চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেন মৃত্যুই তাদের একমাত্র নিয়তি

মানব জাতির ইতিহাস, তার সমস্ত অর্জন-অগ্রগতিকে হুমকিতে ফেলে পৃথিবীর বুকে তাণ্ডবনৃত্য চালিয়ে হাজার হাজার প্রাণকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিচ্ছে করোনাভাইরাস। প্রতিষেধকহীন এই ভাইরাসকে ঠেকাতে বিশ্বের ধনী থেকে গরীব, সব রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা যখন প্রায় ব্যর্থ; তখন তা নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে এলো জনবিচ্ছিন্নকরণ বা ঘরে অবস্থান। এই পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগ করে ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ানসহ কিছু কিছু দেশ করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে নিজেদের জনগণকে অনেকটাই রক্ষা করতে পেরেছে।

তবে আমরা চলছি তার উল্টোপথে। কোথাও দেখা যাচ্ছে সরকারের উদ্যোগ আছে কিন্তু জনগণের সাড়া নেই। আবার জনগণের ঘরে থাকার ইচ্ছা আছে, আগ্রহ নেই তাদের নিয়ন্ত্রক বা চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের। এমনকি কথিত ত্রাণ বা সাহায্যের নামেও জনগণকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছে। হাটে-বাজারে হাজারো মানুষের ভাবনাহীন মুখগুলোই বলে দেয়, আসলে তারা করোনাভাইরাসের বিষয়টাকে এখনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

আর দিচ্ছে না বলেই তৈরি পোশাক শিল্পকারখানার মালিকরা বিবেকহীন একরোখা মনোভাব দেখিয়ে লাখো শ্রমিককে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে। যাদের কাছে শ্রমিকের জীবনের মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্যবান ঠিক সময়ে বিদেশি ক্রেতার চাহিদামত  পণ্য সরবরাহ করা। এসব মালিকদের কাছে দেশ বা দেশের সাধারণ মানুষ বড় নয়, বড় তাদের মুনাফা। সেই মুনাফা অর্জনে মানুষ বাঁচবে না মরবে; তা তার দেখার বিষয় নয়।

বিজ্ঞাপন

দেশের করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গত ২৩ মার্চ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। সেদিন করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় প্রথম দফায় হাসপাতালসহ অন্যান্য জরুরি সেবা ছাড়া ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যদিও পরে দ্বিতীয় দফায় তা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণ, মানুষকে তার ঘরে অবস্থান নিশ্চিত করা। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতে পরেরদিন থেকেই সারাদেশে মোতায়েন করা হয় সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের। কিন্তু ২৪ তারিখ যখন ঘোষণা দেওয়া হলো, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে, তখন লাখ লাখ মানুষ গ্রামে ফিরতে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। সেদিন দেখা গেল, বেশিরভাগ মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। গাদাগাদি, ঠেলাঠেলি করে যে, যেভাবে পারছে ছুটছে আর ছুটছে। করোনাভাইরাস বলে ছোঁয়াছে কোনো কিছু আছে- তা নিয়ে কোনো চিন্তা তাদের ছিল না।

বিজ্ঞাপন

একই রকম চিত্র আবার দেখা গেল ৪ এপ্রিল। সরকার ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মানুষকে ঘরে রাখার জন্য ছুটি বাড়ালেও সেদিকে আগ্রহ ছিল না তৈরি পোশাক মালিকদের। তাদের কারখানা খোলা থাকবে। তাই সব শ্রমিককে জানিয়ে দেয়া হলো, কেউ কাজে অনুপস্থিত থাকলে তার চাকরি থাকবে না। অগত্যা কি আর করা? দেশবাসী গণমাধ্যমের পর্দায়, পাতায় দেখতে পেলেন, ঢাকামুখী বিশাল এক জনস্রোতকে। চাকরি হারানোর ভয়ে, মাসের বেতন আটকে যাওয়ার শঙ্কা নিয়ে তারা ছুটছে; মাইলের পর মাইল। কোনো যানবাহন নেই, তাতে কি? পা-দুটো তো আছেই। সেই পায়ে কেউ কেউ শত মাইলও পাড়ি দিলেন।

পাটুরিয়া, গোয়ালন্দ, কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে শুধু মানুষ আর মানুষ। ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-কুমিল্লা কিংবা ঢাকা-আরিচা সব জায়গায় একই দৃশ্য। লাখো মানুষ পায়ে হেঁটে, বিকল্প যানবাহনে যেভাবে পারছে, ছুটছে ঢাকা আর গাজীপুরের পোশাক তৈরির কারখানায়। যেন দলে দলে তারা ছুটছে মৃত্যুপুরীতে। মৃত্যুই তাদের একমাত্র নিয়তি, একমাত্র লক্ষ্য!

এমন জনস্রোতকে মৃত্যুর মুখে হাঁটতে দেখে ক্ষয়ে যাওয়া বিবেকে কিছু মানুষ গর্জে উঠলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিছু গণমাধ্যমও সামিল হলো সেই গর্জনে। শেষ পর্যন্ত পিছু হটলেন গার্মেন্টস মালিকরা। তাদের সংগঠন থেকে রাতে অনুরোধ করে বলা হলো, মালিকরা যেন ১১ তারিখ পর্যন্ত কারাখানা বন্ধ রাখেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ নির্মম কষ্ট সয়ে, পায়ে ফোসকা ফেলে তাদের কর্মস্থল ঢাকা, গাজীপুর বা অন্য কোথায়ও পৌঁছে গেছে।

কিন্তু কেন এমন হলো? সরকার যেখানে সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করে ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা কেন শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করছেন? সারা পৃথিবী যখন প্রায় লকডাউনে তখন মালিকদের এতো উৎসাহের কারণ কি? তারা কি সরকারের চেয়েও বড়? সরকারের নির্দেশনারও ঊর্ধ্বে? সরকারের সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে তারা?

অথচ এই গার্মেন্টস মালিকদের কারণে রানাপ্লাজা ধসে হাজারো শ্রমিকের প্রাণ যায়। তাদের অবহেলায় তাজরীনের মতো বহু কারাখানার আগুনে পুড়ে ছাই হয় অসংখ্য শ্রমিকের শরীর। পোড়া ক্ষত নিয়ে জীবনভর নীরব কান্নায় ভাসে তাদের চোখ। সেই সিক্তচোখের জল মুছিয়ে দিতে আসে না কেউ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)