বলা হয়, ভালো মানুষ তার শত্রুর জন্যও হাসপাতাল, থানা, আদালত বা জেলখানা পছন্দ করে না। আবার কেউ অপরাধ করে কিংবা না করে জেলে গেলেও সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য জমিজমা বিক্রি, রাজনৈতিক তদবিরসহ নানা ফিকিরি করে। কিন্তু এবার সেই জেলখানা থেকে ছাড়া পেতে নয়, বরং পয়সা দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। হাস্যকর শোনালেও এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো মাজেজা আছে।
২৮ অক্টোবর পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে সংবাদ সম্মেলনে আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘ফিল ফর প্রিজন’ প্রজেক্টের আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলেই কারাবাসের সুযোগ পাবেন সাধারণ মানুষও। তিনি বলেন, এজন্য পুরাতন কারাগার ভবনকে প্রস্তুত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই পুরাতন কারাগার ভবন পরিদর্শন আসবেন। তিনি পরিদর্শনের ১৫ দিন পর থেকেই ‘ফিল ফর প্রিজন’ প্রজেক্টের জন্য কাজ শুরু হবে।
কেন এই উদ্যোগ? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারের জীবন কত কঠিন-তা উপলব্ধি করার জন্যএই এই ব্যবস্থা। যাতে অপরাধের ব্যাপারে মানুষ সচেতন হয়; দেশে অপরাধপ্রবণতা কমে আসে।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে হাফিংটন পোস্ট-এর একটি খবরে বলা হয়েছিল, কয়েদির অভাবে নেদারল্যান্ডসের আটটি কারাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খবরে বলা হয়, এমনিতেই নেদারল্যান্ডসে অপরাধের হার অনেক কম। দেশটির কারাগারে ১৪ হাজার কয়েদি রাখার ব্যবস্থা আছে। তবে এখন (২০১৩) বন্দি আছে ১২ হাজার। অপরাধীর সংখ্যা আরও কমবে, এমন আশাবাদের কথা জানিয়েছেন দেশটির উপবিচারমন্ত্রী নেবাহাত আলবেরাক। কয়েদির সংখ্যা কম হওয়ার পরও অপ্রয়োজনে এই খাতে খরচের কোনো প্রয়োজনও দেখছে না সরকার।
বিপরীতে আমরা আমাদের দেশের কারাগারগুলোর দিকে নজর দিলে দেখব, ধারণক্ষমতার অনেক বেশি বন্দি থাকায় কারাগারগুলোয় এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সবগুলো কারাগারেই বন্দির সংখ্যা বেড়ে যায়। অথচ সেখানে আবাসন, টয়লেট, গোসলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। স্থান সংকুলান না হওয়ায় কোনো কোনো কারাগারে পালাক্রমে ঘুমাতে হয় বন্দিদের। বাথরুমে যেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। যথাসময়ে মেলে না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। আবার কারা অভ্যন্তরে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার নামে বন্দিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সরকারি হিসাবমতে, বর্তমানে সারা দেশে ছোট বড় ৬৮টি কারাগার আছে। এর মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার। দুটি হাইসিকিউরিটি কারাগার। বাকি ৫৫টি দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে অবস্থিত। দেশের সবকটি কারাগার মিলে বন্দির ধারণক্ষমতা ৩৪ হাজার ৭০৬ জন। তবে কারাগারগুলোতে এখন বন্দির সংখ্যা ৭০ হাজারের কম নয় বলে ধারণা করা হয়।
আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিও বহু নিরপরাধ মানুষকে কারাগারে যেতে বাধ্য করে। বিনা অপরাধে ১৩ বছর জেল খাটতে হয় সাতক্ষীরার জবেদ আলী বিশ্বাসকে। অবশেষে তার মুক্তি মেলে এবং অবৈধভাবে ১৩ বছর কারাগারে আটক রাখার ঘটনায় কেন তাকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
গণমোধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, অপরাধী না হয়েও দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিজীবন যাপন করছে কয়েকশো শিশু। কারাগারে বন্দি থাকা মায়েদের সঙ্গে তাদের রাখা হয়েছে। কিন্তু, বন্দিজীবন যাপন করায় রুদ্ধ হচ্ছে তাদের মানসিক বিকাশ।
