চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনৈতিক দল নয়, ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিল

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। পুরো নাম রফিকুল ইসলাম। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরের মতলবে জন্ম গ্রহণ করেন এই ভাষা সংগ্রামী।

পরিচিতি: অধ্যাপক ডক্টর রফিকুল ইসলাম, লেখক, গবেষক এবং ভাষা সংগ্রামী হিসেব পরিচিত। তিনি দেশের প্রথম নজরুল গবেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নজরুল অধ্যাপক ও নজরুল-গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক।
গবেষণা: ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বাংলাদেশর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর গবেষণা আছে।
গ্রন্থ সমূহ : নজরুল নির্দেশিকা, কিশোর কবি নজরুল, কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃষ্টি, কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও কবিতা, কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য, কাজী নজরুল ইসলামের গীতি সাহিত্য, নজরুল জীবনী,
ভাষাতত্ব, বীরের এই রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা, বাংলাদেশর স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঢাকার কথা, ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার, শহীদ মিনার, ভাষা আন্দোলন, অমর একুশে ও শহীদ মিনার, বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাতাত্বিক প্রবন্ধাবলী, বাংলা ব্যাকরণ সমীক্ষা, আব্দুল কাদির, আবুল মনসুর আহমেদ রচনাবলী, হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর।

সম্মাননা ও পুরস্কার: শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১২ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ও নজরুল একাডেমি পুরস্কার সহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন তিনি।
অধ্যাপক ডক্টর রফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। নজরুল গবেষক, ভাষা সংগ্রামী।  ভাষা আন্দোলনের বেশীরভাগ ছবি তার তোলা।

তা. ই. মাসুম: বাংলা ভাষা, বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে যে আন্দোলন হল কেন হল। এর অর্জন কি?
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম : বাংলা ভাষার বয়স অন্তত: হাজার বছর। এবং বাংলা লিপি বা বর্ণমালার বয়সও ৫শ বছর। কাজেই আমরা যদি হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকি, তাহলে ৫শ বছর ধরে বাংলা বর্ণমালায় বাংলা লিখছি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই হাজার বছরের অধিকাংশ সময় বাংলা ভাষা কখনো সরকারি বা রাজ ভাষা হতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত। যেমন, পাল রাজাদের আমলে বাংলাদেশ শাসিত হয়েছিল অপভ্রংশ বা প্রাকৃত ভাষা দিয়ে। সেন রাজাদের আমলে সংস্কৃত ভাষা দিয়ে।
আর মুসলমানি আমলে অর্থাৎ, পুরো মধ্যযুগে তুর্কী, পাঠান, এবং মোগল আমলে ফার্সি ভাষা দিয়ে বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে। ইংরেজ আমলে বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে ইংরেজি ভাষা দিয়ে।  পাকিস্তানী আমলেও বস্তুতপক্ষে ইংরেজি ভাষা দিয়ে শাসিত হয়েছে।

পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হল ১৯৪৭ সালে ১৪ ই বা ১৫ ই আগস্ট। তার আগে থেকেই কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি উঠে এসেছিল। যেমন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন তিনি বলেছিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
তখন ঢাকা থেকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তিনি দাবি করলেন, যে না, বাংলাও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিৎ। কারণ বাংলা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানীর মুখের ভাষা। কিন্তু গোলমালটা বাধল যখন পাকিস্তান গণ-পরিষদে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশ্ন উঠল যে, পাকিস্তান গণ-পরিষদে কোন ভাষা ব্যবহার করা যাবে।

কারণ, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে কেবল ইংরেজি ভাষাই ব্যবহার হওয়ার কথা। তো সেটার একটা সংশোধনী আনলেন প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান। তিনি ইংরেজির সঙ্গে সঙ্গে উর্দুকেও পাকিস্তান গণ-পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব করলেন।
সেই সময় কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তিনি, একটি সংশোধনী প্রস্তাব এনে বাংলাকেও তার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইলেন। এবং প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালীর মুখের ভাষা, বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করারও দাবি উত্থাপন করেন।

