মহৎ সাহিত্য মানেই গ্রামকেন্দ্রিক- এমন ধারণার বাইরে অবস্থান রাহাত খানের। এমন নয় যে গ্রাম নিয়েও তিনি উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনায় অক্ষম বা বিমুখ। তবে তাঁর অনন্যতা আমাদের সাহিত্যে ঢাকা নগরকে তার অপরিকল্পিত বেড়ে ওঠাসহ তুলে ধরার মধ্যে নিহিত। সেইসঙ্গে নাগরদেরও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার পথে হোঁচট খাওয়ার চিহ্নগুলোও খুঁজে পাওয়া যাবে রাহাত খানের সাহিত্যে।
আমাদের সাহিত্যের দশক বিভাজন প্রবণতার হিসাবে রাহাত খানের সাহিত্যসূচনা গত শতকের ষাটের দশকে। ষাটের দশক আমাদের এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
ষাটের দশকে হঠাৎ করেই যেন গল্প এবং গল্পকারের ব্যাপ্তি প্রসারিত হয় অনেকগুণ। কি সংখ্যায় কি বৈচিত্র্যে কি পরীক্ষা-নিরীক্ষায়- সবক্ষেত্রেই ছোটগল্প যেন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক-সামাজিক টালমাটাল ঢেউয়ের মধ্যে যেমন এই দশকেই বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে, বিকৃত পথে হলেও, একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রতিষ্ঠিত হবার সকল শর্ত পূরণ হয়, তেমনই ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সূচনা হয় একটি ভিন্ন ভূগোল এবং ভিন্ন কণ্ঠের। এই প্রথম লেখকদের কেউ কেউ উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে তাদের বাংলাদেশের মানুষের গল্প লিখতে হবে, যে গল্পগুলি ইউরোপীয় নয়, পশ্চিমবঙ্গীয় নয়। ষাটের দশকের গল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলি প্রবণতা ছিল, যা এই দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবণতাসমূহের সমানুপাতী।
প্রথমত, ষাটের দশকের উজ্জ্বল ছোটগল্পগুলি প্রধানত প্রকাশিত হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনে। ফলে এক ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিকতার পরিচয় এই গল্পগুলির অবয়বে খুঁজে পাওয়া যায়। যেহেতু লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত, তাই কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল। সবসময়ই সেগুলি শিল্পোত্তীর্ণ এমনটি বলা যাবে না। তবে এই অর্থে একে ইতিবাচক বলতেই হবে যে, একটি নিরীক্ষা পরবর্তীতে আরও নিরীক্ষার দরজা উন্মুক্ত করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, ষাটের দশক প্রধানত কেটেছে আইয়ুবী স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। সে সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল নিষিদ্ধ। তাই ষাটের লেখকদের কথনরীতিতে আনতে হয়ে পরিবর্তন। অপ্রত্যক্ষ কথনের মাধ্যমে গল্প-নির্মাণ। এর ফলে আবার জীবনবিমুখ শিল্প-সর্বস্বতার একটি প্রবণতাও দানা বেঁধেছিল এই দশকে।
তৃতীয়ত, ষাটের লেখকদের একটি বড় সাফল্য হচ্ছে গল্পের ভাষাকে উপযুক্তরূপে গড়ে তুলতে পারা। ষাটের প্রধান গল্পকাররা শব্দের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই তারা প্রত্যেকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাষাশিল্পীও বটে।
ষাটের দশকজুড়ে যেসব লিটল ম্যাগাজিন এবং অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে প্রভাবসম্পাতি পত্রিকা ছিল একাধিক। যেমন এনামুল হক সম্পাদিত ‘উত্তরণ’, শাহজাহান হাফিজ সম্পাদিত ‘সাম্প্রতিক’, ফারুক আলমগীর সম্পাদিত ‘প্রতিধ্বনি’, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’, ফেরদৌস সাজেদীন সম্পাদিত ‘সুন্দরম’, শশাঙ্ক পাল সম্পাদিত ‘শ্রাবস্তী’। এছাড়া ছিল ‘সপ্তক’ ও ‘পরিচয়’। ছিল ‘উল্কা’ ‘কপোত’ ‘স্বরগ্রাম’। ঢাকার বাইরে বগুড়া থেকে ফারুক সিদ্দিকীর সম্পাদনায় এই লিটল ম্যাগাজিনের মিছিলে যোগ দিয়েছিল ‘বিপ্রতীপ’।
আর এই দশকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে শুধুমাত্র গল্পের পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন কামাল বিন মাহতাব। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল গল্পের কাগজ ‘ছোটগল্প’।
এই দশকে ছোটগল্পের লেখকসংখ্যা পূর্ববর্তী দশকগুলির তুলনায় প্রশংসনীয়ভাবে বেশি। হাসান আজিজুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, মাহমুদুল হক, রশীদ হায়দার, আহমদ ছফা, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, সুব্রত বড়ুয়া, আবদুশ শাকুর, রিজিয়া রহমান, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমেদ, আনোয়ারা সৈয়দ হক, রাজিয়া খান, পূরবী বসু, বশীর আল হেলাল, মাহবুব তালুকদার, শহীদুর রহমান, সিরাজউদ্দিন আহমেদ, কামাল বিন মাহতাব, সাযযাদ কাদির, টিপু সুলতান, হোসেনউদ্দীন হোসেনসহ আরও অনেক গল্পলেখকের আবির্ভাব ঘটে এই দশকে। কেউ কেউ স্বল্পস্থায়ী, আবার কেউ কেউ বাংলাসাহিত্যে স্থায়ী আসনের দিকে ধাবমান।
দর্শক-গবেষকদের চোখে- রাহাত খান হচ্ছেন ষাটের অন্যতম গদ্যশিল্পী যিনি সমকালকে তার সকল বদমায়েশি, চালাকি, লাম্পট্য, প্রতারণা ও বেদনাসমেত ধরবার চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় আত্মমগ্নতার একটি ব্যাপার রয়েছে। সেটাই তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর তিনি আচ্ছন্নভাবেই সমাজচিত্রকে যতটা পারেন পরিস্ফুট করেন। তবে নাগরিক জীবনের চোগা-চাপকানের নিচে লুকানো যে দগদগে ক্ষত, তাকে তিনি উন্মোচন করেন ক্ষমাহীনভাবেই। যৌনতা নিয়ে তার নাড়াচাড়া অন্যদের চেয়ে একটু বেশি, যদিও একধরনের সংযমী-বৈরাগ্য তার যৌনচিন্তাকে সহজ মুক্তি দান করে।
০২.
আমরা, বিশেষ করে আমি, মফস্বলবাসী এক সদ্য-তরুণ ঢাকা দেখেছিলাম রাহাত খানের লেখা দিয়ে। ঢাকা তখন আমার কাছে এক স্বপ্নের নগরী। আমাদের মফস্বল শহরের ছোট্ট পাবলিক লাইব্রেরিতে পাওয়া গেল তাঁর ‘অমল ধবল চাকরি’। আহ, ঢাকার যুবকরা এত স্মার্ট ভাষায় কথা বলে! যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রেম-কাম ছাড়াও এত ঘনত্ববিশিষ্ট সম্পর্ক তৈরি হতে পারে সেখানে! দুইজন যুবক যেমন যেমন ভাষায় ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতে পারে, সেইরকম ভাষাতে দুইজন যুবক-যুবতীও কথা-বার্তা বলতে পারে!
আর কোনো লেখক এমন ঠাট্টার ভঙ্গিতে ‘ভালো-মন্দের টাকা’র মতো অসাধারণ হৃদয়-সংবেদী এবং গভীর নিরীক্ষার গল্পও লিখে ফেলতে পারেন!
