যুব ক্রিকেটে ভাল করে জাতীয় দলে। মাশরাফি, রিয়াদদের ততদিনে চোখের চেনা চিনলেও, সেভাবে কথা হত না। জাতীয় দলে এসে মিরাজ তাই অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। অভিষেকের দিনগুলোতে অজানা চাপে নুইয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। সিনিয়রদের সাহায্যে কীভাবে সব মানিয়ে নিলেন, চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাতকারে শোনালেন সেই গল্প।
প্রশ্ন: অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে সরাসরি বাংলাদেশ দলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে আপনার কী উপলব্ধি হল?
মিরাজ: আসলে অনূর্ধ্ব-১৯ ডিফারেন্ট টাইপ অব ক্রিকেট। ওখানে সব ইয়াং প্লেয়াররা থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবাই ম্যাচিউর। সবাই এখানে বিশ্বমানের ক্রিকেটার। ১০-১৫ বছর জাতীয় দলে খেলেছেন এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা এখানে বেশি। কার কোন দুর্বলতা সেগুলো নিয়ে অ্যানালাইসিস হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ এ কিন্তু এই জিনিসটা হয় না। যেমন আমি যখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাপ্টেন ছিলাম সাউথ আফ্রিকায় যাই। ওখানকার প্লেয়ারদের চিনতাম না। তারপর শ্রীলঙ্কায় খেলেছি। সেখানেও এমন হয়েছে। তিন-চারটা ম্যাচ খেলার পর ওদের সম্পর্কে জেনেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখেন, আমি প্রথম খেলেছি ইংল্যান্ডের সঙ্গে। সবাইকে আগেই চিনেছি। অ্যালিস্টার কুক ও অন্য খেলোয়াড়দের ভেতর অধিকাংশই চিনি। এই চেনা-জানা আসলে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকা খুব টাফ। তারপরও আল্লাহর রহমতে খুব ভালো হয়েছে শুরুটা। এভাবে যদি চলতে থাকে আশা করি সামনে ভাল কিছু হবে।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিলেন কীভাবে?
মিরাজ: যখন প্রথম জাতীয় দলে সুযোগ পেলাম নিজেকে একা-একা মনে হচ্ছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল সবাই আমার সাথে পরিচিত না। বিশেষ করে যারা সিনিয়র ক্রিকেটার। কারণ তাদের সাথে তো আমি খেলিনি। মুশফিক ভাই, সাকিব ভাই, তামিম ভাই, রিয়াদ ভাইদের সাথে কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে ওরকম খেলা হয়নি। আমার যখন টেস্ট ডেব্যু হয় ইংল্যান্ডের সাথে, তখন সবাই আমাকে সাহায্য করেছেন। সিনিয়র যারা ছিলেন, তারা আমাকে অত্যন্ত সাপোর্ট করেছেন। মুশফিক ভাই ক্যাপ্টেন ছিলেন। মাশরাফি ভাই কিন্তু ছিলেন না টেস্ট ডেব্যুর সময়। কিন্তু তিনি আমার সাথে ফোনে আলাপ করেছিলেন। বলেছিলেন টেস্ট ডেব্যু হচ্ছে ইনশাআল্লাহ শুরুটা ভালোই হবে। সিনিয়র প্লেয়ারদের কাছ থেকে এই যে উৎসাহ এটাতে মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে আমি একা না। নিজেকে আমি মানসিকভাবে তৈরি করেছি। ইংল্যান্ডের সাথে যখন আমি মাঠে নামি, তখন মনে হয়নি আমি একা। কিন্তু তারা যদি আমাকে এই সাপোর্ট না করতেন, না মিশতেন, কথা না বলতেন, তাহলে কিন্তু আমি পারফর্মও করতে পারতাম না।
প্রশ্ন: টেস্টের পর হঠাৎ করেই শ্রীলঙ্কায় আপনার ওয়ানডে অভিষেক হল। সেখানেও পারফর্মার মিরাজকে পাওয়া গেল। ৫০ ওভারের ম্যাচে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা কেমন ছিল?
মিরাজ: আমার যখন ওয়ানডে ডেব্যু হয়, তখন অনেক নার্ভাস ছিলাম। রিয়াদ ভাই অনেক সাপোর্ট করছিলেন, কাছে আসছিলেন, কথা বলছিলেন। মাশরাফি ভাই আমাকে বলছিলেন ‘তুই পারবি, কেননা তুই বাংলাদেশের সেরা অফস্পিনার। মুশফিক ভাই বলেন টেস্টে অনেক ভাল করেছিস, ওয়ানডে তোর কাছে আরও সহজ হওয়ার কথা, পারবি।’ কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয় সেটি নিয়ে কথা বলেছেন সাকিব ভাই। ওয়ানডেতে অভিষেকের সময় চাপে মাথা ঠিকমত কাজ করছিল না। মাঠের ভেতর যখন চুপচাপ থাকি তখন তামিম ভাই সব প্লেয়ারদের চাঙ্গা করে দেন, কথা বলতে বলেন। এই যে একটা যোগাযোগ এটা খুবই ভাল লাগে।
প্রশ্ন: কখন টিমটাকে নিজের ভাবতে শুরু করলেন?
