইসোলেশনে থাকা, ঘরের বাইরে না যাওয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা। আর এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই চলছে ঘোষিত বা অঘোষিত লকডাউন। যেখানে বলা হয়েছে একেবাইরেই ঘরের ভেতরে থাকতে, বাইরের কারো সাথে মেলামেশা না করতে। কারণ করোনা ভাইরাস মারাত্বক ছোঁয়াচে রোগ। দ্রুতই এই রোগ একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই করোনা ভাইরাসের উৎস ভূমি চীন থেকে শুরু করে ইতালি, স্পেন, জার্মান, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত সর্বত্রই চলছে লকডাউন। শ্রীলঙ্কা, সৌদিআরবসহ অনেক দেশেই বিশেষ বিশেষ অঞ্চল বা স্থানে কারফিউও জারি করা হয়েছে।

জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি প্রদত্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ( বেলা ৪ টা, ৩ এপ্রিল ২০২০) করোনা ভাইরাসে এ পর্যন্ত মৃতের মোট সংখ্যা ৫৩ হাজার ১৭৯ জন। গত কয়েকদিন ধরে মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। মৃত্যৃর হিসেবে যে দশটি দেশে সবচেয়ে বেশি সেগুলো হলো-ইতালি (১৩৯১৫ জন), স্পেন (১০৩৪৮জন), ফ্রান্স ( ৫৩৮৭ জন), চীন(৩২০৩ জন), যুক্তরাজ্য (২৯২১ জন), যুক্তরাষ্ট্র ( ১৫৬২ জন), নেদারল্যান্ড (১৩৩৯ জন), জার্মান (১১০৭জন), বেলজিয়াম (১০১১জন)। এদিকে সবচেয়ে বেশি যে সব দেশে করোনা রোগী শনাক্ত করা গেছে সেই তালিকায় যে দশটি দেশ উপরের দিকে রয়েছে সেগুলো হলো-আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, জার্মান, চীন, ফ্রান্স, ইরান, যুক্তরাজ্য, সুইজাল্যান্ড, তুরস্ক এবং বেলজিয়াম।

বিজ্ঞাপন

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট -এর হিসেব অনুযায়ী আমাদের দেশে করোনায় এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬১ জন। এর মধ্যে মোট ৬ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আইইডিসিআর ৭ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের বিষয়টি ঘোষণা করে। ১৮ মার্চ কোভিড-১৯ এ প্রথম মৃত্যুর কথা জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট।প্রতিদিন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা  ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত আপডেট দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই রোগের যে গতি তা আক্রান্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম। এমন কী প্রতিবেশী ভারতেও এই ভাইরাস যেভাবে প্রভাব বিস্তার সেই তুলনায় আমাদের দেশে তার গতি বেশ মন্থর।
তবে শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এরকম অভিযোগ করছেন যে সরকারের পক্ষ থেকে করোনায় আক্রান্তদের সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। অনেকেই এই অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে বহুবিধ যুক্তি তর্ক প্রদর্শন করছেন। তবে যারা বলছেন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি তারা যে খূব একটা যুৎসই তথ্য, উপাত্ত বা পদ্ধতি উপস্থাপন করে বলেছেন তা নয়। কিন্তু ১ এপ্রিল ড. আসিফ নজরুল এই বির্তকে বেশ ভালোই উসকে দেন তাঁর ফেসুবকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে।

বিজ্ঞাপন

ঐদিন ৭টা ২ মিনিটে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে প্রশ্ন তোলেন- ‘দেশে করোনা রোগী আসলে কতো? তিনি বলেন, আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনার দেওয়া তথ্যানুযায়ী ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৫ জন তাদের ফোন করেছেন। এরমধ্যে আইইডিসিআর নমুনা সংগ্রহ করেছে মাত্র ১,৩৩৮ জনের, তার মানে মাত্র ০.১৪ শতাংশের। এ ১৩৩৮ জনের মধ্যে নমুনা পরীক্ষায় করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ৪৯ জন। ১৩৩৮ জনের মধ্যে করোনা রোগী ৪৯ জন। ঐকিক নিয়মে ফোনকারী সকলের (৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৫ জন) টেস্ট করা হলে আক্রান্ত পাওয়া যেতো ৩৪ হাজার ৯ শত ৯০ জন। এ হিসেবে দেশে করোনা আক্রান্ত আছে আনুমানিক প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ।

