চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় শাইখ সিরাজ

বরাবর আমি তার ভক্ত ছিলাম। আমরা কলেজে পড়ি, তখন বিটিভিতে কোনো এক রাতে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখলাম। নাম: শিউলিমালা। শুরুতেই একটি সূচনা সঙ্গীত- আইসা মোরা ফাইসা গেলাম শিউলিমালার গ্যাঞ্জামে। অনুষ্ঠানটির ভিন্নমাত্রার উপস্থাপনা করেছিলেন শাইখ সিরাজ। মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান করে তখনও তিনি বিখ্যাত হননি।

আমার এক পামেল- সেও অনুষ্ঠান দেখে মুগ্ধ। কদিন বাদে আমরা শুনলাম বাংলামোটর ফার্মগেটের মাঝামাঝি পিকাডিলি সার্কাস নামে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক তিনি। সেখানে গেলে তাকে পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

একদিন দল বেঁধে আমরা গেলাম। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়। নিচে নামার কারণে এই রেস্তোরাঁকে ‘আন্ডার গ্রাউন্ড’ রেস্তোরাঁ বলা হয়েছে। সেদিন শাইখ সিরাজকে সেখানে পাইনি। নাট্যব্যক্তিত্ব আফজাল হোসেনকে দেখেছিলাম।

বিজ্ঞাপন

পরে খাবার দাবার পিঠাঘরে প্রথম শাইখ সিরাজকে আমরা প্রত্যক্ষ দেখতে পাই। আমরা তার ভক্ত- এই কথা বলতেই খুব বিনয়ের সঙ্গে হাসি দিলেন তিনি। বললেন দেখা যাক- অনুষ্ঠানটি কি করে ভালো করা যায় দেখছি।

খাবার দাবারের স্বত্বাধিকারী ফরিদুর রেজা সাগর। তার ব্যাপারে আমাদের অপরিসীম কৌতূহল। আমরা কিশোর বাংলা এবং কচিকাঁচার আসরে লেখালেখি করি। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এবং আলী ইমামের সঙ্গে আমাদের ভালো পরিচয়। এ কথা সাগর ভাই আগে থেকেই জানেন।

আমরাও সাগর ভাইয়ের এক বই গল্পের গল্পগুলো পত্র পত্রিকায় পড়েছি। নতুন কুঁড়ি দলের তিনি একজন সক্রিয় কর্মী। তার উপস্থাপনায় অনেক ছোটদের অনুষ্ঠান দেখছি। খাবার দাবারের কাউন্টারে বসে সাগর ভাই মিটিমিটি হাসছেন।

ওদের চিনি তো। তোমরা পিঠা খাও।

বলে সাগর ভাই ব্যস্ত রইলেন। আমরা শাইখ সিরাজের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম।

চ্যানেল আইয়ের কাজ করা সুবাদে পরে অনেক কাছ থেকে শাইখ সিরাজকে দেখেছি। এক ধরনের ভাব-গম্ভীর ছদ্ম আবরণ থাকে অফিসের মধ্যে। কিন্তু যদি শাইখ সিরাজ ভাইয়ের অন্তরে প্রবেশ করা যায় তবে তিনি অন্য মানুষ। শিশুর মতো সরল। হাসিময় মুখ। দুষ্টুমি করেন। কৌতুকপ্রিয়।

আর সবসময় কাজে মগ্ন থাকেন। কাজ ছাড়া ধ্যানজ্ঞান নাই তার। চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠা করেছেন। চ্যানেল আইয়ের বার্তা বিভাগ তার হাতে তৈরি। সংবাদ পাঠকদের তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছেন। অনুষ্ঠান ঘোষণার ভিন্নতা এনেছেন। আর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ নির্মাণে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তা এখন ইতিহাস। স্যাটেলাইট চ্যানেলে এমন সর্বগ্রাসী অনুগ্রাসী অনুষ্ঠান আর নেই। দেশ ও মানুষের কথা অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন এই অনুষ্ঠান হৃদয়ে মাটি ও মানুষ।

কৃষিভিত্তিক এই কার্যক্রমের কারণে এদেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ তাকে শ্রদ্ধা ভরে ভালোবাসে।

কপট-গাম্ভীর্যের আড়ালে হৃদয়মন ও মানবিক এই মানুষটি একেবারেই অন্যরকম। কাজের ভেতরে একটু এদিক-ওদিক হলেই রেগে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কোথাও কোনো অসংগতি ঘটলে তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। সততার ভেতর দিয়ে কাজ করতে চান। নিজের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ গ্রহণ করেননি কখনও। সম্পদের পাহাড়চূড়া নাই তার। থাকেন পৈতৃক বাড়িতে।শাইখ সিরাজ

ভাবী সাহানা সিরাজ তাকে ছায়ার মতো সাহায্য করেন। সিরাজ ভাই প্রায়শই দেশে বিদেশে শ্যুটিং করতে চলে যান। দিনের পর দিন একটানা শ্যুটিং করেন। তথ্য প্রতিবেদন ও প্রামাণ্য অনুষ্ঠান। ভাবী কোনোদিন এসব নিয়ে কিছু বলেননি। বরং কাজে উৎসাহ দিয়েছেন। সিরাজ ভাইয়ের সাফল্যের পেছনে ভাবীর বিশাল অবদান আছে।

অয়ন ও বিজয়। দুই পুত্র সন্তান। একজন স্থপতি। অন্যজন এখনও পড়াশোনায় নিয়োজিত। দুই সন্তানকে অত্যন্ত সাবধানে মানুষ করেছেন সিরাজ ভাই ও সাহানা ভাবী। দুজনেই নিরহংকারী। বাবার কারণে তারা গর্ববোধ করেন। কিন্তু অকারণে নিজেদের জাহির করে না তারা।

বিজ্ঞাপন

বাসায় অবসর থাকলে সিরাজ ভাই ভাবী ও সন্তানদের সময় দেন। হয়তো কোথাও বেড়াতে যান। কোনো রেস্টুরেন্টে নৈশভোজে অংশ নেন।

কদিন আগে কক্সবাজারে গেলাম। সিরাজ ভাইয়ের সাথে পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। সিরাজ ভাই দূর দূরান্ত ঘুরে বেড়ালেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে রামু গিয়ে শ্যুটিং পর্যন্ত করলেন। কোন কিছু বাদ দিলেন না। পার্টিতে আমাদের সাথে অংশ নিলেন। আবার ঘুরেও বেড়ালেন আপন মনে।

চ্যানেল আই বা তার বাইরে যতক্ষণ জাগ্রত অবস্থায় থাকেন কাজের মধ্যে থাকেন। চ্যানেল আইয়ের সংবাদের খুঁটিনাটি তিনি দেখেন। কোনটা যাবে, কোনটা যাবে না। সব নিজ হাতে ঠিক করেন। কখনো কোনো খবরের ন্যারেশন পর্যন্ত লিখে দেন।

যখন ইচ্ছা তাকে ফোন করা যায়। তিনি না ঘুমিয়ে পড়লে ফোন ধরবেন। সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। সমাধানের চেষ্টা করবেন।

কৃষি তার ধ্যান জ্ঞান। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। কৃষি উন্নয়নের জন্য পুরো দেশটা বহুবার ঘুরে বেড়িয়েছেন। সন্ধান করেছেন প্রকৃত সমস্যাগুলো আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন। বাজেটে ‘কৃষি বাজেট’ আলাদা শিরোনামে সংযুক্ত করেছেন। ধান, বীজ, মৎস্য, পোলট্রি, কৃষিজমি, সবজি, ফলমূল, গো-সম্পদ, পশু সম্পদ সবকিছু নিয়েই তিনি সচেতন এবং এসবের উন্নয়নে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

বাংলাদেশের কৃষি সংক্রান্ত হেন বিষয় নেই যা তিনি বিস্তারিত জানেন না। আপনি কিছু জানতে চাইলে গড়গড় করে তিনি সে বিষয়ে বলে যান।

কৃষকদের জন্য তিনি অত্যন্ত দরদী হৃদয় নিয়ে কাজ করেন। কৃষি শ্রমিক যেন ন্যায্য টাকা পায় সেজন্য লড়াই করে যাচ্ছেন কুড়ি বছর ধরে। মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের মুনাফার টাকা আত্মসাৎ করে ফেলে। কৃষি বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বড় আকারের কৃষিপণ্য এখন বড় ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে। তাহলে কৃষক বাঁচবে কি করে?

শাইখ সিরাজ এই গভীর সমস্যা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের কৃষি যেন আধুনিক হয়, উন্নত প্রযুক্তি যেন ব্যবহার হয়- সে নিয়েও নানা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। চীন, জাপান, কোরিয়া ঘুরে তাদের কার্যক্রম হাতে নাতে দেখেছেন। এখন সেই প্রযুক্তি আমাদের দেশে ব্যবহার হচ্ছে। সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসায় স্নাত তিনি। যে কোনো জেলা শহরে যে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকও তাকে শ্রদ্ধা করে। কৃষকদের যে কোনো সংগঠনে তিনি জড়িত থাকেন এবং তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

জীবনের অধিকাংশ সময় ক্ষেতে মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কৃষি ও কৃষকের সাথে সময় কাটিয়েছেন। কৃষকদের সাথে একই রকম হাওয়াই শার্ট পরেছেন। প্যান্ট গুটিয়ে কাদাপানিতে নেমে গেছেন।

এর বাইরেও তার কার্যক্রম আছে। খুবই সৌখিন মানুষ তিনি। টাই জমানো তার অভ্যাস। হাজার হাজার টাই আছে। ফুল স্লিভ শার্ট সংগ্রহ তার প্রিয় শখ। ঢাকা, কলকাতা, ব্যাংকক গেলেই তিনি শার্ট পিস কিনে থাকেন। সুট এবং ব্লেজার সংগ্রহও তার আরেকটি শখ। প্যান্ট শার্ট ও চকচকে জুতো পরে তিনি মিটিং-এ অংশ নেন। তখন প্যান্ট শার্টের কোথাও কোনো ভাঁজ বা ময়লা থাকবে না। খুব সৌখিন। পছন্দও খুব ভালো। তাকে কখনো আমরা রুচিহীন পোশাক পরতে দেখিনি। ছুটির দিন পাঞ্জাবি পরেন। পুরো রোজার মাসটা তিনি পাঞ্জাবি পরবেন। রোজা রাখবেন। তারাবিহ পড়বেন। দান খয়রাত করবেন। সময় ও সুযোগ পেলে হজ্বে যান। আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন। ভাইবোনদের অভিভাবক হিসেবে তিনিই বাসার কর্তা। তাদের পরিবার এখনো যৌথ পরিবার। সেই পরিবারের প্রধান শাইখ সিরাজ। এ ছাড়াও আছে চ্যানেল আইয়ের মতো বৃহৎ বৃহৎ পরিবার। আর সারাদেশের কৃষক সমাজের তিনি নয়নমনি। কৃষি পরিবারেরও খোঁজ খবর তাকে রাখতে হয়।

সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বরাও তাকে গভীর ভালোবাসেন। শ্রদ্ধা করেন। দেখেছি ব্যারিস্টার রফিকুল হক, ড. আহমদ রফিক, অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সাংবাদিক মাহফুজ আনাম, প্রয়াত বিচিত্রা-সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী, রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ, রাহাত খান, সোহরাব হোসেন, নায়ক রাজ্জাক, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ শাইখ সিরাজকে কী পরিমাণ ভালোবাসেন, স্নেহ করেন তা লিখে বোঝানো যাবে না। খুব আন্তরিক ও সদালাপী শাইখ সিরাজ সবার জন্যই হৃদয় মেলে রেখেছেন। সবার উপকার করার চেষ্টা করেন।

কৃষি বিষয়ে নিমগ্ন ব্যক্তি তিনি। এর বাইরে ফিল্ম এবং ফুটবল খেলা নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ। স্কুল জীবনে নায়ক হওয়ার লোভে খালি এফডিসিতে চলে যেতেন। সত্তর দশকে যখন ফুটবল নিয়ে মাতলামি তখন শাইখ সিরাজ ছিলেন সেই মাঠের একজন নিয়মিত দর্শক।

কৃষি বিষয়ে প্রচুর গদ্য লিখেছেন। বইও আছে কুড়িটির মতো। গবেষণা ও অভিজ্ঞতালব্ধ ব্যক্তি শাইখ সিরাজকে নিয়েও বাংলা-ইংরেজি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কারে তিনি সম্মানিত। সবচেয়ে কম বয়সে কৃষি সাংবাদিকতার মাধ্যমে একুশে পদক পেয়েছিলেন। অশোকা ফেলোশিপ করেছেন শ্রীলংকায়। বিবিসি ও সিএনএন তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করেছে। আমেরিকা থেকে পেয়েছেন কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বুমার্স’ পুরস্কার।

২০১৮ তে পেলেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার। এইসব পুরস্কারের হয়তো প্রয়োজন আছে। কিন্তু শাইখ সিরাজ সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন সাধারণ মানুষের সম্মান ভালোবাসা।

তার নীরোগ জীবন ও আরও সাফল্য আমরা প্রতিমুহূর্তে কামনা করি।