চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভারতবর্ষে কমিউনিস্টদের শতবর্ষ

একশো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টি তার প্রথম শতকে ভারতবর্ষে রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। দল ভাগ না হলে, সেই ভূমিকা যে আরো দীপ্তমান হতো, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে জাতীয় আন্দোলনের একটা বিশেষ পর্বে, গত শতকের চারের দশকে কমিউনিস্টেরা যে ভূমিকা পালন করেছিল, সেটি ব্রিটিশকে ভারত থেকে পাততাড়ি গোটানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি সিদ্ধান্তে আসতে সাহায্য করেছিল।

সাংবাদিক লেনার্ড মসলের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি লাস্ট ডেজ অব দি ব্রিটিশরাজ’ এ খুব স্পষ্ট ভাবেই বলা আছে: ব্রিটেনের শ্রমিক দলের সরকারের সংশ্লিষ্ট সময়কালে এই ধারণাই তৈরি হয়েছিল যে, ভারতকে যদি দ্রুত স্বাধীনতা দেওয়া না হয়, তাহলে কংগ্রেস দলে খুব তাড়াতাড়ি ভাঙন ধরবে ,আর কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের জায়গাটা অধিকার করে নেবে।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী জনতার ভিতর অধিকার বোধ প্রতিষ্ঠার কাজে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মনিয়োগ স্বাধীন ভারতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে জোরদারভাবে প্রভাবিত করেছিল। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যেভাবে তাঁদের রাজনৈতিক বোধকে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী জনতার স্বার্থে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার ধারা ভারতের রাজনীতিকে একটা বিশেষ ইতিবাচক বোধের দিকে প্রবাহিত করেছিল। পণ্ডিত নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিশেবে যে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় ভারতের অর্থনীতিকে স্থাপিত করেছিলেন, সেই কাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের জাতীয় রাজনীতিতে সেই সময়কালের অবস্থান নেহরুকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নির্ভর যে ভারতের অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করেছিলেন জওহরলাল নেহরু, সেই গোটা কাজটি নিয়ে করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাবধারার দ্বারা পরিচালিত হয়ে। এই ভাবধারা নেহরুর ভিতরে উন্মীলনের ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্টরা বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। জাতীয় আন্দোলন চলাকালীন সুভাষচন্দ্র বসু, জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে প্রথম ভারতে এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ধারণা দিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে এই ধারণার স্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক সতীর্থ হিসেবে যেসব কমিউনিস্টরা কর্মরত ছিলেন, তাঁদের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

স্বাধীন ভারতের জোট নিরপেক্ষ বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কমিউনিস্টদের দৃঢ় অবস্থান নেহরুকে অনেকখানি সাহায্য করেছিল। প্রত্যক্ষভাবে এই কাজে কমিউনিস্টদের নৈতিক সমর্থন পাওয়ার ফলে কোনো অবস্থাতেই সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের গহ্বরে আত্মসমর্পণ করতে হয়নি নেহরুকে। শ্রেণী অবস্থানের প্রশ্নে নেহরুর সঙ্গে কমিউনিস্টদের সঙ্গে তীব্র বিরোধ থাকলেও, দেশ গঠনের প্রশ্নে, কমিউনিস্টরা ভারতে কখনো যে অন্ধ বিরোধিতা করে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেনি, ভারতের নেহরু ঘরানার বিদেশ নীতির প্রশ্নে একথা খুব জোর দিয়েই বলা যায়। এই বিদেশ নীতির ধারাবাহিকতা ভারত এখন অনুসরণ করে না। ভারত সরকারের উপমহাদেশের অন্যান্য দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের পক্ষে বিদেশ নীতিকে পরিচালনার যে আঙ্গিক ছিল, সেই আঙ্গিক থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের দ্বারা পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার এতো শক্তি এবং স্পর্ধা অর্জন করতে পেরেছে গত প্রায় এক দশক ধরে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিউনিস্টদের শক্তি হ্রাসের ফলে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। সর্বাত্মকভাবে বাংলাদেশের মানুষ যাতে পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে পারে, সে বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে সক্রিয় হয়েছিল। এই কার্যক্রমে উপনীত হতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে কমিউনিস্টরা সর্বতোভাবে রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়েছিল। সেই সময়কালে কমিউনিস্ট পার্টি র ভিতরে ভাঙন এলেও, মতাদর্শগত যথেষ্ট ফারাক থাকলেও, মানুষের অধিকার এবং দেশের মর্যাদা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কমিউনিস্টদের যথার্থ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ত্রুটি ছিল না।

