চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মা সুপারি, ডিম বিক্রি করে বল কেনার টাকা দিতেন’

এগারো সন্তানের জননী হাওয়া খাতুন ক্রিকেট খেলা বুঝতেন না। তবে মা হিসেবে ঠিকই জানতেন সন্তানদের আগ্রহ কীসে। ছোট মেয়ে মুর্শিদা খাতুন হ্যাপি যে শৈশবেই ক্রিকেটে মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছেন, সেটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বেশ।

খেলার জন্য মুর্শিদার আকুতি ছুঁয়েছিল মায়ের হৃদয়। পরিবারের সবাই যখন খেলতে বাধা দিচ্ছিল, মা নীরবে যুগিয়েছেন উৎসাহ। গোপনে সুপারি, ডিম বিক্রি করে মেয়েকে দিতেন বল কেনার টাকা। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার থানাপাড়ার বাসা থেকে মুর্শিদা যখন মুঠোফোনে ছোটবেলার কথা বলছিলে, বারবারই উঠে আসছিল মমতাময়ী মায়ের প্রসঙ্গ।

বিজ্ঞাপন

এলাকার ছেলেদের সঙ্গে মুর্শিদা ক্রিকেট খেলা শুরু করেন যখন ক্লাস থ্রি’তে পড়েন। শিশুকালেই মা’কে বোঝাতেন, ‘দেখো একদিন বড় ক্রিকেটার হবো। আমাকে খেলার সুযোগ করে দাও।’ কথা রেখেছেন মুর্শিদা। বাংলাদেশ নারী দলের দক্ষ ওপেনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে।

বিজ্ঞাপন

বিকেএসপির গণ্ডি পেরনোর আগেই ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে জাতীয় দলের রঙিন জার্সি গায়ে জড়ান মুর্শিদা। এ বছর অস্ট্রেলিয়ায় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে ম্যাচে এ বাঁহাতি ব্যাটার দারুণভাবে মেলে ধরেন নিজেকে। পার্থের ২২ গজে খেলেন ৩০ রানের ঝকঝকে এক ইনিংস। ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিসবেনে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের পেছনে মুর্শিদার ছিল বড় অবদান। সেদিন খেলেছিলেন ৪৩ রানের অসাধারণ ইনিংস।

তার আগে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ভারত সফরেও খারাপ করেননি। গত বছর নেপালে সাউথ এশিয়ান গেমসে ভালো করেছেন টাইগ্রেস ওপেনার। দেশের হয়ে এপর্যন্ত খেলেছেন দশটি টি-টুয়েন্টি ও পাঁচ ওয়ানডে। ২০১৮ সালে জাতীয় দলের ক্যাম্পে তার আগমন জাতীয় ক্রিকেট লিগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়ে। কয়েকঘণ্টা পরই একুশে পা রাখতে যাওয়া মুর্শিদার স্বপ্ন, তামিম ইকবালের মতো অপরিহার্য ওপেনার হওয়া।

‘স্কুলে ছেলে হিসেবে খেলতাম’
টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ দেখা ছিল নেশা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের দেখে দেখেই শিখে ফেলেন ব্যাট ধরার কৌশল। ধীরে ধীরে খেলাটার প্রতি আকর্ষণ প্রবল হতে থাকে। ভাইদের সঙ্গে চলে যেতেন মাঠে। বল কুড়িয়ে দিতে দিতে ক্রিকেট মাঠের পরিবেশ, হৈ-হুল্লোড় ভালো লাগতে শুরু করে। নিজের মহল্লা ছাড়াও ম্যাচ দেখতে চলে যেতেন অন্য উপজেলা, জেলাতেও।

‘ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে ছিলাম। ছেলেদের সঙ্গে মিশতাম। ছোটবেলায় মেয়ে বন্ধু ছিল না। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলতাম। ক্রিকেটেই বেশি মনোযোগ ছিল। মামাতো ভাই ও বড় ভাই, ক্রিকেট বলে প্র্যাকটিস করত জেলা স্টেডিয়ামে। সেই বল দিয়ে খেলতে ইচ্ছে করত। কিন্তু এত ভারী বল! টিভিতে প্রচুর খেলা দেখতাম স্কুলে না গিয়ে। কীভাবে খেলাটা হয়, কোন ব্যাটসম্যান কীভাবে ব্যাট ধরে, সেটা ফলো করতাম। যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, এক স্কুলের সঙ্গে আরেক স্কুলের ম্যাচে ছেলে হিসেবেই খেলেছি। নিজের দলের সবাই বুঝলেও অন্য দলের কেউ সহজে বুঝতে পারত না। ছেলেদের মতোই চুল কাটা থাকত।’

মানুষের টিপ্পনীতে খুলে গেল বিকেএসপির দরজা
‘জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন আমার বড় ভাই কাজী কেরামত। তার সঙ্গে স্টেডিয়ামেও গিয়েছি ক্রিকেট শিখতে। ক্যাপ্টেনের বোন হিসেবে সবাই আমাকে আদর করত। রাজু ভাইয়ের অধীনে অনুশীলন করতাম। ব্যাটিং স্ট্যান্স দেখে সবাই প্রশংসা করত। বাবা একদমই পছন্দ করতেন না খেলাধুলা করি। কেননা এলাকার অনেকেই বাজে বাজে কমেন্ট করত, তখন কান্না করতাম।’