কিন্তু সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়, ফলে ৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন সূত্রপাত আমরা লক্ষ্য করি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সভা, শোভাযাত্রা, সচিবালয় ঘেরাও, হাই কোর্ট ঘেরাও এবং তখন প্রধানমন্ত্রীর যে বাড়ি ছিল, বর্ধমান হাউস খাজা নাজিম উদ্দিনের, সেটা ঘেরাও ইত্যাদি। এবং সেখানে লাঠি, টিয়ার গ্যাস, গ্রেফতার ইত্যাদি ইত্যাদি এই ’৪৮ এর ভাষা আন্দোলনে।  ইতিমধ্যে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ঢাকা আসবার কথা মার্চ মাসে। কিন্তু আন্দোলন তখন খুব জোরদার হয়ে উঠেছে।

ফলে খাজা নাজিম উদ্দিন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হলেন ভাষা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে, তাদের যে কর্মপরিষদ ছিল, তাদের সঙ্গে ১১ দফার একই চুক্তি স্বাক্ষর করতে। চুক্তিতে একথা বলা হল যে, পূর্ব বাংলার আইন পরিষদ, বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করবে।

ইতিমধ্যে জিন্নাহ সাহেব ঢাকা আসলেন, এবং তিনি রেসকোর্স ময়দানে এবং  দুদিন পর কার্জন হলে যে সমাবর্তন উৎসব হল, সেখানেও জিন্নাহ সাহেব তার একই উক্তির পুনরাবৃত্তি করলেন। উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সেখানে ছাত্রদের প্রতিবাদ আরো জোরালো ছিল। যার ফলে কি হল? খাজা নাজিমের সাথে যে চুক্তি হল, রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সঙ্গে, সেটা কার্যত বাতিল হয়ে গেল। কিন্তু ’৪৭এর মত ’৪৮, ’৪৯, ’৫০, ’৫১ এই চার বছরই ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়েছে।

আরবি হরফে বাংলা লেখার চেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। বাংলা ভাষা সংস্কার করার, বিকৃত করার যেসব চেষ্টা হয়েছে, সরকারী তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু সরকার কোন কিছুতেই কর্ণপাত করেনি।  এবং এর মধ্যে ১৯৫২ সালে জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হচ্ছিল। সে উপলক্ষে এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন যিনি আগে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বললেন যে, ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের যে শাসনতন্ত্র তাতে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
এবং ঔ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ আবার গঠিত হয়।  বার লাইব্রেরীতে বিভিন্ন সংগঠনের সভা বসে, ইতিমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে-কি-না, এই নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যুব সংগঠন, ছাত্র সংগঠন তাদের মধ্যে নানান রকম তর্ক বিতর্ক হয়।  এবং রাজনৈতিক দলগুলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না। কারণ তাদের ভয় ছিল একটা, যদি আন্দোলন হয় তবে সাধারণ নির্বাচন দিবে মুসলিম লীগ সরকার, সেটা হয়ত পিছিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্মপরিষদ, মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি ইত্যাদি ছাত্র সংগঠনগুলো, ছাত্ররা সাধারণভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন।

২১শে ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করবার সিদ্ধান্তটা কিন্তু ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তারিখেই গৃহীত হয়েছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সাধারণ ছাত্র সভা হল। তখন প্রথম রাজনীতিবিদ শামসুল হক সাহেব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে আন্দোলন করার কথা বললেন।

অন্য দিকে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবায়ক আব্দুল মতিন, তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে বক্তব্য দিলেন। আমরা অর্থাৎ সাধারণ ছাত্র যারা ছিলাম, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে আমরা মত দিলাম। এবং সিদ্ধান্ত হল যে, ১০ জন ১০ জন করে গিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে।
এবং এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গিয়েই কিন্তু, পুলিশের সঙ্গে এই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরাতন কলা ভবন থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ এদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। তখন গণ-পরিষদ ছিল জগন্নাথ হল মিলনায়তনে। পুরো এলাকাটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

২১শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে পূর্ব বাংলা আইনসভায় বাজেট অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। আমরা চেষ্টা করছিলাম, আমরা অর্থাৎ ছাত্ররা।  যে, আইনসভায় গিয়ে বাংলা ভাষার দাবি পেশ করব এবং ছাত্রদের ওপর যে জুলুম হয়েছে, অত্যাচার হয়েছে তার বিচার চাইব।  কিন্তু তারই আগেই অপরাহ্ণে গুলি চলে। এবং এই গুলিটা ছিল আশাতীত, আমরা কখনো ভাবিনি যে, ভাষার দাবির জন্য গুলি চলতে পারে!
এবং গুলিতে প্রথমেই যিনি নিহত হন তিনি মানিকগঞ্জের রফিক উদ্দিন আহমেদ। যার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। এছাড়াও আরো কয়েকজন বুলেটবিদ্ধ হন তার মধ্যে, আবুল বরকত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাকে আমরা ধরাধরি করে মেডিকেল কলেজ ইমার্জেন্সীতে নিয়ে যাই। এবং সেদিন রাতেই তিনি অপারেশন থিয়েটারে মারা যান।

এছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারিতে সালাম এবং জব্বার গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে এরাও মারা যান। এছাড়া আরেকজন কিশোর মেডিকেল কলেজ এবং ফুলার রোডের মাঝখানে তিনি বেয়নেট বিদ্ধ হয়ে একটি কিশোর মারা যায় এবং সে লাশটি গুম করে ফেলে।

২২ তারিখ সকাল বেলা একটা বিশাল গায়েবানা জানাযা হয় মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে। এবং জানাযা শেষে আগের দিন যারা গুলি খেয়েছে, তাদের রক্তমাখা কাপড়কে পতাকা বানিয়ে বিশাল এক শোক শোভাযাত্রা বের হয়।  এবং সেটা যখন হাইকোটের সামনে আসে, তখন আবার গুলি চলে। এবং মিছিল দু’ভাগ হয়ে যায়। এখানে কিন্তু বেশ কিছু লোক হতাহত হয়। তাদের নিয়ে যায়। সেখানে কারা মারা গেছে বলতে পারব না। কারণ লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে।  এবং মিছিলে আরেকটা অংশ নবাবপুরের দিকে চলে যায়। তারা তখন সংবাদ অফিস, তখন মুসলিম লীগের মুখপাত্র ছিল সংবাদ। মর্নিং নিউজ জনসন রোডে, সংবাদ অফিস বংশাল নিশাত সিনেমা হলের ওখানে ছিল। বিভিন্ন জায়গায় ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখ প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয় এবং অসংখ্যবার গুলি চলে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

২২ তারিখে কিন্তু সামরিক বাহিনীও নামে।  এবং ঐদিন নবাবপুর রোডে গুলিবিদ্ধ হন শফিউর রহমান। যিনি পরে হাসপাতালে মারা যান।
এছাড়াও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আউয়াল নামে একজন রিকশাওয়ালা।  আরো একটি কিশোর বেয়নেট বিদ্ধ হয়ে মারা যায়, কিন্তু এগুলোর লাশ গুম করে ফেলে।  কাজেই ২১ এবং ২২ তারিখে বাংলা ভাষার দাবিতে যে ঠিক কত জন প্রাণ দিয়েছে। সে হিসাব বা সে তালিকা আমাদের কাছে নেই।
কিন্তু আমি আমার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে, ২১ এবং ২২ তারিখের ঘটনা অংশ গ্রহণকারী হিসেবে। আমার ধারনা যে অন্তত ৮ জন, এই দুদিনে কমপক্ষে হলেও ৮ জন শহীদ হয়েছেন।

কিন্তু কবর আছে মাত্র দু’জন শহীদের। একুশের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ তার কোন কবর নেই। আবুল বরকতের কবর আছে, ২১শে ফেব্রুয়ারি যে শহীদ শফিউর রহমান তার কবর আছে। আর কোন শহীদের কবর নাই। লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে অথবা গণকবরে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে সে শহীদানের নাম মুছে গেছে। আমরা এপর্যন্ত কেবল ৪ জন কি ৫ জন শহীদের আলোকচিত্র যোগাড় করতে পেরেছি। যেটা আপনি বাংলা একাডেমিতে গেলে দেখতে পাবেন। তাদের নামে স্ট্যাম্প প্রকাশিত হয়েছিল।