‘৪৭ এর দেশভাগের পর্যায়ে হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতির প্রশ্নে সবথেকে সক্রিয় থেকেছে ভারতে কমিউনিস্টরাই। তেভাগা আন্দোলনের যে উত্তাপ কমিউনিস্টদের মাধ্যমে গোটা বাংলায় (দুই বাংলাতেই) সঞ্চারিত হয়েছিল, সেই উত্তাপ ই কিন্তু ছেচল্লিশের দাঙ্গাকে বাংলার গ্রামে গঞ্জে, সদরে মফস্বলে ছড়িয়ে পড়তে দেয়নি। সামাজিক ক্ষেত্রে গত শতকের তিন, চারের দশকে কমিউনিস্টরা যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল, তা জাতীয় আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ভারতে এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রবহমান রাজনীতির ধারা উপধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। সেবাব্রতের ভিতর দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রাজনীতির মাত্রাকে একটা ভিন্ন উপায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কমিউনিস্টরা তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময়ে।

বিজ্ঞাপন

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি এই ধরণের সামাজিক সঙ্কটে ত্রাণের কাজ করেন। কিন্তু ত্রাণের বাইরে আর্ত মানুষের জীবন জীবিকার সংগ্রামে তাঁদের বলীয়ান করবার ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলি কোনো ভূমিকা পালন করে না। একজন আর্ত মানুষের মানসিক চিকিৎসার দিকটি এই ধরনের ধর্মীয় সেবামূলক সংগঠনগুলি আদৌ গুরুত্ব দেয় না। আর্ত মানুষকে যে মানসিকভাবে বলীয়ান করে তাঁকে আবার জীবনসংগ্রামে ফিরিয়ে আনতে হবে, প্রত্যক্ষ রাজনীতির অঙ্গনকে সবল করতে, এই ধারাটি ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন কমিউনিস্টরাই। সেবা বিষয়টি যে আধ্যাত্মিকতার মোড়কে মোড়ানো কোনো দয়ার দান নয়, মানুষ তাঁর নিজের অধিকারেই তাঁর প্রাপ্যটুকুর কিছুটা পাচ্ছে- ভারতের মানুষদের কাছে এই বোধটা সঠিক ভাবে প্রথম পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্বটাই কমিউনিস্টদের। দিন বদলের স্বপ্ন যে সমাজবাস্তবতাকে বাদ দেওয়া কোনো অতিকাল্পনিক দুনিয়ার খোয়াব নয়, নিজেদের কর্মবৃত্তের ভিতর দিয়ে কমিউনিস্টরাই সেটা প্রথম ভারতের মানুষদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। আর সেই ধারণাই শোষিত বঞ্চিত মানুষদের কাছে কমিউনিস্টদের আপনার মানুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্টরা ভারতে যতো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে, তার নিরিখে চার, পাঁচের দশকে তাঁদের যে সামাজের ভিতরে সর্বক্ষেত্রে শিকড় বিস্তারের প্রবণতা এবং তা থেকে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন– এই ধারাটি বজায় থেকেছে কি না, তা একটা জোরদার রাজনৈতিক বিতর্ক। কমিউনিস্টদের যেমন কাজ নয় রামকৃষ্ণ মিশন বা খ্রিস্টান মিশনারীদের মতো কেবলমাত্র বন্যা বা খরা জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে খিচুরি বিলি করা। তেমনই প্রতিবেশী না খেয়ে আছে, চিকিৎসা পাচ্ছে না, নারী শিকার হচ্ছে গার্হস্থ্য হিংসার দ্বারা– এইসব দেখেও কেবল বিপ্লব এলে এ ধরণের কোনো সমস্যা থাকবে না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাও সমাজের বুকে কমিউনিস্টদের কাজ নয়। শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি- সমাজের প্রতিটি স্তরেই মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ আছে– এটা বুঝেছিলেন প্রথম যুগের কমিউনিস্ট নেতারা। তাই তেতাল্লিশের মন্বন্তরে যেমন নারী আত্মরক্ষা সমিতির মাধ্যমে তাঁরা লঙ্গরখানা চালিয়েছেন, তেমনই ছেচল্লিশের দাঙ্গায়, দাঙ্গাক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে গণনাট্য, আই পি টি এ এর মতো সংস্থাকে তারা পথে নামিয়েছেন। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ফ্যাসিবাদ যখন মানবতার সবথেকে বড় শত্রু হিসেবে উঠে এসেছে, তখন কেবল শ্রেণীচিন্তাকেই একমাত্র প্রাধান্য না দিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিপরীত শ্রেণী অবস্থানের মানুষকে মাথায় রেখে, তার সঙ্গে একত্রে কাজ করে গেছেন জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কলিম শরাফি, গোপাল হালদার, বিষ্ণু দে, গোলাম কুদ্দুসেরা।

কৃষকের ফসলের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে তেভাগার লড়াইকে একটা সাংস্কৃতিক দ্যোতনায় প্রতিষ্ঠিত করে শ্রমিক, কৃষকের ভিতরে যে সংস্কৃতির সুপ্ত ধারা প্রবাহ রয়েছে, সেই প্রবাহমানতাকে শহুরে কেতাবদারির সঙ্গে যুক্ত করে গোটা বিষয়টাকে একটা পরিপূর্ণতা দেওয়া, যে চিন্তা রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের শেষ পর্যায়ে ‘ রক্তকরবী’ নাটকের ভিতর দিয়ে করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সেই চিন্তার, ভাবধারার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন বামপন্থীরা। সেই নতুন সৃষ্টির ধারার ধারাবাহিকতা তারা ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর ‘হোম ৮৬’ আর ‘সামান্তা ফক্সে’র উদ্দামতার ভিতর দিয়ে কতোখানি সুষ্ঠুভাবে বয়ে নিয়ে চলতে পেরেছে– সেটা অবশ্য বিতর্কিত প্রশ্ন!

সংসদীয় গণতন্ত্রের আবর্তে ভারতে কমিউনিস্টরা তাদের চিন্তাচেতনার মৌলিক ধারাগুলো অপরিবর্তিত রাখতে পেরেছেন কি না, এটিও একটি বিশেষ রকমের বিতর্কিত প্রশ্ন। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী জনতার বাইরে মধ্যবিত্তের ক্ষমতালোভী অংশের দ্বারাই কমিউনিস্টদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ভারতে বিশেষভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটাও একটা বিতর্কিত প্রশ্ন। জ্যোতি বসুদের প্রজন্ম শহুরে মধ্যবিত্ত হয়েও কমিউনিস্টের যাপন চিত্রকে যেভাবে আত্মস্থ করেছিলেন, বর্তমান প্রজন্মে মানিক সরকার ,মহঃ সেলিমের মতো হাতে গোটা দু চারজন কমিউনিস্ট ছাড়া সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতাদের ভিতরে দেখতে পাওয়া যায় কি না– সেটাও একটা বড় রকমের বিতর্কিত জিজ্ঞাসা। অতীতের মূল্যবোধ বজায় রেখে আধুনিক চিন্তার প্রতি প্রত্যয়ী থাকার যে দীপ্ত প্রকাশভঙ্গি মহঃ সেলিমের ভিতরে আছে, তা সহজেই আমাদের মনে করিয়ে দেয় ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ, এ কে গোপালন, জ্যোতি বসু, মুজফফর আহমদদের। বাস্তবকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনোরকম মৌলবাদী চেতনার দ্বারা অনুভব না করে, সেই বাস্তবকে ফলিত রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছিলেন বলেই জাতীয় স্তরে সর্বজনমান্য নেতৃত্বের মর্যাদা পেয়েছিলেন জ্যোতি বসু।

বিদেশ নীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা শত্রুর সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রশ্ন যথার্থ লড়াই, আত্মপ্রচারকে এতোটুকু গুরুত্ব না দিয়ে আদর্শের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপের ভিতর দিয়ে বাস্তবকে অনুশীলনে জ্যোতি বসু, ই এম এস, এ কে গোপালন, হরকিষাণ সিং সুরজিত প্রমুখের মতো মেধাসম্পন্ন কমিউনিস্ট নেতা হলেন সেলিম। একদিন যেমন ভারতের কমিউনিস্টরা জ্যোতি বসু, ই এম এসের মতো ব্যক্তিত্বদের মেধাকে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করে যথেষ্ট রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিলেন, আজকের প্রজন্মের ভারতীয় কমিউনিস্টরা সেলিমের মতো ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক মেধাকে অতীতের অভিজ্ঞতার নিরিখে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগিয়ে ভারতের রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের গুরত্ব এবং মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয় কিনা, এখন সেটাই দেখার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)