চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রমজান প্রদত্ত দশটি বিশেষ শিক্ষণীয় বিষয়

“সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না” প্রবাদটি চির সত্য বলে মেনে নিয়েই আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে, মুসলমানদের প্রিয়তম মাস রমজান বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে।

করোনার সংকটকালে স্বাগত জানানো রমজানকে বিদায়ও জানাতে হচ্ছে করোনার আতঙ্কগ্রস্থতার মধ্য দিয়েই। চলে যাচ্ছে, চলে যাবে ; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কী রেখে গেল রমজান? কী শিক্ষা রমজান আমাদেরকে দিয়ে গেল? রমজান আমাদেরকে কোন দীক্ষায় দীক্ষিত করলো? একজন শিক্ষক হিসেবে রমজানের কাছ থেকে আমরা কী কী শিখতে পারলাম? রমজান থেকে শিক্ষণীয় এমন ১০টি বিষয় পাঠক সমীপে হাজির করছি।

বিজ্ঞাপন

১.তাকওয়া: তাকওয়া মানে খোদাভীতি বা আল্লাহর ভয়। রমজান আমাদেরকে সব থেকে বেশি শিক্ষা দেয়, তাকওয়া। আল্লাহ তায়ালা যে আয়াতে রোজা ফরজ ঘোষণা করেছেন সে আয়াতের শেষাংশে বলেছেন, “যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”। একজন রোজাদের ব্যক্তি চাইলেই ঘরের কোণে চুপিচুপি কিছু খেতে পারেন, তৃষ্ণা মেটাতে পারেন, ক্ষুধা নিবারণ করতে পারেন, কিন্তু করেননা! কেন? সে চিন্তা করে, “কেউ দেখুক না দেখুক, আমার আল্লাহ তো আমাকে দেখছে, তিনি তো সর্বদ্রষ্টা, আমি সর্বক্ষণ তাঁর নজরবন্দী”। এই যে আল্লাহর ভয়, এটা রোজার মাধ্যমে আমাদের আয়ত্তে আসে অনেক বেশি।

২.আত্মসংযম: আত্মসংযম মানে নিজেকে দমন করা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। অন্যান্য মাসে যেভাবে আমরা সাধারণভাবে কথা বলি, অশ্লীল শব্দ চয়নে কার্পণ্য বোধ করিনা, কাউকে গালি দিতে কুণ্ঠিত হইনা, মিথ্যা বলতে একবারও ভাবিনা, যে কোনো সময় রাগারাগি করি। এসব কিন্তু রমজানে আমাদের মধ্যে একেবারেই কম ঘটে। রোজার বিশুদ্ধতার খাতিরে, রমজানের পবিত্রতার কথা চিন্তা করে অনেক সময় আমরা নিজেদেরকে এসব অপকর্ম থেকে বিরত রাখি। এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অভ্যাস আমাদের মধ্যে কেবল রমজান মাসেই তৈরি হয়।

৩. ধৈর্য: ইফতারের সকল সরঞ্জাম প্রস্তুত, কিন্তু আমরা বিন্দু পরিমাণও কিছু গ্রহণ করছিনা। এটাই ধৈর্য। কেউ আমাকে গালি দিয়েছে, কিন্তু আমি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে রইলাম ; কেউ আমার উপর অত্যাচার করলো, কিন্তু রোজাদার বলে আমি পাল্টা কিছু করলাম না। এসবই ধৈর্য। ইবাদতের মধ্যেও রমজান আমাদেরকে প্রবল ধৈর্য শিক্ষা দেয়। প্রতিদিন রোজা রেখে যে আমরা এশার নামায শেষ করে ২০ রাকাত করে তারাবির নামায পড়ছি। এটাকি ইবাদতের ধৈর্য নয়? অন্যান্য মাসে যেখানে কেবল ফরজ নামাযগুলো পড়তেই আমাদের অলসতা চলে আসে সেখানে রমজান কিন্তু আমাদের অলসতাটা একেবারেই আসেনা! ইবাদতে একনিষ্ঠতার জন্য অপরিহার্য এ ধৈর্যটা রমজান আমাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়।

৪. পরিমিত আহার: পেট পুরে আহার করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে, গলা পর্যন্ত ভক্ষণের যে নেতিবাচক প্রভাব সেটাও হাদিসে এসেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানও এ ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক করছে। রমজান মাসে এ ব্যাপারে আমরা অবচেতনেই যথেষ্ট সতর্ক থাকি। ইফতারে যতটুকু সম্ভব খাদ্য গ্রহণ করি, আমরা সতর্ক থাকি যে, বেশি খেলে আবার তারাবি পড়তে অসুবিধা হবে। সাহরিতে খুব কম খাই, আমরা লক্ষ্য রাখি যে, বেশি খেলে আবার সমস্যা হতে পারে। এই যে পরিমিত পরিমাণে আহারের একটা অনুশীলন পুরো রমজান জুড়ে চলছে এটাকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

৫. সু-শৃঙ্খলবোধ: সাহরি থেকে শুরু করে তারাবিহ পর্যন্ত প্রাত্যহিক যে সু-শৃঙ্খল বোধ রমযান আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে তা আমাদের নজরে না আসলেও আমাদের জীবনের জন্য গুরুত্ববহ। রমজান প্রতিটা রোজাদেরকে একটা নির্দিষ্ট রুটিন থাকে, যে রুটিন অনুযায়ী একজন রোজাদার পুরো দিনটাকে পরিচালনা করে। রমজান-প্রদত্ত এ রুটিনখানা আমাদেরকে রমজান পরও কল্যাণের স্বার্থে বহন করতে হবে।

