চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘রক্তচোষা’ থেকে ব্যাংক বাঁচান

রক্তচোষার কাজ রক্ত চুষে নেয়া। প্রাণের স্পন্দনকে নির্জীব করে দেয়ার পরই চোষা বন্ধ করে দেয় ভয়ানক এই প্রাণীটি। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে শেষ করে দিচ্ছে কিছু ঋণখেলাপি। তারা তো ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেই না, উল্টো সরকারের নানা রকমের প্রণোদনার সুযোগ নিয়ে নিজেদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

‘সুশাসন’ বলে একটি শব্দ আছে অভিধানে। ওটাকে ওই অভিধানের বাইরে আসার সুযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। কারণ এই শব্দটা বাইরে এলেই দেশের ব্যাংক খাতসহ যে সকল প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বেড়েই চলেছে সেগুলোর লাগাম টেনে ধরা যাবে। তাইতো সুবিধাবাদীরা ‘সুশাসন’ শব্দটাকে অভিধানের ভেতরেই শৃঙ্খলিত করে রাখতে বেশি তৎপর। খামোখা কি দরকার শব্দটাকে বাইরে এনে নিজেদের আখের গোছানোর অন্তরায় হিসেবে সুযোগ করে দেয়ার!

একটি গণমাধ্যমের সংবাদ চোখে পড়ল সম্প্রতি-গতিশীল ব্যাংক গতি হারানোর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে মাত্র ২০ গ্রাহক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৭ শতাংশই আটকে রেখেছেন শীর্ষ ২০ গ্রাহক। কোনো কোনো ব্যাংকের ৮১ ভাগ ঋণই নিয়েছেন শীর্ষ ঋণগ্রহীতারা। এই ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিতে পড়ার পেছনেও বড় ভূমিকা ওই শীর্ষ ২০ গ্রাহক।

প্রশ্ন হচ্ছে- ওই ২০ গ্রাহকের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? তারা কারা ? সরকারের খুব কাছের মানুষ নিশ্চয়ই তারা? সেজন্য নাম প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছে-নতুন বউ যেমন ভাসুরের নাম মুখে আনতে চায় না।

ওই সংবাদে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘গুটিকয়েক ব্যক্তির কাছে পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি।’ শীর্ষ ২০ গ্রাহক যদি ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন, তা হলে নতুন নতুন গ্রাহক ঋণ পাবেন। এতে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। সুদের হারও কমে আসবে।’ তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সুদহার কমছে না।

এক্ষেত্রে ব্যাংকে সুশাসনের কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলেছেন সুশাসন থাকলে প্রভাবশালীরা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হবে। টাকা মেরে দেয়ার কোনো পথও থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা বুঝি ব্যাংকই আমাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই ব্যাংকের ওপর যতো নির্যাতন চলছে। ঋণখেলাপিরা তো নিচ্ছেই সরকারও এখন রাজস্ব খাত থেকে প্রয়োজনীয় টাকা না পেয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে। অর্থাৎ সরকারকেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চলতে হচ্ছে। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দিতে হয় এই ঋণের টাকা দিয়ে।

এর অর্থ দাড়ায় এই যে, সামনে আমাদের অর্থনীতিতে বড় দুঃসংবাদ আসছে। দেখা যাবে ব্যাংকে গিয়ে টাকা পাবে না সাধারণ মানুষ। তাদেরই রক্ষিত টাকা তুলতে গিয়ে হোচট খাবে। কারণ ঋণ দেয়া হয়েছে অনুৎপাদনশীল খাতে। তাতে কোনো লাভ তো হচ্ছেই না। বরং যা দেয়া হয়েছে তাই তোলা মুশকিল। বলা যায় আম ছালা দুটোই খোয়াচ্ছে ব্যাংক।

আর সরকার যখন ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেটা অর্থনীতির ভাষায় খুবই হতাশাজনক।

ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে সরকার যতোটা নমনীয় হবে, ব্যাংক খাতের জন্য সেটা খুবই ক্ষতির কারণ হবে। আর সুশাসন নিয়ে যতো কথাই বলা হোক না কেন, ঘরের ভেতর থেকেই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সেটা এই সরকারের জন্যই আগামীতে কাল হয়ে দাঁড়াবে।

মানুষের ভেতর আস্থার জায়গা তৈরির জন্য সরকারকে ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তা না হলে একটা সময় আসবে মানুষ আর ব্যাংকে যাবে না। টাকা পয়সা ঘরেই রেখে দেবে। কারণ নিজের টাকা ব্যাংকে রেখে ভরসা পাবে না। তখন কি আর করবে?

ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে কঠোর হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন