চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সি আর ‘গুডলাক’ দালালের খোঁজে পুলিশ

সাগরপথে মানব পাচারে যুক্ত নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের চক্র শনাক্ত: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সাগরপথে মানব পাচার রোধে ইতোমধ্যে সিলেট বিভাগীয় শহরের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন: সাগরপথে মানব পাচার রোধে ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালদের খোঁজে তদন্তে নেমেছে পুলিশ, খুব দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

গত ৯ মে ভূমধ্যসাগরে এক নৌকা ডুবিতে নিহত প্রায় ৬০ জন অভিবাসীর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশী নাগরিক। লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার সাগরে ডুবে ৬ জন সিলেটের বাসিন্দা মারা যান।

নিহতরা হলেন- ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালপুর এলাকার মুয়িদপুর গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে আবদুল আজিজ (২৫), একই গ্রামের মন্টু মিয়ার ছেলে আহমদ (২৪), সিরাজ মিয়ার ছেলে লিটন (২৪), একই উপজেলার দীনপুর গ্রামের আফজাল মাহমুদ (২৫), গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ গ্রামের কামরান আহমদ (২৮) ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল গ্রামের হাফিজ শামীম আহমদ (২৮)।

বুধবার নিজ দপ্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন: তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে নিহত ১৫০ জনের মধ্যে ১৩০ জন বাংলাদেশী। ১৪ জন জীবিত উদ্ধার আর নিখোঁজ ৩৯ জনের ২২ জনই সিলেটের।

তিনি বলেন: মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের একটি চক্র ও মাদারীপুরের দু’জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর সিলেট থেকে যারা গেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা বেশ কিছু দালালকে চিহ্নিত করেছেন।

নিহতদের পরিবারের সদস্যরাই জানিয়েছেন: ট্রাভেল এজেন্সির মোটা অংকের টাকার চুক্তিতে ঝুঁকি নিয়ে ইতালির পথে রওনা দেন তারা।

জানা যায়, ট্রাভেল এজেন্সি চালু করতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এমন নিবন্ধন আছে সিলেটের প্রায় দুইশ’ প্রতিষ্ঠানের। তবে নিবন্ধন ছাড়াই আরও পাঁচশ’ ট্রাভেল এজেন্সি আছে সিলেটে। অবৈধভাবে দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো।

২০১৮ সালে সিলেট নগরে এমন ৭৪টি অবৈধ এজেন্সির তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)। তবে এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চ্যানেল আই অনলাইনের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পর্যটন) মো. হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একই মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (পর্যটন-১) অঞ্জনা খান মজলিশ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ভূমধ্যসাগরে আহমেদ বিলালের চোখের সামনেই একে একে ডুবে যাচ্ছিল অনেক সহযাত্রী

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, ভুক্তভুগী কয়েকজনের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর জন্য ৮ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন রাজা ম্যানশনের ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামক এজেন্সির মালিক এনামুল হক। দুর্ঘটনার পর থেকে সে পলাতক আছে। এছাড়াও বিয়ানীবাজার উপজেলার দালাল বদরুল ইসলাম ভুক্তভোগী একজনের কাছ থেকে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন। সিলেটের আহমেদ বিলাল উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপের পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন দালালদের মাধ্যমে।

পারিবারিক জমি বিক্রি করে তিনি দালালের হাতে এজন্যে তুলে দেন সাত হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমান অর্থ। এই দালালকে তিনি চেনেন ‘গুডলাক’ ছদ্মনামে। বিলালের ভাষ্য ‘এই দালাল আমাকে বলেছিল, আমরা বেশ ভালো জীবনযাপন করতে পারবো। আমরা তাকে বিশ্বাস করেছিলাম’।

বুধবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আগামী সপ্তাহে সিলেটে আমাদের একটি চৌকষ তদন্ত টিম যাবে। তারা বিষয় নিয়ে তদন্ত করবে।

তবে ‘গুডলাক’ নামক দালালদের ধরতে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে র‌্যাব।

সিলেটের র‌্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: দালালদের ধরতে ইতোমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না, খুব দ্রুত তাদের আইনের আওতায় এনে মুখোশ উন্মোচন করা হবে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচটি টিম গঠন করে অবৈধ ট্রাভেলস এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন: বৈদিশক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী প্রতি মাসেই অবৈধ ট্রাভেলস এজেন্সি ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। এইমাসে একটি দুর্ঘটনার জন্য আরও গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।

তিউনিসিয়ায় জারযিজে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে সাগর থেকে উদ্ধারকৃত কয়েকজন, অধিকাংশই বাংলাদেশী

ভূমধ্যসাগরে সিলেটের বাসিন্দাদের এমন করুণ পরিণতির পর যেন প্রশাসনের টনক নড়েছে। রীতিমতো তারা অবৈধ ট্রাভেলস এজেন্সিগুলোতে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল আলম বলেন: মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত অবৈধ ও অনুমোদনহীন এজেন্সিতে অভিযান শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত অভিযানে বৈধ কাগজপত্র না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩২টি ট্রাভেল এজেন্সিকে পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার জরিমানা করা হয়েছে এবং ৮জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

Bellow Post-Green View