কারাগার নিয়ে অনেক মজার খবরও আসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, ভারতের আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, কারাবন্দিরা আইনিভাবে বৈধ সঙ্গীর সঙ্গে যৌন মেলামেশা করতে পারবেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার উচ্চ আদালত এ রায় দেন। তবে সব ধরনের আসামি এ অধিকার নাও পেতে পারেন বলে বিচারক জানিয়েছেন।
আমাদের দেশের কারাব্যবস্থা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। তাছাড়া আমাদের কারাগারগুলো এখনও ঠিক সংশোধনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। যদিও সরকার সম্প্রতি কারাব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুযোগসুবিধা বাড়ানো এবং কারাব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত অনেক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। অনেক সময় কারাগারের প্যারালাল শব্দ হিসেবে ‘সংশোধনাগার’, ‘পুর্নবাসন’ ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। কারাগারের ফটকেও একটি স্লোগান লেখা থাকে- “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ”। তার মানেই হলো, কারাগারে কোনো অপরাধীকে নেয়া হয় প্রথমত তাকে শাস্তি দেয়া, দ্বিতীয়ত তার আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার সুযোগ দেয়া এবং তৃতীয়ত সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি।
এরকম বাস্তবতায় কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে কারাবাসের অভিজ্ঞতা অর্জনের যে সুযোগ করে দিচ্ছে, সেটির একটি ভালো দিক হতে পারে এই যে, বন্দি জীবন-যাপন আসলেই কতটা কষ্টের, সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করে তিনি তার পরিচিতজনের সঙ্গে সেটি শেয়ার করতে পারবেন, যাতে মানুষ এমন কোনে কাজ না করে যাতে তাকে কারাগারে যেতে হয়। যদিও বাংলাদেশের কারাগারগুলোর প্রকৃত চিত্র দেখার সুযোগ সেখানে নিশ্চয়ই থাকবে না। কিছুটা ধারণা হয়তো পাওয়া যাবে।
দেশের মানুষের আগ্রহ থাকবে কে প্রথম পয়সা দিয়ে কারাগারে থাকার আবেদন করলেন। কারণ এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কারা ইতিহাসের সঙ্গে ওই ব্যক্তির নাম যুক্ত হয়ে যাবে। তবে আমার ধারণা, কোনো লেখক হয়তো প্রথম এই সুযোগটি নিতে চাইবেন যাতে করে জেলখানার অভিজ্ঞতা নামে কিছু একটা লেখা যায়। যদিও পৃথিবীবিখ্যাত বহু মানুষই জেলখানায় ছিলেন এবং সেখানে বসে সাহিত্য রচনা করেছেন। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও জীবনের একটা বড় সময় জেলে কাটাতে হয়েছে। সেখানে বসে তিনি তার পরিবার ও অন্যদের কাছে যেসব চিঠি লিখতেন, সেগুলোরও সাহিত্যমূল্য রয়েছে। আবার তুরস্কের কবি নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ নামে দীর্ঘ কবিতা শত শত বছর পরেও পাঠকের মুখে মুখে। সুতরাং পয়সা দিয়ে কারাবাস শেষে ফিরে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যদি এ বিষয়ে লেখালেখি করেন, কারাব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পরামর্শ দেন, সেটিও হয়তো নীতিনির্ধারকদের নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে।
২৮ অক্টোবর আমাদের সহকর্মী রাশেদ নিজাম যখন ‘ফিল ফর প্রিজন’ স্টোরিটা তৈরি করছিলেন, তখন আমরা আমাদের নববিবাহিত সহকর্মী সুমন তালুকদারকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, মানুষ তো হানিমুন করতে সেন্টমার্টিন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এমনকি সুইজারল্যান্ডেও যায়। আপনি চাইলে হানিমুনটা পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারেই করতে পারেন। এটা একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তাছাড়া জেলখানাকে মানুষ তো ‘শ্বশুরবাড়ি’ই বলে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