প্রশ্ন আসবে আইইডিসিআরতো লক্ষণ শুনে বাকিদের টেস্ট করেনি, তাহলে তাদের মধ্যেও এতো করোনা রোগী পাওয়া যাবে কেন? উত্তর হচ্ছে তারা যাদের টেস্ট করেনি, বা করতে চায়নি, তাদের মধ্যে করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া লোকের সংবাদ আমরা পাচ্ছি প্রায় প্রতিদিন। করোনায় যাদের মৃত্যুসংবাদ আমরা পাই তাদের মধ্যে বরং টেস্ট করা হয়নি এমন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। সে বিবেচনায় স্বেচ্ছাচারভাবে যাদের টেস্ট করা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে করোনা রোগীর হার কোনভাবে কম থাকার কথা না। আরেকটা কথা। বাংলাদেশে সবার কি তাদেরকে ফোন করার মতো সুযোগ, সচেতনতা বা সাহস আছে? সবাই কি ফোন করে লাইনে ঢুকতে পেরেছে? এদের সংখ্যা যদি যারা ফোন করেছে ও কানেক্ট করতে পেরেছে তাদের সমানও হয় তাহলে করেনো রোগীর সংখ্যা হবে আরো বেশি। আপাতত যদি ৩৫ হাজারই ধারণা করি, তাহলেও তা ভয়ংকর শোনায় না? এর যদি ২৫ শতাংশও সঠিক হয় তাহলে সংখ্যাটি আনুমানিক প্রায় ৯ হাজার। প্রশ্ন হচ্ছে আর কতো মানুষকে সংক্রমন করে যাচ্ছে এরা না জেনে কিছু?’

আসিফ নজরুলের এই অনুমান নির্ভর মন্তব্য নিয়ে বেশিরভাগই প্রশ্ন করে বলেছেন সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান না চালিয়ে এ ধরনের একটি স্ট্যাটাস দেওয়া অন্যায় এবং অগ্রহণযোগ্য। জহিরুল ইসলাম জহির নামে একজন লিখেছেন- ‘ঋতু পাল্টালে, মানুষের সর্দি-কাশি-জ্বর ইত্যাদি দেখা যায়, তাই বলে সবাইকে করোনায় আক্রান্ত বলা যেতে পারে না। শুধুমাত্র যাদের মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা যাবে, তাদেরকেই পরীক্ষা করা হচ্ছে, একেবারে সবাইকে পরীক্ষা করতে হবে বলাটা বোকামি এবং আপনাদের নোংরা রাজনীতি।’

বিজ্ঞাপন

এএইচএম ফারুক নামে একজন লিখেছেন- ‘আপনার পরিসংখ্যানটা সরল ঐকিক। আরও কিছু ইনফরমেশন নিলে আপনার যুক্তি ও সংখ্যা আরও গ্রহণযোগ্য আকারে নিরুপণ হতো। কেননা আমাদের সাংবাদিকগণ শ্বাসকষ্টে মারা যাওয়া যাদেরকে করোনা রোগী বলে প্রচার করছেন তাদের প্রথমদিককার ১০ জনের টেস্ট করে একজন পজিটিভ পাওয়া গেছে। সুতরাং বলা যায় যারা কল করেছেন বা যাদের পরীক্ষা হয়নি তারা সকলেই করোনা পজিটিভ নন।’