৬. কুরআন তিলাওয়াত: যারা আমরা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে পারি, অভ্যস্ত তাঁরা রমজানের প্রতিদিনই কিছু-না-কিছু হলেও তিলাওয়াত করি, করার চেষ্টা করি। রমজান কুরআন তিলাওয়াতের যে বিশেষ ফজিলত তা আমাদেরকে তিলাওয়াতে প্রভূতভাবে উৎসাহিত করে। রমজানকে এ উৎসাহে অনেকে পুরো কুরআন খতম করে ফেলি, অনেক ভাগ্যবান একাধিক খতমও দিয়ে থাকে এভাবেই রমজানকে জুড়ে মুসলমানদের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াতের একটা হিড়িক পড়ে যায়। কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি রমজান আমাদেরকে যেভাবে উৎসাহিত করে, আকর্ষণ সৃষ্টি করে তা অবশ্যই লক্ষ্যণীয়।

৭.গরিবদের সহযোগিতা: রমজান আসলেই যাকাতের প্রতি আমাদের একটা বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয়। সামর্থ্যানুযায়ী প্রায় সকলেই হকদারদের যাকাত প্রদান করে থাকেন। এ যাকাতের মাধ্যমে সমাজের যারা গরিব-এতিম-মিসকিন-অসহায় মানুষ আছেন তাদের প্রতি আমাদের বিশেষ সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। ফলে, যাকাতের বাহিরেও ভিন্নভাবে তাদেরকে সহযোগিতা করার একটা তাগিদ অনেকে অনুভব করেন।

৮.অপরকে খাওয়ানো: রমজানে একজন রোজাদারকে ইফতার করানোর মধ্যে যে বিপুল সাওয়াব প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে তা প্রিয় নবী আমাদেরকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন। বিপুল সাওয়াব প্রাপ্তির দিকে লক্ষ্য করে রমজানে অনেকেই অসহায়দের ইফতার-সাহরির ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসেন। এতে আমাদের মধ্যে এক ধরনের মানবিক বোধ জাগ্রত হয়। ক্ষুধার্তকে অন্ন দানের কোমল মানসিকতা আমাদের মধ্যে গড়ে উঠে।

৯. তাহাজ্জুদ: নফল নামাযের মধ্যে সর্বোচ্চ ফজিলতপূর্ণ হচ্ছে, তাহাজ্জুদের নামায। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত এ নামায আদায় করতেন; উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা করে এ নামায আমাদের উপর ফরজ করা হয়নি। আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য এ নামাযের অপরিহার্য তা আমরা কম-বেশ সকলেই জানি। আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য গভীর রাতে এ নামাযে দণ্ডায়মান হয়ে যান অনেক মুত্তাকী মুসলমান। বেশির ভাগই ঘুম থেকে উঠতে পারি না। বিধায় এ নামায নিয়মিত আদায়ের সুযোগ হয়না। কিন্তু রমজান আমাদেরকে এ সুযোগ দিচ্ছে! আমরা যখন সাহরি গ্রহণের জন্য উঠি তখন কিন্তু চাইলেই ৪ রাকাত / ৮ রাকাত তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতে পারি। রমজানে অনেক রোজাদারই এ নামাযের ব্যাপারে সচেতন থাকেন, থেকেছেন। তাহাজ্জুদের প্রতি এই যে আকৃষ্টতা রমজান সৃষ্টি করে তা অবশ্যই রমজান-প্রদত্ত একটি বিশেষ উপহার হিসেবেই গ্রহণীয়।

১০.আল্লাহর জন্য ইবাদত: রোজার একটি প্রতিদান হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার সাথে রোজাদারদের মিলিত হওয়া। এবং এটাকেই রোজার সর্বোচ্চ প্রতিদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এ প্রতিদানের প্রতিলক্ষ্য রেখেই রোজাদারদের মধ্যে এক প্রকার আল্লাহর দিদার প্রাপ্তির আকাঙ্খা গড়ে উঠে। এ আকাঙ্খা রোজাদারদেরকে সর্বপ্রকার ইবাদতে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি, আল্লাহর দিদার প্রাপ্তির মানসিকতা তৈরি করে দেয়। এতে ফলটা হচ্ছে, আমরা সাধারণত জান্নাত পাওয়ার আকাঙ্খা নিয়ে যে ইবাদতে মগ্ন থাকি সে মগ্নটা কেটে যায় এবং নিঃস্বার্থ ইবাদতের প্রতি আমাদের মানসিকতা ঝুঁকে যায়।

যে দশটি বিষয় বিবরণসহ তুলে ধরা হলো তা কেবল তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন আমরা এ শিক্ষাগুলো বাকি ১১ মাসের চলাফেরায়, ইবাদত-বন্দেগীতে প্রয়োগ করবো। রমজান থেকে প্রাপ্ত এ দশটি শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আমাদের বাকি ১১ মাস জীবন-অতিবাহিত করতে হবে। আমরা যদি ভ্রুক্ষেপনা করি, আমরা যদি কর্মে বাস্তবায়ন না করি তাহলে কিন্তু রমজানের শিক্ষা থেকে আমরা লাভবান হতে পারবো না। রমজানকে পাওয়া তখনই আমাদের জীবনে সার্থক হবে যখন রমজানের শিক্ষায় আমাদের জীবন গড়ে উঠবে।