চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যে কারণে করোনায় মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যায় ওঠানামা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দেড়শতম দিনেও মৃত্যু এবং আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা ওঠানামা করছে। জুন মাসে শনাক্ত ও মৃত্যু ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু জুলাই থেকে শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদে মানুষের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া, নাগরিক মনে ভীতি কমে যাওয়া এবং সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় আবারো সংক্রমণ বাড়তে পারে। আর তা হবে দেশে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ (দ্বিতীয় ঢেউ)।

বিজ্ঞাপন

গত মার্চে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু থেকেই পরীক্ষা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সংক্রমণ মোকাবিলায় বেশি বেশি পরীক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে।

বিজ্ঞাপন

দেশে করোনা সংক্রমণের দেড়শতম দিনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ হাজার ১২৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা করা হয়েছে ৭ হাজার ৭১২টি। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো ১২ লাখ ১ হাজার ২৫৬টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৪৪ হাজার ২০ জন। দেড়শতম দিনে আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন আরও ৫০ জন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩ হাজার ২৩৪-এ।

পাশ্বর্বতী দেশ ভারতে বর্তমানে করোনার সর্বোচ্চ অবস্থা বিরাজ করছে। সারাবিশ্বের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণে অবস্থান করছে তারা।

মৃত ও সংক্রমণের সংখ্যা ওঠানামার কারণ কী?
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘গত এক মাস যাবৎ সংক্রমণের সংখ্যা কমই, এমনকি মৃত্যুর হারটাও কম। তুলনামূলকভাবে আগে সুস্থতার হার কম ছিল যা কিনা বর্তমান সময়ে বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের হার আমাদের দেশে কম এবং সফলতার দিকেই মনে হচ্ছে আপাতত।’

দেশে জুন মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেশি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন: জুনে এক লাখ ৪৫ হাজার মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল, মারা গিয়েছিল এক হাজারের বেশি। আবার জুলাই মাসে সংক্রমণ কমে হয়েছে ৮৯ হাজার। মৃত্যুর হারটা কমেছে।

অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ

‘সব মিলিয়ে জুনের পর একই রকম যাচ্ছে, গত এক দু সপ্তাহ ধরে কমতেছে। সামনে চ্যালেঞ্জটা হলো কোরবানির ঈদে মানুষের গ্রামের বাড়ি যাওয়া আসা হলো। এখান থেকে সংক্রমণ বাড়তে পারে। আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানা। জেলা শহরগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি না মানলেও উপ-জেলা ও থানা পর্যায়ে মাস্ক ব্যবহার না করা সহ কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। তারা মনে করছে করোনার প্রকোপ কমে গেছে। তাছাড়া জনসাধারণের মনে ভয়ও কমে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

তবে ডা. এম এ আজিজের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলছেন, দেশে করোনার সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। এটা প্রলম্বিতই হচ্ছে।

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘মৃত্যের সংখ্যা মূলত একই ছিল, তবে আজকে (মঙ্গলবার) অনেকটা বেশি ছিল। গত কয়েকদিনে নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ায় সংক্রমণটা কম বোধ করছি। তবে সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। যেহেতু শনাক্ত কম করা গিয়েছে, টেস্ট কম হয়েছে সেজন্য আমাদের মনে হয়েছে সংক্রমণটা কম হয়েছে।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, বর্তমানে যে মৃত্যুহার সেটা এখনকার মৃত্যু না। অসুস্থ হলে কমপক্ষে ১০ দিন থাকে। কেউ কেউ ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত ভুগেছে, তারপর মৃত্যু। এ মৃত্যুগুলো হলো গত ৭ দিন আগে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের। এ সংক্রমণগুলো হয়েছে গত ঈদের আগে বাড়ি গিয়ে। সে সময়টাতে আমরা কোনো স্বাস্থ্যবিধি  মানিনি। সেই ফল এ মৃত্যু।

পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের আস্থাহীনতা
করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের আস্থাহীনতা লক্ষণীয়, আস্থা ফিরে পেতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থা ওপর জনসাধারণের আস্থাহীনতা বেড়েছে। তারা মনে করছে রিপোর্টটা ঠিক না ভুল এটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। নমুনা দেওয়ার সময় দুই তিন দিনের বিড়ম্বনা, রিপোর্ট পেতে দশ থেকে চৌদ্দ দিনের বিড়ম্বনা, পরীক্ষার জন্য দুই’শ টাকার ফি ধার্য, এরই মাঝে স্বাস্থ্য খাতে করোনা নমুনা পরীক্ষা নিয়ে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তাতে এর ফলাফল নিয়ে মানুষের গভীর সন্দেহ রয়েছে। যে কারণে মানুষ করোনার পরীক্ষা করাতে আগ্রহী না।

ডা. লেলিন চৌধুরী

করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন: ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হবে মানুষের এই অনাস্থার জায়গাটি পরিবর্তন করে আস্থার জায়গায় নিয়ে আসা। এজন্য যা করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে করোনা টেস্টের নির্ধারিত দুই’শ টাকার ফি তুলে দিতে হবে। নমুনা দেওয়ার সময় কোনো বিড়ম্বনা চলবে না গেলেই নমুনা দেওয়া যাবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট সরবরাহ করতে হবে। এছাড়া ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতে যে দুর্নীতিগুলো হয়েছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনলেই কিন্তু মানুষের মনে আস্থা ফিরে আসবে।’

দেশে করোনার সেকেন্ড ওয়েভের আশঙ্কা
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ওঠা নামার ধাপটাকে বলা হয় ওয়েভ। যেসব দেশ ভাইরাসটিকে ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যেও সংক্রমণ সেকেন্ড ওয়েভের (দ্বিতীয় ঢেউ) ফিরে আসা নিয়ে ভীতি রয়েছে।

শতবর্ষ আগে স্প্যানিশ ফ্লু-ও দ্বিতীয় দফায় ফিরে এসেছিল এবং তাতে প্রথম দফার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

দেশে করোনাভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভও কি অবশ্যম্ভাবী? জানতে চাইলে স্বাচিব মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ‘পাশের দেশ ভারতে যেভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তেছে সেটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। চীন, ভিয়েতনাম, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়ে গেছে। সে প্রেক্ষিতে আমাদের দেশেও সেকেন্ড ওয়েভের (দ্বিতীয় ঢেউ) সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।’

ডা. আজিজের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, কোরবানির ঈদের পর দেশে করোনাভাইরাস সেকেন্ড ওয়েভে (দ্বিতীয় ঢেউ) প্রবেশ করবে।