২১শে ফেব্রুয়ারি, আমি বলব, একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি।
প্রথমতঃ আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা উন্মেষ ঘটেছে।
দ্বিতীয়ত: বাংলাভাষা আন্দোলন থেকেই বাংলাদেশ আন্দোলনের সূচনা।
তৃতীয়ত: বাংলাদেশের আমাদের নিজস্ব যে সাহিত্য সংস্কৃতি যে গড়ে উঠছে এ সবটাই কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে।
যেমন আমি একটি উদাহরণ দেই। একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলি চলে প্রথম ঢাকায়। কিন্তু কবিতা রচিত হয় প্রথম চট্টগ্রামে। মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। গল্প লেখা হয় প্রথম চট্টগ্রামে। শওকত ওসমানের ‘মৌন নয়’। গান লেখা হয় প্রথম খুলনায়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ কিন্তু তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় রচিত নয়। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো প্রথম গাওয়া হয় ৫৩ সালের শহীদ দিবসে, ঢাকা কলেজের অনুষ্ঠানে।

আর কি পেয়েছি এই ২১ থেকে? এই শহীদ মিনার পেয়েছি, ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে রাতারাতি মেডিকেল কলেজ এর ছাত্র-ছাত্রী, নার্স ওয়ার্ড বয় সবাই মিলে ১০/১১ ফুট উঁচু একটা শহীদ মিনার তৈরি করেছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে এটা একটা বাঙালীর তীর্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল। ২৪, ২৫, ২৬ এই তিনটি দিন, এই তিনটি দিনে শহীদ মিনার বাঙালীর অন্তরে গেঁথে যায়। ২৬ তারিখে যখন ঐ শহীদ মিনারটি ধ্বংস করে দেয়া হয়। পাক সামরিক বাহিনী যখন এসে এটাকে ধ্বংস করে, গুড়ো করে, বুডোজার দিয়ে ধূলি, বালি, ইট, সিমেন্ট সমস্ত কিছু তুলে নিয়ে চলে যায়। ঐ জায়গাটাতে একটা কালো কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে, প্রথম যেখানে শহীদের রক্ত ঝরেছিল।
একটা লাল পতাকা, রক্ত পতাকা শহীদের রক্তে। আর মেডিকেল কলেজের ব্যারাকের গায়ে একটা কোটেশন্স:
‘বীরের এ রক্ত স্রোত,
মাতার এ অশ্রু ধারা,
এর যত মূল্য,
সে-কি ধরার দূলায় হবে হারা?’
তো এই ১৯৫৩, ’৫৪, ’৫৫, ’৫৬ সাল পর্যন্ত এইটাই ছিল, এই যে, কালো কাপড় ঘেরা এইটাই ছিল আমাদের শহীদ মিনার। একটা প্রতীক।
তার পর যুক্তফ্রন্ট এলো, ২১ থেকে ২১ দফা, ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট। শেরে বাংলার নেতৃত্বে যুক্ত ফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হল। তারা ২১শে ফেব্রুয়ারিতে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করল। তার পর তারা কিন্তু ৪৫ দিন পর যুক্তফ্রন্ট সরকার অপসারিত হল। এলো ৯২ (ক) ধারা।
এবং ১৯৫৫ সালে আবার শহীদ দিবস পালনে বাঁধা দেয়া হল।

তা. ই. মাসুম: ১৯৫৫ সালে?
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম : ৫৫ সালে, প্রচণ্ড! সেখানে ৫২ সালের আরেকটা পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। এত ছাত্র-ছাত্রী গ্রেফতার হয়েছিল! যে তাদের জেলে রাখা যায় নি। তখন তাদের লালবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সামনে তাঁবু খাঁটিয়ে তাদের জন্য টেম্পরারী জেলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কেউ মারা যায় নি। কিন্তু ৫৬ সালে আর হয়নি, ৫৫ সাল থেকেই অবস্থাটা চেঞ্জ হতে থাকে। যখন আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে। তখনকার মুখ্য মন্ত্রী আবু হোসেন সরকার এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী এবং শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম এরা শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

