বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হতে নীতি, আদর্শ, ত্যাগ, মানবিকতা ও দেশপ্রেম ক্রমশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। অসাম্প্রদায়িকতার দাবীদাররা মিশে যাচ্ছেন সাম্প্রদায়িকদের সাথে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ দাবীদাররা মিশে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সাথে, বামরা মিশে যাচ্ছে ডানদের সাথে। এই মেশামেশিকে তারা চালিয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। এটা চলে আসছে বহু আগে হতেই। এই কথিত কৌশলে কেউ জিয়ার কোলে সুবোধ বালকের মতো চড়ে বসেছেন কেউ এরশাদের। সামরিক শাসকদের এসব রাজনৈতিক ফ্রন্টে অনেক বামপন্থীদের যোগ দিতে দেখা গেছে। হয়তো সেটাও বামদের কৌশল ছিল। কিন্তু তাদের এ কৌশল তাদের টিকিয়ে রাখেনি টিকিয়েছে মেজর জিয়া ও তার বিএনপি এবং এরশাদ ও তার জাতীয় পার্টিকেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, কাজী জাফর তারা তাদের কৌশলের জালে জিয়া-এরশাদকে আটকাতে পারেনি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের বানানো জালে আটকে গেছেন। এখন দলীয় অবস্থানগত ভাবেও বামদের চেয়ে তারাই এগিয়ে।
বামপন্থীদের মাঝে আরো একটি আত্মঘাতী কৌশল চালু ছিল। সেটাকে বলা হত বিলোপবাদ। এই বিলোপবাদ কৌশলের জালেও তারা নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন করেছে। সেটা ছিল ভেতরে বাম বাইরে বুর্জোয়া দলের নেতা। দেশ স্বাধীনের পরে আওয়ামী লীগ নেতাকেও গ্রেপ্তার হতে দেখা গেছে বাম নেতা হিসেবে। মানুষ অবাক হয়েছে এতকাল ধরে তাকে তারা যেভাবে চিনেছে তিনি তা নন। জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের সাথেও সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। অনেক রাজাকার তার মন্ত্রিসভার সদস্যও হয়েছিলেন। কৌশল হিসেবে তিনি আবার বামপন্থীদেরকেও মন্ত্রীসভায় ঠাঁই দিয়েছিলেন। ক্ষমতার মসনদকে রক্ষার কৌশল হিসেবে ডান, বাম, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার সবাইকে কাছে টেনেছিলেন তিনি।
এরপর এলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। তখনও আবার সেই কৌশল। স্বৈরাচার হটানোর শক্তিভিত মজবুত করার জন্য ৭ দল, ৫ দল, ৮ দল একীভূত আন্দোলন করল। এতে জামাতও যোগ দিল। এরশাদের পতন হল।ক্ষমতায় এলো বিএনপি। ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর জন্য তারা টেনে নিলো ধর্মবেনিয়া জঙ্গিবাদীদের। তাদের প্রশ্রয়ে দেশ জুড়ে ব্যাপক উৎপাত বেড়ে গেল এসব জঙ্গিদের। জেএমবি, বাংলা ভাই, হরকাতুল জিহাদ সহ নানা জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে তখন। চলে গুপ্ত হত্যা ও বোমাবাজি। আক্রান্ত হয় আদালত। একযোগে ৬৩ টি জেলায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে দেশে। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইকে গ্রেপ্তার করার কৌশলও গ্রহণ করে তারা। নির্বাচনে জেতার কৌশল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ধর্মীয় লেবাসের কৌশল। বিএনপি নির্বাচনী শ্লোগান দিত, ধানের শীষে ভোট না দিলে, বিসমিল্লাহ উঠে যাবে! সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ভোট টানার জন্য সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছে তারা।
অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সরকার। যে এরশাদকে হটানোর জন্য রাজপথে লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে, সেই এরশাদ যাতে করে বিএনপির সাথে গাঁটছড়া না বাঁধতে পারে সেজন্যই তার দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গড়ে তোলে মহাজোট। যে হেফাজত অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করেছে। ভোটের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে অসাম্প্রদায়িক দাবীদার আওয়ামী লীগ হেফাজতের অনেক দাবীর কাছে নতি স্বীকার করছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকেও বহাল রাখা হয়েছে। যে রাষ্ট্রে একটি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে বহাল রাখা হয়। সে রাষ্ট্রকে কি ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র’ বলা যায়?
কৌশলের কাছে প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে নীতিবোধ ও আদর্শিক চেতনা। হারাচ্ছে স্বাধীন স্বকীয় সত্তা। বামপন্থীরা নিজেদের দলীয় প্রতীক বিসর্জন দিয়ে নির্বাচনে শরীক হচ্ছে অন্য দলের প্রতীক নিয়ে। এটাও বুঝি ভোটে জেতার কৌশল! নিজেদের প্রতীকে ভোটে জেতা যাবে না তাই অন্যদলের প্রতীক গ্রহণ। আবার দলীয় প্রতীকেও কিছু প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয় নিজেদের দলীয় অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য। সেটাও বুঝি কৌশল! এভাবেই বহুমুখী কৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে নীতিবোধ ও আদর্শিক সত্তা। কৌশলের মহামারিতে যেন ঢেকে যাচ্ছে সবাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








