চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ব্রিটেনের রাজনীতি: এর পরে কী?

অনেকটা নাটকীয়ভাবেই ব্রিটেনের রানীর সমর্থন নিয়ে বুধবার পার্লামেন্ট স্থগিত করার ঘোষণা দেন নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া অর্থাৎ ব্রেক্সিট কার্যকরের তারিখ ৩১ অক্টোবর, যার আর মাত্র নয় সপ্তাহের মতো বাকি। এর আগে টানা পাঁচ সপ্তাহ বন্ধ থাকতে যাচ্ছে পার্লামেন্ট।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর যখন ১৪ অক্টোবর পার্লামেন্ট খুলবে, তখন ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করতে ব্রিটিশ এমপিরা সময় পাবেন মাত্র ১৭ দিন!

যুক্তি-পাল্টা যুক্তি
এর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে জনসন জানিয়েছেন, নতুন উদ্যমে নতুন কর্মসূচি নিয়ে নতুন অধিবেশন শুরু করতে চান তিনি। তাই স্বাভাবিক তিন সপ্তাহের শরৎকালীন অবকাশের বদলে আগেভাগেই ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থগিত হয়ে যাবে চলতি পার্লামেন্ট অধিবেশন।

যারা চান যুক্তরাজ্য ইইউতেই থাকুক তারা এই সিদ্ধান্তকে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এমনকি এই পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন ব্রেক্সিটের পক্ষে থাকা অনেকেও। তারা মনে করছেন, এত অল্প সময়ে চুক্তি ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের বিষয়টি ঠেকানো এমপিদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্রেক্সিট কার্যকরের প্রথম তারিখ ছিল ২৯ মার্চ। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পরপর তিনবার খসড়া ব্রেক্সিট চুক্তি নাকচ করে দেয়ার পর সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

প্রথম থেকেই ইইউ ত্যাগের পক্ষের একজন ছিলেন বরিস জনসন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, মরে-বেঁচে যে করেই হোক, চুক্তিসহ বা চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া তিনি সম্পূর্ণ করবেনই।

ব্রেক্সিট-ব্রিটেনের রাজনীতি
বরিস জনসন

কিন্তু বিরোধী দলীয় অধিকাংশ এবং ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টির অনেক এমপিই চুক্তি ছাড়া ইইউ ছাড়তে নারাজ। তাদের আশঙ্কা, এমনটা হলে ব্রিটিশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই তারা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের সুযোগ বাতিল করতে আইন পাস করার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি এটা সম্ভব না হলে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ডাকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন এই এমপিরা।

পার্লামেন্ট এভাবে স্থগিত করা কি বৈধ?
সাধারণত একটি চলমান অধিবেশন শেষ হওয়ার পর পার্লামেন্ট স্থগিত করার নিয়ম। এভাবে হঠাৎ করে স্থগিত করে দেয়াটা অস্বাভাবিক, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু বরিস জনসনের সিদ্ধান্তটি আইনত বৈধ।

জনসনের এই সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হবে, কেননা সরকার কার্যত কোনো আইন লঙ্ঘন করেনি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে। সরকার শুধু পার্লামেন্টের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

এর জবাবে এমপিদের হয় স্থগিতাদেশটি মেনে নিতে হবে, অথবা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ডেকে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে হবে।

রানীর ভূমিকা কী?
ব্রিটেনের রানীর অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে অভিমত দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা বেশ সীমিত। নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্ট স্থগিত করার জন্য সরকারকে রানীর অনুমতি নিতে হয়।

কিন্তু বাস্তবে এটা শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা। রানী কখনোই এতে অসম্মতি জানান না, তিনি সবসময় রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। এবারও দূরেই থেকেছেন সম্মতি দিয়ে। যদি তিনি অসম্মতি জানাতেন সেটি বরং হতো নজিরবিহীন ঘটনা।

ব্রেক্সিট-ব্রিটেনের রাজনীতি
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ

এরপর কী হবে?
স্বাভাবিক নিয়মে ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তার কাজে ফিরে যাবে। কিন্তু তারপর থেকে শুরু হবে অবকাশ। প্রধানমন্ত্রী জনসনের পরিকল্পনা ঠিক থাকলে ১৪ অক্টোবর আবার পার্লামেন্ট শুরু হবে বর্ধিত অবকাশের পর।

কিন্তু এমপিরা যদি আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে অনাস্থা ভোট পাস করিয়ে নিতে পারেন, তাহলে নতুন করে সরকার গঠনের জন্য অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার বিরাট একটি সম্ভাবনা থাকবে।

কিন্তু আবার নির্বাচন হলেও কি ব্রেক্সিট কার্যকর হবে?
এটি পুরোপুরি নির্ভর করে ফলাফলের ওপর। নির্বাচনে কনজার্ভেটিভরা জিতলে ব্রেক্সিট হবে। মতামত জরিপে টেরেসা মে’র কাছ থেকে বরিস জনসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত তারাই এগিয়ে (৩১%)।

প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি ১০ থেকে ১২ পয়েন্ট পেছনে রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ নিয়ে। লেবার পার্টি আবার প্রথাগত কর্মজীবী শ্রেণি এবং লন্ডনের মতো শহুরে ভোটারদের মধ্যে বিভক্ত। কর্মজীবী শ্রেণির ভোটাররা বেশিরভাগই ব্রেক্সিটের পক্ষে। অন্যদিকে শহরের ভোটাররা ইইউতেই থাকতে চান।

অবশ্য কনজার্ভেটিভ মতামত জরিপে এগিয়ে থাকলেও তার জয় নিশ্চিত নয়। লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং স্কটিশ ন্যাশনালিস্টদের মতো মধ্য-বামপন্থি দলগুলো ব্রেক্সিটের ঘোর বিরোধী। তাদের সমর্থকের সংখ্যাও কম নয়।ব্রেক্সিট-যুক্তরাজ্য-ব্রিটেনের রাজনীতি

অন্যদিকে আবার রয়েছে নাইজেল ফারাজের ব্রেক্সিট পার্টি, যার মূলনীতি হলো যেভাবেই হোক ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে নিয়ে আসা।

যুক্তরাজ্যে চলমান রাজনৈতিক তারল্য এবং মতামত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কারণে এখন বলাটা মুশকিল অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচন কে আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, বা আদৌ কোনো দল তা পাবে কিনা।

কিন্তু এই নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে আরও অনেকগুলো ধাপ পার করতে হবে। যার প্রাথমিক অবস্থাটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

Bellow Post-Green View