বিজ্ঞাপন

‘ভাইয়া বললেন খেলার প্রতি যেহেতু এত টান, এলাকায় মানুষের বাজে কথা শোনার চেয়ে বিকেএসপিতে ভর্তির চেষ্টা করা যেতে পারে। তখন প্রতিদিন দোয়া পড়তাম বিকেএসপিতে যেন সুযোগ হয়। স্বপ্নই ছিল ক্রিকেটার হবো। মাকে বলতাম, বিকেএসপিতে পরীক্ষার সুযোগ করে দাও, জীবনে আমার জন্য আরকিছু করা লাগবে না। এটাই শেষ চাওয়া। ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ঢাকায় আসলাম। বড় ভাই তখন এখানেই চাকরি করেন।’

‘কুষ্টিয়া ফিরে যাওয়ার পথে শুনি চান্স পেয়েছি’
বিকেএসপিতে ট্রায়ালে ৬টা বল দিয়েছিল। একটু এলোমেলো করে ফেলছিলাম। ছিলাম অপেক্ষমাণ তালিকায়। টিকে থাকা মূল ক্রিকেটারদের নিয়ে একমাসের ক্যাম্প হবে। ক্যাম্পের ১৫ দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও আমি ঢাকায়। যদি কোনো কারণে কল আসে, ব্যাট-বল সঙ্গে নিয়ে অপেক্ষা নিয়ে ঘুমাতাম।

যেদিন কুষ্টিয়া চলে যাবো, গাড়িতেও উঠে গেছি, সেদিনই কল আসল। ২০ দিনের মতো অপেক্ষা পর এমন খবর, কী যে আনন্দ লেগেছিল। কেউ একজন কিছুদিন পর ক্যাম্পে আর আসেনি। বিকল্প হিসেবে আমাকে ডেকেছিল। বিকেএসপিতে মাত্র ১৫ দিন অনুশীলন করেই পারফরম্যান্স বিবেচনায় ‘এ’ প্লাস ক্যাটাগরিতে ছিলাম।’

বিকেএসপির কঠিন দিন
‘ক্যাম্পে ভালো করলেও বিকেএসপিতে ভর্তির পর টের পেলাম কতটা কঠিন ক্রিকেটার হওয়া। দশ মিনিটি রানিং করে বমি হচ্ছিল, মাঝেমাঝেই কান্না করতাম। পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে হতো। সবমিলিয়ে কঠিন ছিল আমার জন্য। একটা সময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। যদি ভালো না করতে পারি, বের করে দেবে। প্রতিজ্ঞা করি যখন যেটা শেখানো হয় সেটাই রপ্ত করব। ৮-৯ নম্বর থেকে ধীরে ধীরে ওপেনার হয়ে যাই। মনে আছে বিকেএসপির হয়ে প্রথম প্রিমিয়ার লিগে পাঁচ ম্যাচেই রানআউট হয়েছিলাম। ব্যাটে-বল লাগলেই রান নিতে চাইতাম। ধীরে ধীরে গুছিয়ে নেই নিজেকে, বুঝতে পারি সবকিছু।’

‘ক্রিকেটার হতে হলে বিকেএসপি যেতে হবে এমনটাই শুধু জানতাম। জানা ছিল না বাংলাদেশে মেয়েদেরও জাতীয় দল আছে। বিকেএসপির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলতে নেমে জানতে পারি সালমা, রুমানা, জাহানারা আপুদের কথা।’

সৌম্যর সঙ্গে মিল!
মুর্শিদার শট খেলার ধরনের সঙ্গে সৌম্য সরকারের মিল খুঁজে পান অনেকেই। সতীর্থরা এ কথা সবসময়ই বলেন। তবে মুর্শিদা ছোটবেলা থেকেই অনুসরণ করে এসেছেন তামিম ইকবালকে। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বসে প্রিয় তারকার সঙ্গে কথাও হয়েছে তার।

সেটা নিয়ে বলছিলেন, ‘তামিম ভাইয়ের সঙ্গে যখন দেখা তখন আমার শরীর কাঁপছিল। মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিল না। আমি তার অনেক বড় ভক্ত। সে বাংলাদেশ দলে যেমন অপরিহার্য ওপেনার, আমিও তেমন হতে চাই। তার মতোই দেশের জন্য দীর্ঘদিন খেলতে চাই। সে পথে যেতে এখন অনুসরণ করি ভারতের স্মৃতি মান্ধানাকে।’

মায়ের অনুপ্রেরণা সঙ্গী সবসময়
যখন খেলে মাঠ থেকে আসতাম, বাবার বকা খাওয়ার ভয়ে মা পেছনের দরজা দিয়ে আমাকে ভাত খেতে দিতেন। ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে মা’র অবদান অনেক। এখনো যখন খেলি, মা অনুপ্রেরণা যোগায়। ক্রিকেট কিছুটা বোঝে। খারাপ খেললে বলে ‘প্রতিদিন কী ভালো হবে, মন খারাপ করোনা। সামনের খেলাতেই তুমি ভালো করবা।’ মনে তখন আর দুঃখ থাকে না। মনে হয় মায়ের জন্যই ভালো করে খেলি।