কোটা হচ্ছে একটি সংরক্ষিত পদ্ধতি কিংবা সিস্টেম যেখানে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমগ্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্য এবং অন্যান্য যে কোন সেক্টরে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ প্রদান করা হয়। কিছু কিছু সেক্টরে বৈষম্য রোধ করার জন্য কোটা সিস্টেম দেওয়া হয়ে থাকে রাষ্ট্র কর্তৃক এবং সেটা অবশ্যই রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্যই। পাশাপাশি কোটা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই প্রদান করা হয়ে থাকে এবং যে বিষয়ে কোটা প্রদান করা হয়ে থাকে সেটা থেকে ঐ গ্রুপ কিংবা যাদের জন্য কোটা দেওয়া হয়েছে তারা যদি পরবর্তীতে ইতিবাচকতায় চলে আসে তখন কোটা সিস্টেম প্রত্যাহার করা হয় তথা সংস্কার করা হয় এবং এটাই বাইরের দেশে হয়ে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় এক অভিভাবককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভর্তি পরীক্ষায় কেন উপজাতি কোটা দেওয়া হয়? তিনি যা বলেছিলেন সে উত্তরটা আজও মানসপটে অমলিন। তিনি বলেছিলেন: উপজাতিদের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্যই কোটা দেওয়া হয়ে থাকে যাতে তাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি তথা পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার প্রয়াস পায়। বিষয়টা আসলেই সঠিক, কারণ কোটা দেওয়ার মাধ্যমেই উপজাতি ছেলেমেয়েরা পূর্বের তুলনায় বেশি পরিমাণে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এবং তাদের মধ্যে প্রচলিত সংস্কৃতির ছোঁয়া লেগেছে এবং তাদের কমিউনিটিতে সেগুলোর প্রচলন দেখা যায়। তবে একটা নির্দিষ্ট সময় পরে কিন্তু উপজাতি কোটা থাকবে না বাংলাদেশে কারণ তাদের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং এ দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয় এবং পরিবর্তিত হয়। তাই সরকারের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সরকারের পলিসি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের উপর বর্তায় তারা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে সরকারের চাকরি করে থাকে। কাজেই পলিসি বাস্তবায়নের সাথে যাদের সম্পৃক্ততা থাকে তাদেরকে অবশ্যই মেধাবী, বিচক্ষণ, স্মার্ট, আধুনিক ও চ্যালেঞ্জিং বিশ্বের প্রতিযোগিতায় উপযুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এ ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেলবন্ধন বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিখুঁত হওয়া অত্যাবশ্যকীয় এবং সেটা হওয়া প্রয়োজন দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই।
বাংলাদেশে এ নিখুঁত নিয়োগের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হচ্ছে কোটা সিস্টেম বহাল রাখা। কোটা সিস্টেমের কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশ ও দেশের উন্নয়ন হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। কোটা থাকার কারণে যেখানে একজন চাকরি প্রার্থী ৪০ পেয়ে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে সেখানে একজন মেধাবী ৬০ পেয়েও চাকরি পাচ্ছে না। বিষয়টা চরম বৈষম্যের এবং সেটা আরও ভোগান্তির হয় যখন দেখা যায় শুধুমাত্র কোটাধারীদের জন্য সরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। কাজেই কোটার সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বার্থেই।

বাংলাদেশের পবিত্র রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবিধান।সংবিধান এর আলোকেই বাংলাদেশ পরিচালিত হয়ে আসছে। জাতীয় কোন সংকট তৈরি হলে আমরা সংবিধান ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের স্মরণাপ্ন্ন হই। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ নং ধারার ১ ও ২ নং অুনচ্ছেদে স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে: বাংলাদেশের নাগরিকগণ সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ লাভ করবে যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, বিশ্বাস, গোত্র, বর্ণ, প্রথা কোনরূপ প্রভাব ফেলতে পারবে না। তাহলে সরকারি চাকরিতে যে কোটার প্রথা এখনো বলবৎ রয়েছে তা কি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়? অবশ্যই সাংঘর্ষিক। অতি দ্রুত এহেন অবস্থা পরিবর্তনের স্বার্থে তড়িৎগতিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি এও বলা রয়েছে: শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার কৌশল ও পরিচালনায় নিয়োগে ভূমিকা রাখতে পারে এবং এরকমটিই সকলেই প্রত্যাশা করে থাকে। কাজেই সংবিধানের আলোকে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার অবশ্যাম্ভাবী।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় ধর্মের ভিত্তিতে। বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা নানাভাবে শোষিত, লাঞ্জিত ও নিগৃহীত হয়েছিল। শোষণের প্রতিবাদে সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রাণের স্বাধীনতা। যে স্বাধীন দেশে থাকবে না কোনরূপ শোষন, বঞ্চনা ও নির্যাতনের ইতিহাস। কারণ, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্র। স্বাধীনতা লাভের আজ ৪০ বছর পরেও কি আমরা পেরেছি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। কোটা ব্যবস্থা কি শোষণের প্রতিচ্ছবি নয়? অবশ্যই শোষণের প্রতিচ্ছবি। তবে ক্ষেত্রবিশেষে দেশের স্বার্থে কোটা রাখা যেতে পারে এবং তার হারও খুব স্বল্প হওয়া উচিত। কারণ স্বাধীন দেশে সকল মানুষের জন্যই সমান সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারের পক্ষ হতে। সেখানে কোটা ব্যবস্থা অবশ্যই একটি প্রতিবন্ধকতা।
কোটার সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ কোটা থাকার কারণেই অনেক মেধাবীরা সরকারি চাকরি বিমুখ হয়ে পড়ছে যা আমাদের জাতির জন্য খুবই বেদনাদায়ক। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে শতকরা ৫৬ ভাগ নিয়োগ হচ্ছে কোটার ভিত্তিতে বাকি ৪৪ শতাংশ নিয়োগ পাচ্ছে মেধার ভিত্তিতে। স্বাধীনতার পরে সরকারি চাকরিতে কোটার যে শতাংশ বজায় ছিল পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে এসে বর্তমান অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
১৯৭২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র ২০ শতাংশ চাকরি মেধা কোটায় বরাদ্দ ছিল, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, নির্যাতিতা মহিলারা ১০ শতাংশ এবং জেলা কোটায় শতকরা ৪০ ভাগ চাকুরি পাওয়া যেত। ১৯৭৬ সালের পরিসংখানে দেখা যায়, মেধা কোটায় শতকরা ৪০ ভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০ জন, নারী কোটায় ১০ জন, নির্যাতিতা নারী কোটায় ১০ জন এবং জেলা কোটায় ১০ জন সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেতেন। পরের সংশোধনীতে দেখা যায়, শতকরা ৪৫ শতাংশ মেধা কোটায়, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায়, ১০ শতাংশ নারী কোটায়, ৫ শতাংশ উপজাতি কোটা এবং জেলা কোটায় ১০ শতাংশ চাকরি পেয়ে থাকে। এখন আরেকটি সংস্কারের সময় এসে পড়েছে এবং সারা বাংলাদেশে যুব সমাজের মানববন্ধন সত্যিকার অর্থেই সংস্কারের পক্ষে তাদের জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছে। পাশাপাশি তাদের দাবির স্বপক্ষে যুক্তিও দেখিয়েছে।
কোটা সিস্টেমের নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। চাকরি পরীক্ষায় যে পরীক্ষার্থী ৪০ পান আর যিনি ৬০ পান নিঃসন্দেহে তারা সমপর্যায়ের মেধাবী নয়। কিন্তু কোটা থাকার কারণেই ৪০ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ এবং দেশের মানবসম্পদ। মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে সরকারি চাকরিতে। পাশাপাশি কোটা সিস্টেম থাকায় এক শ্রেণির যুবকের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যুবক শ্রেণির হতাশা ও ক্ষোভের কারণে দেশকে কঠোর মূল্য দিতে হতে পারে। তাই জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ মেধাবীদের মূল্যায়ন না করতে পারলে নেতৃত্বে সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। কাজেই সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে মেধাবীদের মূল্যায়নের জন্য সরকার সহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ রাখছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