গল্প-উপন্যাস সাধারণত একক কোনো ব্যক্তি বা চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু এই বড় গল্পটিতেই দেখলাম প্রধান চরিত্রকে ছাপিয়ে অন্য অনেক চরিত্রকে মুখ্য হয়ে উঠতে। ‘ভালো-মন্দের টাকা’ গল্পে প্রচলিত অর্থে প্রধান চরিত্র রহীমদাদ। কিন্তু পুরো গল্প আড়ালে বসে নিয়ন্ত্রণ করে জামিল। জামিল কে? জামিল ‘হয়তো লেখক হতে পারত। লেখক মানে যারা বাধ্য হয়ে থ্রিলার ও সেক্স লেখে, তাদের কেউ না। লেখক মানে যারা বিশাল বৃক্ষের মতো, তাদের কেউ না। এই মিডিওকার যাদের বলে, যারা সমসাময়িকতার চাহিদা মেটায় ও মৃত্যুর আগেই মরে যায়। ঐরকম লেখক জামিল হতে পারত। জামিলের একটা সম্ভাবনা ছিল মিডিওকারদের যেমন থাকে। কিন্তু পারল না কোনোদিন। প্রত্যেকটি বছরের দিকে তাকিয়ে জামিল চুপ করে থেকেছে। যারা লেখক হতে পারত, কিন্তু লেখা শুরু করতে পারল না, তারা বোধহয় বিপজ্জনক চরিত্রের লোক হয়, জামিল যেমন। মানুষও হয়তো খুন করতে পারে তারা। জামিল মানুষ খুন করেনি, করে থাকলে রহীমদাদ জানে না। কিন্তু আততায়ীর মতোই ওর চরিত্র। সেইরকম অস্থির, অনিশ্চিত ও অসুখী।
‘জামিল পলিটিশিয়ান হতে পারত। কৈশোরে তার চোখ ছিল সেইরকম মেধাবী, বুক ছিল সেইরকম বিশাল। মানুষকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন দেখত শিশুকে নিয়ে। জনতা একদিন নদীর মতো জেগে উঠবে, ভওে উঠবে গুচ্ছ গুচ্ছ পাকাধানে শস্যক্ষেতে- এইসব স্বপ্ন দেখত। অবশ্যই খোঁড়া স্বপ্ন। এইসব ভাঙা কাচের টুকরা সব মানুষের মনেই আমৃত্যু বিঁধে থাকে। কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট, কোনোটা রঙিন, কোনোটা সাদা। কিন্তু প্রত্যেকটাই ভাঙা। প্রত্যেকটারই সুঁচালো মুখ মানুষের বুকের ভেতর বিঁধে যায়। আর খোলা যায় না।
‘জামিল ব্যবসায়ী হতে পারত। হ্যাঁ, ব্যবসায়ীও হতে পারত, সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হয়নি। হতে পারল না। জামিলদের ব্যবসা ছিল, বাপ মারা যাওয়ার পর বড়-ভাইয়ের হাতে সেই ব্যবসা, জামিলের ভাগ প্রায় শূন্য, তবে আছে শুধু এই বাড়ির তিনতলাটা। আর হায়-আফসোস করার জন্যে বুড়া মা। তার রান্নাঘরের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়েছে বটের চারা। মেঝেয় দেখা দিয়েছে ফাটল। জামিল এখন সবকিছুতেই উদাসীন। তার শরীর ভালো না, চাদর জড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে তিনতলার ঝুলবারান্দায়। জামিলের জন্য বড় দুঃখ হয়। সে কিছুই হতে পারল না’।
এ তো জামিলের কথা। আর যে রহীমদাদ জামিলকে নিয়ে এতসব ভাবে, তার কী অবস্থা?
