চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিবিদের হাতে না থাকলে জনগণ বঞ্চিত হয়’

রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিবিদের হাতেই থাকতে হবে, এর ব্যত্যয় যেমন বাস্তবসম্মত নয়; ঠিক তেমনই তা জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনে না, জনগণ বঞ্চিত হয় বলে মন্তব্য করেছেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের একটি গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতিতে জনমানুষের প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন: রাজনীতিবিদরাই রাজনীতি করেন, এটা ঐতিহ্যগতভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়; সারা বিশ্বে স্বীকৃত। কেননা, সকল সমীকরণ শেষে রাজনীতিবিদরাই দেশের মানুষের কথা ভাবেন, দেশের কল্যাণে কাজ করেন; এটাই একজন রাজনীতিবিদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

রাজনীতিবিদের সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া উচিত। সেটি করতে ব্যর্থ হলে জনগণ রাজনীতিবিদদের  ভোটাধিকারের মাধ্যমে অনাস্থা জানাবে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এ সংসদ সদস্য৷

বাহাউদ্দিন নাছিম আরও বলেন: অনেক সময় ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী, আমলা কিংবা অনান্য পেশাজীবীদের কর্মজীবন শেষে রাজনীতিতে আসতে দেখা যায়। তারা আসতে পারে, রাজনীতি করতে কারও কোন বাধা নেই, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি দেশের সকল সচেতন নাগরিকের সে অধিকার রয়েছে। কিন্তু, রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কোনভাবেই ব্যবসায়ী কিংবা আমলাদের হাতে চলে যাওয়া সমীচীন নয়। একজন ব্যবসায়ী কিংবা আমলা হুট করে রাজনীতিতে এসে দলের নেতৃত্বে চলে আসা কিংবা মুখপাত্র বনে যাওয়া কোন ভাবে দেশ ও জাতির জন্য শুভকর কিছু বয়ে আনতে পারে না।

এ বিষয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন: রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই রাজনীতিবীদদের হাতেই থাকতে হবে। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ী হাতে চলে যাওয়া কোন ভাবেই বাস্তব সম্মত নয়৷ আর তা যদি হয় তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ, যা কখনই জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে না৷

বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এ নেতা বলেন: আমরা দেখে থাকি অনেকে ব্যবসা করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতা হন, আবার একটা সময় এসে রাজনৈতিক নেতা হবার জন্যও রাজনৈতিক দলগুলোতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। এই ব্যক্তিরাই যখন রাজনীতিকে ব্যবহার করে দল থেকে শুরু করে একটা পর্যায়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন তখন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, রাজনীতিকে কলুষিত করেন।

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কোন ভাবেই গণতান্ত্রিক একটি দেশ, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং জনগণের জন্য কাম্য নয় মন্তব্য করে সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ।

দুর্নীতি এবং শুদ্ধি অভিযান
দুর্নীতি এবং সরকারের পরিচালিত শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বলেন: দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না। যে বা যারাই দুর্নীতিতে জড়াবে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আপনারা দেখেছে কার পরিচয় কী, রাজনীতিতে কে কতো প্রভাবশালী; দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কোন কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

শুদ্ধি অভিযান কি শুধু রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে, নাকি দুর্নীতির দুষ্টচক্রের অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা-আমলারাও এর আওতায় আসবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন: শুদ্ধি অভিযানটা আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ঘর থেকেই শুরু করেছেন, এটা তার মহানুভবতা। ক্রমান্নয়ে এটি সর্বস্তরে পরিচালিত হবে। আপনারা খেয়াল করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। শুধু সে নয় অধিদপ্তরের অন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে তলব করেছে দুদক। এ থেকেই পরিস্কার সরকার দুর্নীতির ক্ষেত্রে কারও প্রতি নমনীয় নয়৷ দুর্নীতি যেই করুক আর পরিচয় যায় হোক না কেন কেউ রেহাই পাবে না।

আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ এবং দলীয় অবস্থান
টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় দলটিতে অনেক অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে, যা নানা সময়ে আলোচিত। অনেক সময় অনুপ্রবেশকারীরা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ বিষয়টি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি বলেন: আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের ঘটনা আমাদের দলের অভিভাবক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন৷ তিনি নিজেই অনুপ্রবেশকারীদের একটি তালিকা তৈরি করে, সাংগঠনিক বিভাগগুলোর দায়িত্বে থাকা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের হাতে দিয়েছেন। নেত্রীর নির্দেশনায় মোতাবেক আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে অনেক অনুপ্রবেশকারী দলের পদ হারিয়ে এবং দল থেকে বিতাড়িত হয়েছে৷ আমি এতোটুকু বলতে পারি অনুপ্রবেশের সংখ্যা আমরা কমিয়ে এনেছি। এরপরও যারা রয়ে গেছে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে বের করে দেওয়া হবে৷

‘কোনো সুযোগ সন্ধানি মহল, কিংবা আদর্শহীন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি কোনভাবে ক্ষুণ্ন না করতে পারে এবং জনপ্রিয়তায় আঁচড় না ফেলতে পারে, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগ সতর্ক। একই সঙ্গে, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে দলে নতুন করে যেন অনুপ্রবেশ না ঘটতে পারে, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সতর্ক৷’

সেই সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন: আওয়ামী লীগ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধরণের নেতা, কর্মী সমর্থক আমাদের দলে রয়েছে। এই দলের তৃণমূলের সঙ্গে এতো বেশি সংখ্যক মানুষ জড়িত, যা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় বিরল। সে বিবেচনায় দু-একজন আদর্শহীন মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটলে তা ঠেকানো সত্যিই কষ্টকর৷

এমন দু’একজনের অপকর্মের দায় কোন ভাবেই আওয়ামী লীগ নেবে না। ব্যাক্তি অপকর্মের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বাহাউদ্দিন নাছিম।

তৃণমূল: আওয়ামী লীগের পাওয়ার হাউজ
আওয়ামী লীগের তৃণমূল নিয়েও কথা বলেন দলটিকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগের মতো তৃণমূলে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ তার ইতিহাসে পায়নি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন: তৃণমূলে এতবেশি জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে অতীতে কোনো দল পায়নি, পাকিস্তান আমলেও কোন রাজনৈতিক দলের তৃণমূলে এমন শক্ত অবস্থান ছিলো না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কেউ তৃণমূলে এমন শক্তিশালী অবস্থান ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি কোন রাজনৈতিক দল।

‘এমনকি যখন সেনা শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলো, তখনও আওয়ামী লীগ তৃণমূলের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবেই পরিচিত ছিলো। তৎকালীন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে সবসময় আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তারা তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। এটা কারও অজানা নয়।’

সক্রিয় নেতা-কর্মীর বিশালতা বিবেচনা অনেক সময় তৃণমূলে নেতৃত্বের প্রতিযোগীতা তৈরি হলেও সেটা ‘দ্বন্দ্ব’ নাম দিতে চান না তিনি। এটাতে দলের অভ্যন্তরীন গণতন্ত্রিক রাজনীতির চর্চার সৌন্দর্য বলে মনে করেন বাহাউদ্দিন নাছিম।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনে মাদারীপুর-০৩ সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে, দলের নির্বাচনী প্রচারণা এবং সাংগঠনিক ভিত মজবুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যার ফল হিসেবে গতবছর (২০১৯) ২১ ডিসেম্বরের আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকে নির্বাচিত হন এ রাজনীতিবিদ।