মিরাজ: ওই যে বললাম, আমার টেস্ট ডেব্যুর আগে যখন আমার মাথায় ক্যাপ তুলে দেয়া হয়। সবাই উৎসাহ দেয়া শুরু করেন। অথচ মাথায় ক্যাপ ওঠার আগে চট্টগ্রামে আমার খুব একা একা লাগতো। তাদের সমর্থন পাওয়ার পর থেকেই আমার পারফর্ম করতে সুবিধা হয়েছে।
প্রশ্ন: শুরুতে ব্যাটিং ভাল হচ্ছিল না। এ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছিল। কীভাবে সেই চাপ উতরালেন?
মিরাজ: আমি যখন খারাপ ব্যাটিং করছিলাম তখন নিজের কাছে খারাপ লাগছিল। আমি জানি এই সমস্যা উতরে যেতে পারব। এই আত্মবিশ্বাস আমার নিজের ভেতরে ছিল। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পারব সেটা জানতাম না। নিজেকে এটা ভেবে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছি যে, অনূর্ধ্ব-১৯ এ থাকতে চারটা ফিফটি মেরেছি অনেক কঠিন অবস্থার ভেতর দিয়েও। তবে নিজেকে তৈরি করার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই আমার সিনিয়র প্লেয়ারদের। কারণ আমি যখন নিউজিল্যান্ডে বারবার আউট হচ্ছিলাম তখন সবাই আমাকে সাহস দিচ্ছিলেন। বিশেষ করে সাকিব ভাই বলছিলেন, এটা কোনও ব্যাপার না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমে এসে সবাই এমন করে। তামিম ভাই বলছিলেন, তুই যেদিন রান করবি সেদিন অনেক ভালভাবে রান করবি। রিয়াদ ভাই বলছিলেন, তুই অনেক ভাল ব্যাটসম্যান। তুই রান করবি, অনেক তাড়াতাড়ি রান করবি। এক-দুই সিরিজের ভেতরেই করবি। মুশফিক ভাই বলছিলেন, আমি যখন জাতীয় দলে ঢুকেছি তখন তোর মত অবস্থা ছিল, বেশি রান করতে পারতাম না। খুব অল্প রান করে আউট হয়ে যেতাম। মুশফিক ভাইয়ের কথা শুনে নিজেকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী মন হচ্ছিল। তখন মাইন্ড সেটআপটা এমন হয়েছে.. সত্যিই তো মুশফিক ভাই একসময় রানের জন্য সংগ্রাম করলেও এখন কত বড় ব্যাটসম্যান। নিউজিল্যান্ডে যখন আমি বিভিন্নভাবে আউট হয়েছি তখন তারা আমাকে উজ্জীবিত করেছেন। দেখেন তার ফিডব্যাকটা কিন্তু আমি ভারত সিরিজেই পেয়েছি। সিনিয়র প্লেয়ারদের কাছ থেকে উৎসাহ পাওয়া ও বুস্টআপ হওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার জীবনে অনেক কিছু শিখেছি তাদের কাছ থেকে। সুযোগ পেলে আমি যখন সিনিয়র হব তখন চেষ্টা করবো তাদের মত আমার জুনিয়রদেরও এভাবে নির্দেশনা দিতে।
প্রশ্ন: ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
মিরাজ: টেস্ট বা ওয়ানডে স্পেশালিষ্ট হব, এমন না। আমি সব ফরম্যাটেই খেলে যেতে চাই। দেশের জন্য কিছু করতে চাই। সবখানে পারফর্ম করব। এই মানসিকতা ধরে রাখা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: সামনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। অনেক বড় আসর, বিশেষ কী করতে চান?
মিরাজ: আসলে ভাল লাগছে, বিশ্বকাপের পরই এটির মর্যাদা। চেষ্টা করব ভাল করার। সবাই জানে ইংল্যান্ডে অ্যাডভানটেজ পাবে পেস বোলাররা। আমার চেষ্টা থাকবে তার মধ্যে কিছু একটা ভাল করার। অমন কন্ডিশনে যদি ভাল করতে পারি টিমের জন্য ভাল হবে। বিশ্বক্রিকেটে আমি আরও আলোচনায় আসব।
প্রশ্ন: বোলিং নিয়ে কয়েকদিন ধরে মোহামেডান কোচের সঙ্গে কাজ করছেন। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য আলাদা কিছু করছেন কিনা?
মিরাজ: আপনারা তো জানেন আমার স্পিন কোচ ছোটবেলা থেকেই সোহেল স্যার। তিনি আমাকে নার্সিং করেছেন ছোটবেলা থেকেই। তার অধীনে কিছু কাজ করলাম। ওখানে (ইংল্যান্ডে) কীভাবে, কী করতে হবে সেটা শিখলাম। বোলিংয়ের ছোট ছোট কিছু কাজ দেখিয়ে দিলেন।








