চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মজনুরা ধর্ষক, তবে…

ধর্ষণের মত জঘন্য আর নিকৃষ্ট একটি অপরাধ একবারে নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজে। প্রায় সারা বছরজুড়েই চলে এই ধরণের নিকৃষ্ট অপরাধ আর সেই সঙ্গে কিছু প্রতিবাদ চলে। কিছু প্রতিবাদহীনতায় চাপা পড়ে। সম্প্রতি যে ধর্ষণটি আলোচিত সেটিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। দেশের সুশীল সমাজ ধর্ষকের চেহারা বা স্বাস্থ্য নিয়ে বিস্মিত হচ্ছেন সমালোচনা করছেন এমনকি অবিশ্বাসও।

এক্ষেত্রে কেউ রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে, কারো বিদ্যমান সমাজের রূঢ় বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতাসহ নানান উদ্দেশ্য ও বিষয় কাজ করছে। এই প্রথম দেখলাম ছবি দেখে ধর্ষক সম্পর্কে সন্দিহান হতে। অর্থাৎ ধর্ষকের শ্রেণীচরিত্র বিন্ন্যাসিত করা হয়েছে। এই অদ্ভুত কাণ্ডটি কেবল বঙ্গদেশেই সম্ভব। মজনুরা ধর্ষক তবে আপনাদের বিশ্বাস হবে না।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষকের কোনো শ্রেণি নেই। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে লক্ষ্য রাখলে দেখবেন দেশে হঠাৎ করে শিশু ধর্ষণ বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ জানায়: ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা, ঝিনাইদহ, জামালপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলায় ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৪৩৭২টি। অথচ এসব মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ৫ জনের। শিশু ধর্ষণের অংকটা মেলানোর দরকার নেই।

আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায় সমাজের গভীরে সৃষ্টি হয়েছে এক অবিনাশী ক্ষত। এই ক্ষতের মূলে রয়েছে পুঁজিরাজনীতির অপপ্রয়োগ আর তারই ফলবান বৃক্ষ মাদক। কুশিক্ষা, কুসংস্কার, স্থূল চিন্তার জীবন যাপন আমাদের সমাজের গভীরে শেকড় গেড়ে ছিল যা আজ ফলবান বৃক্ষরূপে ভয়ংকর একেকটা দানবে পরিণত হয়ে বের হয়ে আসছে।

ইয়াবা নামক একটি মাদক গোটাদেশের আনাচে কানাচে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন তারই খেইল দেখছি আমরা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সদ্য কৈশোরউত্তীর্ণ যুবক থেকে একবারে মধ্যবয়সীরাও এই গভীরতর নেশায় হারিয়েছে দ্বিগবিদ্বিগ জ্ঞান। কারণ এই মরণ নেশাটি একজন সুস্থ মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলে অতি দ্রুত। মূর্খ বাঙালকে আবার তার হারানো যৌনশক্তি ফিরিয়ে দেবে বলে খুব দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে এই মাদকটি। তারা সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তার বাইরে গিয়ে বিকৃত চিন্তা নিয়ে জীবনকে পরিচালিত করতে থাকে। এক ধরণের ফ্যান্টাসির জগতে বিচরণ করে তারা।

এর সঙ্গে আরও দুটি অপঅনুসঙ্গ যোগ হয়েছে। একটি প্রযুক্তিকেন্দ্রিক অসুস্থ সংস্কৃতির ফ্যান্টাসির জগৎ মাথায় নিয়ে ঘোরা আরেকটি বিভিন্ন আয়ুর্বেদ বা ভেষজ ওষুধ। যা কিনা মাদকের মতই যৌবনশক্তি বাড়ানোর প্রচারে বাজারজাত করা হয়ে থাকে মিথ্যা কল্পনার গল্প ফেঁদে। এটাও দেদারছে গিলছে যুব সমাজ।

একটি আত্মবিশ্বাসহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের নিচে একপেশে যাপনে অভ্যস্ত মানুষ এখন এইসবে নিজের তথাকথিত মুক্তি খুঁজছে। বিনোদন বা আনন্দ খুঁজছে। সমাজের একেবারে উচু থেকে নিচু পর্যন্ত সকলে। এই নেশায় উম্মত্ত হয়ে উঠেছে। ফলে মজনুর চেহারা নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। বিত্তশালী বখাটে যুবক থেকে একবারে খেটে খাওয়া দিনমজুরের কাছে বিনোদন হিসেবে এই নেশার চলছে প্রবল প্রতাপ। তারা নিজেরা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে নিজেদের কাছে। ঘটছে এইসব ন্যাক্কারজনক ঘটনা। বিনোদনের আকালে কল্পময় জগতই তাদের সেরা আনন্দ।