আমাদের দেশে এখন কেউ মারা গেলেই এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের সরল অনুমানও যে জনমনে প্রশ্ন ও ভীতি তৈরি করবে সন্দেহ নেই। আর মৃত ব্যক্তির যদি শ্বাসকষ্ট থেকে থাকে তাহলে আরও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত বলে সে সব মৃতদেহ সামাজিকভাবেও অবজ্ঞার শিকার হচ্ছে। আমাদের দেশে হাঁচি, কাশি, সর্দি-জ্বর, গা ব্যথা সাধারণ রোগের মতোই। বিশেষ করে নিন্ম আয়ের মানুষ, বস্তিবাসী, দিনমজুর, শ্রমিক যারা নিত্য পুষ্টিতে ভুগেন তাদের মাঝে এই রোগের প্রবণতা বরাবরই বেশি। একই সাথে পরিসংখ্যান বলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েও অনেক মানুষ মারা যায়।

এছাড়া ক্রোনিক অবস্ট্রাকটিভ পুলমোনারি ডিসিজ বা দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টজনিত রোগেও (সিওপিডি) অনেক মানুষ বাংলাদেশে মারা যায়। এসব রোগী বরাবরই অতিরিক্ত শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকে। লন্ডনভিত্তিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিওপিডিতে বাংলাদেশে বছরে ৬৭,৩৩২ জন মানুষ মারা যায়। এ রোগ এখন তৃতীয় মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ সিওপিডিতে ভুগছে। এ ধরনের রোগীর অবস্থান এবং কীভাবে মারা যাচ্ছে সেগুলোরও একটা পরিসংখ্যান রেকর্ড দেশের স্বাস্থ্যবিভাগের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সেটা করা হল ড. আসিফ নজরুলদের মতো যারা একটা পরিসংখ্যান দিয়ে বাহবা নিচ্ছেন তাদের সরকার যুৎসই উত্তর দিতে পারবে। করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিয়ে একই বিতর্ক শুরুতে খোদ ভারতেও হয়েছে। সেখানেও কেউ কেউ এ ধরনের অভিযোগ এনে বলেন যে, সরকার তথ্য গোপন করছে। কিন্তু ভারতের রাজ্যসরকার তা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তথ্যই গোপন করা হচ্ছে না। এবং যাকে তাকে করোনা টেস্ট করার প্রয়োজনও নেই।

করোনাভাইরাসের তথ্য গোপন করা বা না করা সম্পর্কে অনেকেই মনে করেন তথ্য গোপন বা ধামাচাপা দিয়ে সরকারের কোনো লাভ নেই। কারণ এটি এমন একটি ভাইরাস যা দ্রুতগতিতে ছড়ায়, সুতরাং তথ্য গোপন করলে সরকারেরই ক্ষতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার সেই ঝুঁকি কেন গ্রহণ করবে? এ ছাড়া এটি কোনো একক দেশের সমস্যা নয় যে তথ্য গোপন করে বা ধামাচাপা দিয়ে রক্ষা পাওয়া যাবে। তবে করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে করে আমাদের অতিসতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে চারদিকে বেশ সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ছে। বিভিন্ন জেলা উপজেলাতে ত্রাণ বিতরণের নামে যেভাবে লোকসমাগম করা হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর আহবানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ কারণে অনেকক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই আরও কঠোর হতে হবে। কারণ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে আমাদের জনঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে আমরা প্রবল ঝুঁকির মধ্যে আছি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরোর বস্তিশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট বস্তিবাসী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২২ লক্ষ ৩২ হাজার ১১৪ জন-যা হচ্ছে দেশের মোট শহরে বসবাসরত অধিবাসীর ৬.৩৩ শতাংশ। বস্তিবাসীর দিকেও আমাদের নজরদারি রাখতে হবে।

আমরা দেখছি পাশের দেশ ভারতে এই ভাইরাস শেষ দুদিন থেকে বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে আমাদের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। কেননা উচ্চ তথ্যপ্রযুক্তি ও অসীম সম্পদের দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই ভাইরাসের কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা কম দেখে কোনোভাবেই আত্মতৃপ্তি খোঁজার সুযোগ নেই। সরকারের নীতি নির্ধারকদের উচিত হবে আরও নিবিড় ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করে সব গুজবকে অসত্য প্রমাণিত করা। ড. আসিফ নজরুলদের অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণ করা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)