চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সবার উপরে আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু

সাবেক তারকা ফুটবলার আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুকে ফোন করতেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এতদিন পর আমাকে যে শ্রদ্ধা জানিয়েছে তা তুলনাহীন। আমার আবেগ-অনুভূতি দিয়ে বুঝাতে পারব না আমি কতোটা খুশি! আমার মনে হয়েছে এএফসি আমার ফুটবল জীবনের সাফল্য-অর্জন তুলে ধরে আমাদের ফুটবলকেই আলোকিত ও আরও উৎসাহিত করেছে। কিছুই নয়, ফুটবলে ইতিহাসের আমার উজ্জ্বলতরো অংশটুকু জেনে তরুণ ফুটবলাররা ভীষণ উৎসাহিত হবে বলে আমি মনে করি।’

এই করোনাকালে দেশের ক্রীড়াঙ্গন যখন হিম হয়ে আছে ঠিক তখনই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) দেশের স্বর্ণযুগের তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। কূশলী ফুটবলার হিসেবে চুন্নুর নামটি বহু আগেই ইতিহাস। ঘরোয়া ফুটবল লীগ এবং জাতীয় দল দু জায়গাতেই চুন্নু দীর্ঘসময় ধরে দারুণ সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। ঘরোয়া লীগে তিনি বরাবরই খেলেছেন আবাহনীতে। আবাহনী ছেড়ে কখনই কোথাও যাননি। আবাহনী থেকেই ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন ৮৮ সালে। আর জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৭৫ থেকে একটানা ৮৫ সাল পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

গত ২৫ জুন এএফসির পক্ষ থেকে সাবেক তারকা ফুটবলার চুন্নুর আন্তর্জাতিক ফুটবলে অসাধারণ কৃতিত্বকে তাদের অফিসিয়াল ফেসবুকে তুলে ধরে। শুধু ফেসবুকই নয়, এএফসির পক্ষ থেকে চুন্নুর কৃতিত্বকে এএফসির টুইটার ও ইনস্টিগ্রামেও পোস্ট দেওয়া হয়। এএফসির পক্ষ থেকে চুন্নুর তিনটি অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমত: চুন্নু হলো সেই প্রথম বাংলাদেশী ফুটবলার যিনি ১৯৮০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এএফসি এশিয়ান কাপে প্রথম গোল করার কৃতিত্ব দেখান।

দ্বিতীয়ত: আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু ১৯৮৩ সালে প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে জাতীয় দলের হয়ে নেপালের বিপক্ষে প্রথম হ্যাট্টিক করেন।

তৃতীয়ত: বাংলাদেশী ফুটবলার হিসেবে ১৯৮৫ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ভারতের বিপক্ষে প্রথম গোল করেন।

চুন্নুর প্রথম কীর্তির কথায় আসা যাক। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ কুয়েতে অনুষ্ঠিত ৭ম এএফসি এশিয়ান কাপের ফাইনাল পর্বে অংশগ্রহণ করে। এই প্রতিযোগিতায় গ্রুপ ‘এ’ তে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ইরান এবং চীন। শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার সাথে প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় কুয়েতের সাবাহ আল সালেম স্টেডিয়ামে। এই ম্যাচে চুন্নু অসাধারণ এক গোল করেন।

বিজ্ঞাপন

চুন্নুর দ্বিতীয় অনন্য কৃতিত্ব বাংলাদেশের কোনো ফুটবলার হিসেবে হ্যাট্রিক সাফল্য। ১৯৮৩ সালে ঢাকাতে তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করা হয় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ। এই প্রতিযোগিতায় ৫ সেপ্টেম্বর গ্রুপ লড়াই-এর তৃতীয় ম্যাচে নেপালের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ জাতীয় দল। এ ম্যাচে ৪-২ গোলের ব্যবধানে নেপালকে পরাজিত করে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে হ্যাট্রিক করেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। এএফসি চুন্নুর এই হ্যাট্রিককেই বাংলাদেশী কোনো খেলোয়াড়ের প্রথম হ্যাট্রিক হিসেবে চিহ্নিত করে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়ের প্রথম গোলটাকেও বড় করে দেখছে এএফসি। আর তাই স্বীকৃতিটা মেলেছে চুন্নুরই। কেননা তৃতীয় ম্যাচ ভারতের বিপক্ষে চুন্নুই প্রথম গোল করেন। ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফুটবলের বাছাই পর্বে খেলার সুযোগ লাভ করে। বাছাই পর্বের গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত। ১৮ মার্চ জাকার্তার সিনেয়ান স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের প্রথম ম্যাচে খেলে। সে ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার কাছে বাংলাদেশ ২-০ গোলে হেরে যায়। এরপর ২৩ মার্চ ব্যাংককের ইয়ুথ ওয়েলফেয়ার সেন্টারে থাইল্যান্ডের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এ ম্যাচে থ্যাইল্যান্ডের কাছে ৩-০ গোলে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। এরপর ৩০ মার্চ ৮৫ ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে। এই খেলায় ৩৪ মিনিটে ভারতের শিশির ঘোষ প্রথম গোল করেন। কিন্তু ৪২ মিনিটে আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু দেশের পক্ষে গোল শোধ করেন। প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ এই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের ৮৪ মিনিটে ভারতের বিকাশ পাঁজির গোলে বাংলাদেশ হেরে যায়। ভারতের সাথে করা গোলটিই এএফসির বিবেচনায় বাংলাদেশের পক্ষে অন্যতম এক গোল। আর যে গোলটি করে ইতিহাস হয়ে আছেন সাবেক লেফট উইংগার চুন্নু।

তবে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে চুন্নুর আরও এক কৃতিত্ব রয়েছে যা এখনও ক্রীড়ামোদীদের স্মৃতিপটে অক্ষত রয়েছে। ৮৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে প্রথম জয়ের দেখা পায়। এদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে ফিরতি ম্যাচে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে। প্রথমে বাংলাদেশই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার বামবাং নুরদিয়ানসে ১১ মিনিটের সময় গোল করে দলকে এগিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধের ৭৫ মিনিটের সময় কায়সার হামিদ বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম গোল করেন। কিন্তু ৬ মিনিট পরেই আসল চমকটা দেন চুন্নু। ৮১ মিনিটে চোখ ধাঁধানো ফ্রি কিকে জয়সূচক গোল করেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। চুন্নুর করা এই গোলটিকে অনেকেই ব্যানানা শট বলে অভিহিত করেন। চুন্নুও মনে করেন মাঠের ডানপ্রান্ত দিয়ে প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে করা সুইং শটের গোলটি এখনও ইতিহাস হয়ে আছে। এই গোলটি ফুটবলমোদীদের হ্নদয় থেকে মুছে যায়নি।

চুন্নুর কৃতিত্ব এখানেই শেষ নেই। আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর মতে, আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের পক্ষে তিনিই সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন। তাঁর দাবি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি মোট ১৭টি গোল করেছেন। আফগানিস্তান, সুদান, শ্রীলংকা, উত্তর কোরিয়া, ওমান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক ম্যাচে তাঁর গোল রয়েছে এবং যে ম্যাচগুলো ফিফা কর্তৃক আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর মতে, এ বিষয়ে বাফুফের একটি অফিসিয়াল এনাউন্সমেন্টের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, যদি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অন্য কারো বেশি গোল থাকে তাহলে তথ্যপ্রমাণসহ সেগুলোরও একটা সুন্দর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গনে চুন্নু বরাবরই এক আকর্ষণীয় নাম। বিরল এক লেফট উইংগার হিসেবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তাঁর নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। লেফট উইংগার পজিশনে খেলেও একাধিক গোল করার অনবদ্য কৃতিত্বে তিনি বরাবরই উজ্জ্বল। তবে চুন্নু মনে করেন ৭৮ ও ৮২ সালে তিনি যদি জাতীয় দলের হয়ে সব ম্যাচ খেলতে পারতেন তাহলে তিনি অবশ্যই আরও গোল করার কৃতিত্ব দেখাতে পারতেন। সেই আফসোসটাও তাঁর রয়ে গেছে। ৭৮ ও ৮২ সালে এশিয়ান গেমসে খেলা হয়নি তার। সেই পুরনো স্মৃতি টেনে বলেন, ‘৭৮ সালে আবাহনীর নান্নু ভাইকে জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন করা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় বাফুফের সাথে। সেই দ্বন্দ্বের জের ধরে আশরাফ ভাই, সালাহউদ্দিন ভাই, অমলেশসহ আমরা মোট ছয়জন ফুটবলার ক্যাম্প থেকে ওয়ার্কআউট করি। সে সময় এনএসসির চেয়ারম্যান ছিলেন এইচএম এরশাদ। তিনি আমাদের ছয় বা দশ মাসের জন্য সাসপেন্ড করেন। আর ৮২ সালে দিল্লী এশিয়ান গেমস খেলতে পারিনি জেলে থাকার কারণে। সে বছর ২১ সেপ্টেম্বর রাতে জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় এনএসসি থেকে সালাহউদ্দিন ভাই, হেলাল, আনোয়ারসহ আমাদের চারজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৭ দিন পর জেল থেকে মুক্ত হই। ফলে দিল্লী এশিয়ান গেমস থেকে বাদ পড়ি।

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু সেই ৮৮ সালে মাঠ ছাড়লেও ফুটবল কখনই ছেড়ে যাননি। ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরপরই আবাহনীর অফিসিয়াল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সবশেষে যুক্ত হন শেখ জামাল ক্লাবের সাথে। জীবনের অবসর সময়টুকু তিনি ফুটবলের পেছনেই ব্যয় করেন। সব আঁধার পেরিয়ে ফুটবলকে আলোর মুখ দেখাতে এখনও যারা একনিষ্ঠ চুন্নু তাদের মধ্যে অন্যতম। ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবার চুন্নুর ফুটবল জীবনের দিনগুলো নিয়ে এএফসসি মুখরিত হওয়ায় চুন্নু নতুন করে ভীষণ উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা হয়েছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)