আপনাদের একটি বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করে লেখাটি শেষ করবো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মধ্যবয়সী অধ্যাপিকা। খুব সকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম সেন্টারের উদ্দেশে রওনা করেছেন একটি সিএনজি চালিত অটোতে। তিনি টকশোতে কি বলবেন সেটা পড়ছিলেন মনোযোগ দিয়ে। হঠাৎ সিএনজিটি থেমে গেলে ষোলশহরের এক নির্জন রাস্তায়। চালকের বক্তব্য সিএনজি একটু সমস্যা করছে। ঠিক করা যাবে। যাত্রীকে বসে থাকতে বলে চালক পেছনের সিটের দিকে এটা ওটা হাতায় কিন্তু কিছুই বের করে না। ভদ্রমহিলার গায়ের ওপর দিয়ে এদিক ওদিক কি যেনো খোঁজে। হঠাৎ ভদ্রমহিলা তার হাতের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে নেমে গেলেন এবং বললেন আপনি ঠিক করেন আমি দাঁড়াই। চালক খুব অনুনয় বিনয় করছে সিটে বসে থাকতে এবং এই এক্ষুণি ঠিক হয়ে যাবে এইসব বলছে। ভদ্রমহিলার সামান্যতম সন্দেহ হয়নি চালক তাকে যে আসলে ধর্ষণ করার কৌশল তৈরি করছে। একটা চাকার কাছে গিয়ে খুটুর খাটর করে চালক ভদ্রমহিলাকে বললো, মেডাম ওঠেন। তখন ভদ্রমহিলা খেয়াল করলেন অটোটির কিছু হয়নি এবং এতক্ষণ চালক কোনো কাজ করেনি। তিনি বললেন, আপনি ঠিক মত দেখেন আর কোনো সমস্যা আছে কিনা। বলেই ভদ্রমহিলা গুটিগুটি পায়ে অদূরে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো এক মা ও মেয়ের দিকে চলে গেলেন। ঐ দুজনকে বিষয়টা বলতেই তারা জানালেন আপনি ভয়ংকর বিপদ থেকে বেঁচে গেলেন। এরা নেশাসক্ত এবং যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারত। ওরা এই সময়টা বেছে নেয়। এবং সারারাতও চালায়। আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন। এবার ভদ্রমহিলা তাদের সঙ্গে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন কিন্তু এরই মধ্যে দেখলেন একটি ভয়াবহ অশ্লীল দৃশ্য। তার জীবনের সবচেয়ে নোংরা দুঃস্বপ্ন। সেই সিএনজি চালক ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে প্যান্ট খুলেই মাস্টারবেশন করছে।

তিনি বহুদিন সে দৃশ্য ভুলতে পারেননি। এই হলো গোটা দেশের এক টুকরো খণ্ড চিত্র। ফলত যারা মনে করেন ধর্ষক মানে হবে সিলভেস্টার স্ট্যালোনের মত নায়ক তারা দেশটাই পড়তে পারছেন না। অনেকানেক গভীরে বাংলাদেশের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে যা সারাতে রীতিমত একটি সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন। কোনো টোটকাতে এই ক্ষত শুকাবে না। মাদকের করাল থাবা দিনকে দিন মাত্রাহীন বেড়ে চলেছে। এই মাদক সামজিক অবক্ষয়ের অন্যতম ধর্ষণের মূল কারণ। আর অনেকে পড়তে পারছেন দেশকে। বুঝতে পারছেন সমস্যা কোথায়। কোন জায়গায় আঘাত করলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু ছাত্রলীগ বা যু্বলীগ হলে আনন্দ পেতেন। তারা ধর্ষণ বা ধর্ষকের শ্রেণীবিন্যাস করে ফেলেছেন। রাজনীতিও এত বিষাক্ত নোংরা এই জনপদে। সুতরাং মুক্তির পথ সুদূর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন