চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাথাব্যথা হলে মাথা কাটে কোন পাগলে?

মত প্রকাশ, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষকে বারবার জীবন দিতে হচ্ছে এটা যেনো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে। ভিন্নমতের বিরুদ্ধে খুনের ঘটনা অমানবিক বর্বরতার চরম বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে কি তা বন্ধ হবেনা? ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লেখালেখি করায় বুয়েটে নিজ ক্যাম্পাসের কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনে মৌলবাদী শক্তি প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ কর্মী আরিফ রায়হান দ্বীপকে। আর এই হত্যাকাণ্ডকে তারা সেদিন জিহাদ বলেছিল। এবারে হত্যা করা হল বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার আহাদ ফাহাদকে। ফাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সে ফেসবুকে আমাদের স্বাধীনতার মিত্র ভারতের সমালোচনা করেছিল। তাই ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। আর এই হত্যাকাণ্ড কি তবে স্বাধীনতার চেতনা?

আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় চকবাজার থানায় জিডি করেছে বুয়েট প্রশাসন। জিডিতে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। কেন তারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে হত্যা না বলে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বলল? এর জবাবে কি বলবে বুয়েট প্রশাসন? সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে এখন বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে নির্মমভাবে হত্যার খবর। যে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ চলে গেল অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে সেই ছাত্রলীগই এখন আবার আবরারকে হত্যা করল। কেন হত্যা করল?

বিজ্ঞাপন

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জামাত শিবিরের। অভিযোগ সত্য হলেও কি জামাত শিবির কর্মীকে এভাবে মেরে ফেলার অধিকার তাদের আছে? আর মিথ্যা হলে ছাত্রলীগ কেন তার গায়ে মিথ্যাচারের কালিমা লাগাল?অপকর্মের জন্য এইতো সেদিন শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পরিবর্তন করেছেন। যুবলীগের কয়েকজন নেতাও গ্রেপ্তার হল। অভিযানও চলছে। কই এতে কি শিক্ষা পাচ্ছে কেউ? মূল দল ক্ষমতায় গেলেই বেপরোয়া হয়ে উঠে ছাত্রসংগঠনের নেতারা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশকিছু নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছাত্রলীগের নাম।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ৩৯ জন। আর এই সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন।

২০০৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আসাদ ওরফে রাজীবকে হত্যা করে লাশ বহুতল ভবন থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে নিজ সংগঠনের কর্মীরাই মারধর করে বহুতল ভবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করে। ২০১০ সালে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবুবকর সিদ্দিক। একই বছর ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ।

২০১২ সালে ছাত্রলীগ নেতাদের চাপাতির কোপে প্রাণ হারান পুরান ঢাকার নিরীহ দর্জি বিশ্বজিৎ দাস। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কাজে ছাত্রলীগকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও বারবার তাঁদের ন্যায্য আন্দোলনে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে নেতাদের। সম্প্রতি ছাত্রদলের নেতাদের উপরেও হামলা চালালো তারা? ছাত্রলীগ কেন এমন বেপরোয়া হামলাকারী হয়ে উঠছে?

চ্যানেল আইয়ের চিফ নিউজ এডিটর জাহিদ নেওয়াজ খান খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তিনি লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে একসময় রোল কলের নিয়ম ছিল। তখন হলগুলো ছিল প্রভোস্ট-হাউস টিউটরদের নিয়ন্ত্রণে। সেই নিয়ন্ত্রণ পরে গ্রহণ করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, গত ১০ বছরে এককভাবে ছাত্রলীগ। ছাত্রনেতা নামধারী ওই মাস্তানদের কাছে প্রভোস্ট-হাউস টিউটররা শুধু আত্মসমর্পণই করেননি, তাদের সহযোগীও হয়েছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া মুহসীন হলের এক প্রভোস্ট তো তার বাসভবনকে ছাত্রদলের অস্ত্রভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। আগে-পরের অন্য অনেকে এ থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন না। এখন হয়তো অস্ত্রের ঝনঝনানি সেভাবে নেই। কিন্তু, ব্যক্তিত্বহীন হাউস টিউটর আর সরকারি দলের উপদেষ্টা প্রভোস্টরা হলগুলোকে সরকারি ছাত্র সংগঠনের টর্চার সেল হিসেবে গড়ে উঠতে দিয়েছেন। ক্লাসগুলোতে যেমন শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ থাকে, হলগুলোতেও সেরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মেরুদণ্ড হারানো শিক্ষক সমাজের ক’জনের সেই সক্ষমতা আছে? এখন প্রশ্ন হলো শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড কিভাবে হবে যদি শিক্ষকদেরই কোন মেরুদণ্ড না থাকে? শিক্ষকদের এই অক্ষমতা কেন?

বিজ্ঞাপন

কেন জামাত শিবির বলে নিজেরাও জামাত শিবির হয়ে গেল? হামলাকারীরাও নাকি অনুপ্রবেশকারী শিবির। তবে কি বাংলাদেশে আবার বিলোপবাদী রাজনীতি ফিরে এল? শত্রু সংগঠনে ঢুকে শত্রুকে ঘায়েল করাই হল বিলোপবাদের বৈশিষ্ট৷ তবে কি ছাত্রলীগেও এমনটিই চলছে? তবে কি তারা ছাত্রলীগের নেতা সেজেই ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্টের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল এতদিন? এতে হয়তো তারা সফলও হয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ নেবে বলছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে এ কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-বিষয়ক পরিচালক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ডঃ মিজানুর রহমান।

মঙ্গলবার বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের মাঝে হাজির হয়ে ছাত্রদের তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি বলেন, আমার জায়গা থেকে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাবো। আমি ভিসি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি, আমি ভিসিসহ আমাদের পরিসরে বসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে অনুরোধ করবো।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র শিবিরের কার্যক্রমগুলো আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যায়। ঝিমিয়ে পড়ে ছাত্রদলও। তবে কি শিবির, ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগে ঢুকে গেছে? শোনা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১২ এর পর থেকে ছাত্র শিবিরের কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করে চলছে। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রশিবিরের পরিচয় গোপন রেখে নতুন শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রলীগে যোগদান করানো হচ্ছে। এসব যোগদান কি বিলোপবাদের অংশবিশেষ নয়? আবরার হত্যা নিয়ে উত্তাল সারাদেশ। দেশব্যাপী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। কথা উঠছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। কিন্তু এমন কথা কেন? মাথাব্যথা হলে কেউ কি মাথা কাটে? না, মাথাব্যথার ওষুধ নেয়? তবে কি বিলোপবাদীরা এমনটিই চেয়েছিল? এখন হয়তো বুয়েট থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠছে হয়তো একসময় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই উঠবে। এমন আলামতই দেখা যাচ্ছে।

কেন ছাত্ররাজনীতিকে সুশৃঙ্খলভাবে চলতে দেয়া হচ্ছেনা? মূল দল ক্ষমতায় গেলে কেন তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে? নূরুল হক নূরকে ছাত্রলীগ পিটাতে পিটাতে ডাকসুর ভিপি বানিয়ে দিল। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত বিরক্ত হয়েই সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নূরকে জিতিয়ে দিল। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উত্তাল হয়ে উঠছে আবরার হত্যাকে ঘিরে। ছাত্রলীগ তবু থেমে নেই। আবরার হত্যা থেকে তারা কোন শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হলোনা। নিলে আবরার হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রদলের মিছিলে হামলা চালাতোনা। মত, দ্বিমত ও ভিন্নমত নিয়েইতো গণতন্ত্র। ভিন্নমত দমনের এই নোংরা কর্মকাণ্ডই কি আজ ছাত্র রাজনীত নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে তুললোনা? জামাত শিবির বলে আবরারের উপর হামলা চালাল জামাত শিবিরের মতই পৈশাচিক নির্মমতায়।

এক্ষেত্রে জামাত শিবির অধম হলে ছাত্রলীগ উত্তম হয় কী করে? নূরকেও তারা শিবির বলে গালি দিয়েছে। আবরারও কখনো শিবির করেনি। আর শিবির হলেই তাকে পেটাবে এই অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে?ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের এই উত্তাল দাবি ওঠার দায়ের দায়ী কি ছাত্রলীগ নয়? তারা কেন নিরীহ আবরারকে শিবির বলে নির্মমভাবে পিটিয়ে মানবতাকে লাঞ্ছিত করলো? আর ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হলে কি তা ছাত্রসমাজের জন্য ও দেশের জন্য ভাল হবে? ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের গণআন্দোলন কোথায় ছিলোনা ছাত্ররাজনীতি? শীঘ্রই শুভবুদ্ধির উদয় হোক সকলের। মাথাব্যথা হলে কোন পাগলেও কি মাথা কাটে? এটা ভাবতে হবে সকলকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View