সে ছদ্মনামে থ্রিলার এবং সেক্স লেখে। ঢাকা শহরে খালাতো বোনের বাড়িতে থাকে পেয়িং গেস্ট হিসাবে। টাকার অভাব তার খুবই প্রকট। তবে তার থ্রিলার জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। কাঁচা টাকাও আসতে শুরু করেছে তার হাতে। তবে লেখা কেমন হবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা তার নিজের হাতে নেই। প্রকাশক হাজী আবদুল মতিন সাহেব ম্যানেজার হাসান চৌধুরীর মাধ্যমে তার লেখার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেন। হাসান চৌধুরীকে দেখলেই রহীমদাদের মনে হয় ‘মহাধূর্ত মহা হারামি এক লোক বসে আছে ভালেুকের মতো।’ সে রহীমদাদকে জানায় যে তাদেও নতুন থ্রিলার হতে হবে একটু অন্যরকম। ‘থ্রিলারই, মগর মেয়েমানুষের খেইলটেইল একটু বেশি রাখতে হইব। কাহিনীর মধ্যে সুবিধা পাওয়ামাত্রই বদমাইশির সিন লাগাইয়া দিবেন।’
আর কিছু জিনিস বাদ দিতে হবে রহীমদাদকে। হুজুর, মানে প্রকাশক হাজি আবদুল মতিন সাহেব জানাচ্ছেন তাকে হাসান চৌধুরীর মাধ্যমে- ‘নাম্বার ওয়ান, আপনি চান্স পাইলেই নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, দারিদ্র্য,দুঃখ এইসব ওয়ার্ড লাগাইয়া ফালান। এইসব লাগান যাইব না। হুজুরের নিষেধ’।
দুই নম্বর- ‘নদী, গাছপালা, মেয়েমানুষের চুল, এইসবের বর্ণনা দেওয়া যাবে না। মেয়েমানুষের চুল, খোঁপা এইসব বর্ণনা কইরা লাভটা কী সায়েব? খালি খালি কাগজ আর টাইপ নষ্ট। দিতে চান আসল জিনিসের বর্ণনা দেন। কইলজা ফাটায়া দেন’।
আর হাসান চৌধুরীর ভাষায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- ‘আপনি সায়েব, খুব নাফরমান লোক। ধর্মের কথা একদম লেখেন-টেখেন না। হুজুরের মনে খুব লাগছে। বিস্তারিত অবশ্য কিছুই বলেন নাই। তবে আমার মনে হয় রিলিজিয়ন একটু টাচ কইরেন। পড়ি তো সায়েব আপনার বই। দিলেই পারেন ঐসব ব্যাপারট্যাপার কিছু। একটা গ্রুপ খুব সন্তুষ্ট হয়, বুঝলেন না? যেমন ধরেন আপনার ২৯ নম্বর বইয়ের লাস্ট সিনের কথা। আপনি দিছেন শাহজাদা আর ঐ ক্রিস্টান মাইয়াটা বিছানায় শয়নে আছে আর মাইয়াটা হাসতাছে। জিনিসটা ঠিকই ছিল, খালি যদি ঐ মাইয়াটারে দিয়া কওয়াইতেন, আমি ইসলামধর্মে দীক্ষিত হইতে চাই, আমারে লয়া চলো, উফ্ দারুণ হইত।’
থ্রিলার এবং সেক্স লেখক হিসাবে রহীমদাদ উন্নতির দিকে ধাবমান। বৈষয়িক উন্নতি তো অবধারিত। এই বছরে সে হাজি সাহেবের কাছ থেকে তিনটি বইয়ের বোনাস পেয়েছে। তার পকেটভর্তি টাকা। সেইসাথে হাসান চৌধুরী জানায় যে প্রকাশক হাজি আবদুল মতিন তাকে বলেছেন মিরপুর বা কল্যাণপুরের দিকে রহীমদাদের জন্য দুই-চার কাঠা জমি দেখতে। শুধু জমিই না ‘টিন-ফিন দিয়া একটা বাড়িও কইরা দিতে পারে’।
পাশাপাশি আরেক ধনী মানুষ হীরু মিয়াও প্রকাশক হতে চান। তিনি চটি বই লেখার জন্য রহীমদাদকে তিন হাজার টাকা অগ্রীমও দিয়ে যান। ১৯৭২-৭৩ সালে তিন হাজার অনেক টাকা। রহীমদাদের এখন তর তর করে ওপরে ওঠার পালা।
কিন্তু হয় না। হতে পারে না। আসলে হতে দেয় না। হতে দেয় না রহীমদাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের লেখক সত্তাটি।
রাহাত খান এভাবেই জিতিয়ে দেন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের মানুষগুলিকে।