তার পরে যখন ১৯৫৬ কি ’৫৭ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো, আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তখন শহীদ মিনারের নকশা আহবান করা হল। এবং একটা কমিটি করে দেয়া হল চীফ ইঞ্জিনিয়ার আ: জব্বার সাহেব, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, আরেকজন গ্রীক আর্কিটেক্ট ছিলেন সরকারী তাকে নিয়ে। এবং শিল্পী হামিদুর রহমান তখন কেবল ইংল্যান্ড থেকে শিল্পকলায় উচ্চ শিক্ষা সমাপন করে দেশে ফিরেছেন। অনেক, অনেকে নকশা দিলেন, হামিদুর রহমানের নকশাই গৃহীত হল।  এবং ১৯৫৭ সাল থেকে তিনি শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তিনি কিন্তু ওখানে একটা ঝুপরি বানিয়ে থাকতেন এবং পুরো কাজটা তিনি নিজে তদারক করতেন। এবং ১৯৫৮ সালে যখন মার্শাল ল’ হয় আইয়ুব খানের সেই পর্যন্ত শহীদ মিনারের ভিত্তি মঞ্চ এবং ৫টি কলাম তো? তার মধ্যে ৪টির নির্মাণ সমাপ্ত হয়ে গেছিল।

তার পর ৫৮ সালে যখন সামরিক আইন জারি হল তখন হামিদুর রহমানকে বের করে দেয়া হল। সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণ আর শেষ হল না। সেই অসমাপ্ত শহীদ মিনারে আমরা ৫৮ সাল ৫৯ সাল ৬০ সাল, ৬১ সাল, ৬২ সাল এই ৫ বছর অসমাপ্ত শহীদ মিনারেই আমরা শহীদ দিবস পালন করেছি। তবে ১৯৬৩ সালে যখন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আযম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন।

তিনি একটা কমিটি করে দিলেন মুনীর চৌধুরী ছিলেন সে কমিটির আহবায়ক। তার ঐ হামিদুর রহমানের যে মূল যে নকশা সেটা কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে তাড়াহুড়া করে শহীদ মিনারটা শেষ করে দিল। শহীদ মিনার তৈরিটা শেষ করে দিল।  তখন কি হল? মাঝ খানে ঐযে, স্তম্ভ মা, আর দুটো দুটো করে পাশে স্তম্ভ সন্তান, ৪টা স্তম্ভ ছেলে সন্তান। আর মা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে দোয়া করছেন যে সন্তানরা তার ভাষাকে রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ৬৩ সালে আমরা প্রথম, যদিও হামিদুর রহমানের মূল নকশা অনুসৃত হয়নি। কিন্তু হামিদুর রহমানের শহীদ মিনারের নকশার যে মূল প্রতিপাদ্য ছিল, সেটা ছিল। এখন যেখানে লোহার শিকগুলো দেখছেন, শহীদ মিনারে মাঝখানে, সেটা ওর মধ্যে ছিল না, অন্যভাবে ছিল। এইটা দিয়ে একটা গ্যালজ অর্থাৎ প্রিজন তার একটা আদলে।

৬৩ সাল থেকে এই শহীদ মিনারে আমরা শহীদ দিবস পালন করতে লাগলাম। ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৬৮ উনসত্তর এর গণঅভ্যুত্থানের সময়। ৬৯, ৭০, ৭১ এই তিন বছর এই শহীদ মিনার। ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের সময় যে অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছে, প্রত্যেকের লাশ কিন্তু শহীদ মিনারে আনা হয়েছে। এখানে জানাযা হয়েছে। তার পরে আজিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কবর দেয়ার জন্য।

৭০ সালের নির্বাচনের সময়, আবার ৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও কিন্তু শহীদ মিনার আবার এই বাঙালীর জাগরণের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে উঠল। এবং ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ মিনার সবচেয়ে আমি বলব, সবচেয়ে জঙ্গি শহীদ দিবস পালিত হয় এই শহীদ মিনারে।
১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে, ২৬ শে মার্চ ২৭ শে মার্চ এই যে, ঢাকায় যে, পাকিস্তানীরা যে, সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে তারা, তখন কিন্তু শহীদ মিনার তাদের অন্যতম টার্গেট ছিল।অমর একুশে

কাজেই, এই শহীদ মিনার প্রথম শহীদ মিনার মেডিকেল কলেজের সামনে সেটা ভেঙ্গে ফেলা হয়।
দ্বিতীয় শহীদ মিনার যেটা সেটাও ভেঙ্গে ফেলা হয়।
তৃতীয় শহীদ মিনার যেটা সেটাও আশির দশকে সংস্কার করা হয়।
কিন্তু শহীদ মিনারের যে মূল, প্রতিপাদ্য, মাতা-মাতৃভূমি-মাতৃভাষা এবং তার সন্তান অর্থাৎ দেশবাসী এইটা কিন্তু সারা দেশে, মানে সারা বিশ্বে যেখানে বঙ্গালী আছে সেটানে এটা ছড়িয়ে গেছে।
এবং আপনি যেখানে যাবেন এই শহীদ মিনারের আদলে স্থায়ী-অস্থায়ী অনেক শহীদ মিনার পাবেন। আপনি লন্ডনে যান, আপনি এই আদলে শহীদ মিনার পাবেন, একদম স্থায়ী ইস্ট লন্ডনে বাঙালী এলাকা। আপনি কলকাতা যান, কার্জন পার্কে আপনি শহীদ স্মারক পাবেন।
আপনি শীলচরে যান, করিমগঞ্জে যান বাংলা ভাষাভাষী এলাকায় যেখানে বাংলা ভাষা আন্দোলন হয়েছে। যেখানে ১৯৬১ সালে ১১ জন মারা গেছে। ১৯৭২ সালে মারা গেছে, ১৯৮৬ সালে মারা গেছে। সেখানেও আপনি শহীদ মিনার পাবেন। কাজেই ভাষার শহীদ মিনার এখন বিশ্বব্যাপী।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার! ২০শে ফ্রেবুয়ারি থেকে আমরা শহীদ মিনার ঝাড়-ফুঁক শুরু করি। এবং ২০শে ফেব্রুয়ারি মধ্য রাত থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমরা যত্ন নেই! তার পর শহীদ মিনার অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে।

মাঝে মাঝে সভা-সমিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অন্য সময় এটা সন্ধ্যায় এবং দিনে ভবঘুরেদের, হকারদের, সন্ত্রাসীদের, এবং মাস্তানদের আখড়ায় পরিণত হয়। আমরা কিন্তু শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি না।

তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস হয়েছে সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সেই কানাডার দুই প্রবাসী বাঙালী যাদের নামও আবার অদ্ভুত! রফিক এবং শফিক। সেই ভাষা শহীদদের নামে। তারা কফি আনানের (সেই সময়ের জাতিসংঘ মহাসচিব) কাছে প্রস্তাব করলেন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামে এক প্রতিষ্ঠান থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার জন্য। কফি আনান বললেন যে, তোমারা ইউনেস্কোর কাছে আবেদন কর। তারা ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করলেন।

ইউনেস্কো বলল, যদি কোন সরকার এই প্রস্তাব না করে তাহলে এটা আমরা বিবেচনা করতে পারি না। তখন বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে। জাতিসংঘকে একটা দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার জন্য প্রস্তাব পেশ করলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি সেই তারিখটি ফেলার জন্য অনুরোধ জানালেন। ইউনেস্কোর প্রতিবছর একটা ওদের বার্ষিক সাধারণ সভা হয় প্যারিসে।  ১৯৯৯ সালের খুব সম্ভবত তারিখটা ছিল ১৭ই নভেম্বর।

তা. ই. মাসুম: ১৭ নভেম্বর।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম : সেই তারিখে ইউনেস্কোর সাধারণ পরিবেশন অধিবেশনে সর্ব সম্মতিক্রমে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এবং আমরা প্রথম বাংলাদেশে ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করি।  ২১শে ফেব্রুয়ারিতে।

চলবে..