চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মে দিবস: সিনজিয়াং-এ তুলার ক্ষেতে জবরদস্তিমূলক শ্রম

সারাবিশ্বের মোট তুলার ২০% উৎপাদিত হয় চীনের সিনজিয়াং প্রদেশে। এ তুলার মানও ভালো। কিন্তু গোল বেঁধেছে অন্য জায়গায়। এই তুলা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় যেসব শ্রমিক নিয়োজিত তারা স্বেচ্ছায় কাজ করছেন না, জবরদস্তিমূলকভাবে তাদেরকে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, এরকম অভিযোগ উঠেছে। মহান মে দিবসে শ্রম-শোষণের এই ইস্যুটি নিয়ে কথা বলা যাক।

পশ্চিমা মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, সিনজিয়াং-এ গত ডিসেম্বরে পাঁচ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক তুলার ক্ষেতে কাজ করানো হচ্ছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা, বৃটেনসহ কয়েকটি দেশ এই ইস্যুতে চীনের বেশ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চীন উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে সেগুলো গণহত্যার সামিল। চীন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

‘সিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ চীনের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। মধ্য এশিয়ার পাশে। প্রায় সাড়ে ষোল লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল প্রদেশে মূলত উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষদের বাস। অন্যান্য আরো কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও সেখানে বাস করেন। অধিকাংশ মানুষ মুসলিম। গত শতকের মাঝামাঝি চীনের সাথে যুক্ত হওয়ার সময় এখানে পঁচাত্তর শতাংশের কাছাকাছি উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতো। পরবর্তীতে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় হান সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখানে এসে বাস করতে শুরু করলে মোট জনসংখ্যার শতাংশের হিসেবে উইঘুরদের পরিমাণ কমেছে। এখন এই প্রদেশে প্রায় এক কোটি বিশ লাখ উইঘুর মুসলিমের বাস।

১৯৯০-এর দশকে এখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সূচনা দেখা যায়। ২০০৯ সালে এক বছরেই প্রায় ২০০ মানুষ মারা যায় বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায়। তারপর চীন সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন করতে হার্ডলাইনে যায় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। চীনের এই হার্ডলাইন কার্যক্রমকে পাশ্চাত্যের সরকারগুলো ‘এথনিক জেনোসাইড’ বা ‘জাতিগত নিধন’ বলছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, পুলিশ সেখানে এমনকি একজন মানুষ কতবার বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরোলো সেটা মনিটর করার জন্য বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে। অন্যান্য গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম তো আছেই।

পাশ্চাত্যের সরকারগুলো, বিশেষত আমেরিকা, কানাডা, নেদারল্যান্ড ও ব্রিটেন বলছে, এখানে বড় বড় বন্দিশিবির তৈরি করে সেখানে উইঘুর সম্প্রদায়ের অন্তত দশ লাখ মানুষকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাটেজিক ইনিস্টিটিউট ২০২০ সালে এই প্রদেশে ৩৮০টি বন্দিশিবির ছিলো বলে জানিয়েছে। তারা জানাচ্ছে, এছাড়া ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে অন্তত ৮০,০০০ উইঘুর সম্প্রদায়ের লোককে বিভিন্ন প্রদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে।

সিনজিয়াং-এর বন্দিশিবিরে সংখ্যালঘু উইঘুর ও অন্যান্য নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকজনের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। নারীদেরকে নির্যাতন, ধর্ষণ ও জোর করে বন্ধ্যাকরণের মতো ঘটনাও ঘটছে এখানে। উইঘুর শিশুদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলার অভিযোগও তো হয়েছে।

বন্দীদেরকে দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেয়া হচ্ছে তুলার ক্ষেতে। অর্থাৎ এই সাদা তুলার ভেতরের গল্পটা বেশ কালো। এই প্রদেশে উৎপন্ন তুলা চীনের মোট তুলা উৎপাদনের ৮৫ শতাংশের মতো। বিবিসির এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, এইসব বন্দিশিবিরের সাথেই গড়ে উঠছে বড় বড় তুলার কল, কাপড়ের কল। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে জোরপূর্বক কাজ করানো হচ্ছে বন্দীদের।

চীন সরকার বলছে, এগুলো বন্দিশিবির না। বরং তাদের ভাষায় ‘রি-এডুকেশন সেন্টার’ সংশোধনাগার। অফিসিয়াল নাম, ’সিনজিয়াং ভোকেশনাল এডুকেশন এন্ড ট্রেনিং সেন্টার’। সেখানে মান্দারিন (চাইনিজ) ভাষা শেখানো হয়, চীনের কমিউনিস্ট রাজনৈতিক দর্শন শেখানো হয় এবং বৃ্ত্তিমূলক শিক্ষা দেয়া হয়। চীনের ভাষায়, ইসলামিক কট্টরপন্থা থেকে উইঘুরদের ফিরিয়ে আনা এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

চীন সরকার তাদের বিবৃতিতে বলেছে, সিনজিয়াং-এর তুলার ক্ষেতে যারা কাজ করছে তারা স্বেচ্ছায় কাজ নিয়েছে এবং তাদের সাথে কাজে নিয়োগের আইনগত চুক্তিও আছে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সরকার ও বিভিন্ন ফ্যাশন ব্রান্ড সেখানে জবরদস্তিমূলকভাবে কাজে নিয়োগের যে অভিযোগ করছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্যাশন ব্রান্ড এইচএন্ডএম সিনজিয়াং-এ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জোরপূর্বক শ্রমের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বছরখানেক আগে। এরকম একটি খবর মাসখানেক আগে বেরিয়ে আসে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির যুব সংগঠন এইচএন্ডএম-এর বিরুদ্ধে সেশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালায়। ঐ দিনই বড় বড় ই-কমার্স সাইট থেকে এইচএন্ডএম-এর পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। চীনের তারকারা এসব পণ্যের ’এনডোর্সমেন্ট’ থেকে সরে আসেন। এইচএন্ডএম-এর শোরূমগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এইচএন্ডএম-এর দোকানের সংখ্যার হিসেবে চীন তাদের চতুর্থ বৃহত্তম বাজার (আমেরিকা, জার্মানী ও বৃটেনের পরে)। প্রায় ছয়শো দোকান রয়েছে সেখানে।

সুতরাং চীন তাদের পণ্যের শুধু বড় উৎপাদক নয়; বড় বাজারও। তার সাথে পেরে ওঠা সহজ নয়। এই বার্তাই চীন সম্ভবত দিতে চেয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত বেইন এন্ড কোম্পানীর এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, গতবছর চীনের বিলাসপণ্যের বাজার ছিলো ৫২ বিলিয়ন ডলারের এবং বছরের পর বছর সেটা যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০২৫ সালে চীন হবে এককভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিলাসপণ্যের বাজার।

এখন চীনের ক্ষোভের শিকার হওয়া ব্রান্ডের তালিকায় নাইকিসহ অন্যান্য আরো কিছু ব্রান্ড যুক্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-জবরদস্তিমূলক শ্রমের এগারোটি সূচকের কথা বলেছে। তার মধ্যে কারো অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়া, চলাফেরায় বাধা দেয়া, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, ভয়ভীতি দেখানো, বেতন আটকে রাখা, কাউকে অন্যদের থেকে থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, অবমাননাকর থাকার ও কাজ করার পরিবেশ, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো ইত্যাদি বিষয়গুলো রয়েছে। এর যেকোন একটি সূচক উপস্থিত থাকলেই সেটাকে জবরদস্তিমূলক শ্রম হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছে আইএলও। সিনজিয়াং বিষয়ক অভিযোগগুলোতে এর অনেকগুলো সূচকের স্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

সিনজিয়াং-এর তুলার ক্ষেত ও কাপড়ের কলের শ্রমিকদের কাজের শর্ত ও কর্মপরিবেশ নিয়ে একদিকে চীন, অন্যদিকে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মধ্যে যত কথাবার্তা, ব্যবস্থা নেয়া- এসব যেরকমই চলুক, একবিংশ শতাব্দীতে এসে নব্য দাসপ্রথার মতো জবরদস্তিমূলক শ্রম গ্রহণযোগ্য নয় কোনোভাবেই। মে দিবসের মূল ভাবনার সাথে এটা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

(তথ্যসূত্র: সিএনবিসি/ হোয়াই বয়কটিং সিনজিয়াং কটন ইজ ইজিয়ার সেইড দ্যান ডান/ ১৬ এপ্রিল ২০২১; নিউইয়র্ক টাইমস/ হোয়াট ইজ গোয়িং অন উইথ চায়না, কটন এন্ড অল অফ দিজ ক্লথিং ব্রান্ডস/ ২এপ্রিল ২০২১; বিবিসি/ নিউ এভিডেন্স অফ উইঘুর ফোর্সড লেবার ইন চায়নাস কটন ইন্ডাস্ট্রি/ ১৫ ডিসেম্বর ২০২০; ভয়েস অফ আমেরিকা/ এইচএন্ডএম ভোজ টু রিগেইন কাস্টমার আফটার ব্যাকল্যাশ ওভার উইঘুর কমেন্টস / ৫ এপ্রিল ২০২১)

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন