বেশ কিছুদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার শীর্ষে রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। আর এই সমস্যা যেন আরো বেশি উসকে দিচ্ছে বার্মিজ মিলিটারিরাই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে তাদের উস্কানিতেই মিয়ানমারের পুলিশ পোস্টে হামলা করে রোহিঙ্গারা। ফলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হচ্ছে। এর আগে রোহিঙ্গাদের উপর মাসব্যাপী নির্যাতন চালায় তারা।
মিয়ানমারে চলমান এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। কারণ মিয়ানমারে চলমান এই সংঘর্ষের কারণে রোহিঙ্গাদের ঢল আসছে বাংলাদেশের উপর। যাদের কিছু কিছু পুশব্যাক করে পাঠালে সোচ্চার হচ্ছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কি করতে পারে সেই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এহসানুল হক বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। জাতিসংঘে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটা সমাধানে আসতে পারে। জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশ যত বেশি জড়িত থাকবে ততো তাদের জন্য ইতিবাচক হবে। সেই সঙ্গে অন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে দিয়ে একটু পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করতে পারে মিয়ানমারের উপরে।
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজের বিস্তার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো পরিস্কার করতে হবে। এই বিষয়ে যেসব যুক্তিগুলো আমাদের আছে, যেসব ডকুমেন্টস আছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কোনো সমাধান আসেনি। আবার মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে সেনাবাহিনীর যে সম্পর্ক তাতে খুব ইতিবাচক ফল আসবে বলেও মনে হয়না। তাই বাংলাদেশের অবস্থান ওই আন্তর্জাতিক পর্যায় দিয়েই যেতে হবে। এই ধরনের সমস্যায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতেই সমাধান আসতে পারে। কিন্তু মিয়ানমার সরাসরি বলে দিচ্ছে, তারা রাজি না। তারাও তাদের যুক্তি, তাদের ডকুমেন্টস দেখাচ্ছে। যদিও সেগুলো খুবই দুর্বল। এককভাবে বাংলাদেশ চেষ্টা করে খুব বেশি সফল হতে পারেনি। জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের সাফল্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত করেছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করলে ইতিবাচক ফলাফল আসতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আশেকা ইরশাদও বলেন একই কথা। তিনি মনে করেন, সমস্যা সমাধানে কয়েকটা পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে। দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে যে কিভাবে আমরা আমাদের বর্ডার নিরাপদ রাখবো। আঞ্চলিকভাবে আলোচনায় আসতে পারে ভারতের সঙ্গে ফোরাম করে কিভাবে আমরা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ সুস্থ রাখবো। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘতো সম্পৃক্ত আছেই। তারা চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন খুব জোরালো নয়। তাই সেটা খুব জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে করণীয় হবে রিফিউজিদের সমস্যাকে ফোকাস করা ও সমস্যা সমাধানের কথা বলা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালালেও সেটা আরো জোর দেওয়া দরকার। সরকারি দিক থেকে আরো বাড়তি সচেতনতার দরকার রয়েছে।

তবে বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের কিছু সময়ের জন্য বাংলাদেশে জায়গা দেওয়ার কথা বলেন আশেকা ইরশাদ। তিনি বলেন, জেনে শুনে মানুষকে মৃত্যুর মুখে পাঠানো যায় না। তাদের নিলেও সমস্যা, আবার না নিলেও সমস্যা। যদিও বাধা দেওয়া সত্ত্বেও অনেকে ঢুকে যাচ্ছে। বিজিবি ও বিজিপি মিলে একটা টেম্পোরারি অঞ্চলে তাদের কিছুদিন রাখা যেতে পারে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে তাদের পাঠিয়ে দিতে হবে। তবে কতদিন সেটার ব্যাপ্তি হবে সেটা তো নিশ্চিত নয়। তাই বের করতে হবে সমস্যাটা কেন হচ্ছে। আর সেটা মূলত করতে পারে মিয়ানমার। কত যুগ ধরে এই সমস্যা চলছে তো চলছেই। কেন সেটা বের না করতে পারলে সমাধান আসবে না মোটেও।
তবে আশেকা ইরশাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন এহসানুল হক। তিনি বলেন, এমনিতেই আমাদের সমস্যার শেষ নেই। জনবহুল দেশ আমাদের। আমরা অস্থায়ীভাবে রোহিঙ্গাদের নিলেও মিয়ানমার একটি ভুল ম্যাসেজ পাবে। তখন তারা আরো পুশ করতে থাকবে। এর আগে ৭৮, ৯২ ও ২০১২ সালে যারা এসেছে তারা কিন্তু আর ফেরত যায়নি বা তাদের পাঠানো যায়নি। তবে এর ফলে আমাদের উপর মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে যে চাপটা রয়েছে সেটার প্রতিরোধ করতে হবে।








