চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেলা শেষে ফিরে এসে পাই না তারে

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার পরিচয় রেডিওতে। তখন হয়তো তিন ক্লাসে পড়ি। মা দুপুরে রেডিও শুনতে শুনতে কাজ করতেন। কোন এক সংগীতমালায় শুনেছিলাম আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গান। ‘শ্রোতা বন্ধুরা আপনারা এখন শুনবেন মহাগ্যাঞ্জাম চলচ্চিত্রের গান। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু।’ ঘোষক এমন কিছু একটা বলেন। তারপর রেডিওতে গান বাজে- ‘চাক্কু মাইরা এই কলিজায় বউ আমার পালায় পালায়, বউ গেলে এমন মিষ্টি বউ পাবো কোথায়?’ গান শুনে আমার হাসি পায়। ‘মজার গানতো!’ আমি তখন রেডিওতে গান শুনে শুনে সিনেমার দৃশ্য কল্পনা করতাম, তাই গানটা আমার ভালো লাগে। শিল্পীর নাম আইয়ুব বাচ্চু এর আগে শুনি নাই।


মফস্বল শহরের সরকারি কোয়ার্টারে প্রথম আমি ছাদ দেখি। মানে দু’তলা বাড়ির ছাদে যে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যায় সেইটা দেখি। ফুরিয়ে যাওয়া দুপুরে দেখতাম এক তরুণ আর এক তরুণী ছাদে হাঁটাহাঁটি করতো। একদিন আমার খুব ইচ্ছে হলো ছাদে উঠার। আমি নীচ থেকে তাদের ডাকলাম, ‘এই যে! শুনছেন! আমি কি একটু উপরে উঠব?’ ছেলেটা ধমক দিলো- ‘যা এখান থেকে!’ আমার পোশাক-আসাক ভালো ছিলো না। ভেবেছে গরীব মানুষের উপরে উঠার দরকার কি! কিন্তু মেয়েটা ডাকলো- ‘এই ছেলে! আসো, এই দিকে সিঁড়ি। সেই প্রথম ছাদে চড়া। তাদের ছাদে খরগোশ ছিলো। মেয়েটা আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে গেলো। আপেল খেতে দিয়েছিলো। তাদের বাসায় গান বাজছিলো:
’সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে,
সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম,
কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি,
কিভাবে এত বদলে গেছি এই আমি,
ও বুকেরই সব কষ্ট দুহাতে সরিয়ে —-
চল বদলে যাই ’

তিন ক্লাসে পড়ি, কত আর বয়স! কিন্তু এর মিউজিক বুকের ভেতর কী অদ্ভুত অসহায়ত্ব তৈরি করেছিলো।


আইয়ুব বাচ্চুকে ভালো করে চেনায় বন্ধু আশরাফ লিটন। সে ক্লাসের বেঞ্চে ড্রাম বাজাতে বাজাতে শুনিয়েছিলো ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি’। তখনও প্রেম কি জানি না। ভালোবাসায় যে অদ্ভুত কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তাও জানি না। কিন্তু এই গান আমার ভালো লাগে। বুকের খুব গহীনে একটা কষ্ট কষ্ট তান ওঠে। তারপর এইগান শুনতাম মনি ভাই বাজাতেন। মনি ভাই পাশের বাসায় থাকতেন। তখন হয়তো তার প্রেম ভেঙেছে। সারাদিন এইসব গান শুনতেন। শুনে শুনে আমিও গাইতাম। শুনতাম,

ফেরারী এই মনটা আমার
মানে না কোনো বাঁধা
তোমাকে পাবারই আশায়
ফিরে আসে বারেবার ।।


বাবার চাকরির স্টেশন বদল হওয়ায় আর শহরে চলে এলাম। সবকিছু নতুন। স্কুল। চারপাশ। সহপাঠী। সব নতুন। পুরো শহর জুড়ে শুধু তিনটা মানুষ আমার পরিচিত। মা,বাবা, বোন। তখন গান হয়ে উঠলো আশ্রয়। বিকেলে বারান্দায় বসে গান শুনতাম-

‘বুকের এক পাশে রেখেছি
জলহীন মরুভূমি
ইচ্ছে হলে যখন-তখন
অশ্রুফোঁটা দাও তুমি
তুমি চাইলে আমি দেব
অথই সাগর পাড়ি’

সে সময়টাতে বড় হয়ে উঠতে থাকলাম। স্কুল পালিয়ে সিনেমা-টিনেমা দেখি। ‘লুটতরাজ’ সিনেমায় শুনলাম আইয়ুব বাচ্চুর ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’। সাগরিকা সিনেমার ‘আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে’। কিংবা ‘লাল বাদশা’ সিনেমার ‘আরও আগে কেন তুমি এলে না’ গানগুলো বাংলা সিনেমার মূল স্রোত থেকে বাইরের অন্যরকম এক আবহের। এরপর  ‘আম্মাজান’ ছবির গানগুলোতো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ‘আম্মাজান আম্মাজান’ বা ‘স্বামী আর ই-স্ত্রী, বানাইলেন যে মেস্তরি’ গানগুলো বাজতে থাকলো পাড়ার দোকান থেকে গ্রামের বাজারেও। সাথে সাথে আইয়ুব বাচ্চুও ছড়িয়ে পড়লেন গণমানুষের কান থেকে গুনগুনে, হৃদয়ে হৃদয়ে।


মানুষতো এমনই— অভিজ্ঞ হওয়ার পর অনুভব করতে পারে অন্যের অনুভূতি। আইয়ুব বাচ্চুর গানগুলো হয়তো শুনেছি, ভালো লেগেছে। কিন্তু প্রথম অনুভব করতে শিখলাম বছর দুয়েক পর যখন প্রেমে পড়ে গেলাম। আর আর মানুষের মতোই অসম্ভবের প্রেমে পড়লাম। ফলত আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে শোনা গানগুলো খুব অনুভব করতে পারতাম। তখন চোখে অসুখ। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকতে পারি না। চোখ বন্ধ করে শুনতাম ‘রাজকুমারী’।

‘যেন হাজার বছর পরে নির্জনতার ঘুম ভাঙাতে এলো এক রাজকুমারী’

কী এক শিহরণ ছিলো গানটিতে কে জানে! হৃদয়ে দুমরে-মুচড়ে যেতো।

আমাদের শৈশব থেকে  কৈশোর, তারুণ্য পাড়ি দিয়েছি আইয়ুব বাচ্চু শুনে শুনে। আইয়ুব বাচ্চুর মোহন কণ্ঠের সাথে মিশেছে আমাদের প্রেম, কষ্ট, ভালোবাসা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি। আমরা প্রেমে পড়ে শুনেছি আইয়ুব বাচ্চু, আমরা প্রেম থেকে উঠে শুনেছি, আমরা ভালোবাসা পেয়ে শুনেছি, ভালোবাসা হারিয়েও গিয়েছি তাঁর কাছে।

এখন অনেক রাত
খোলা আকাশের নিচে
জীবনের অনেক আয়োজন
আমায় ডেকেছে
তাই আমি বসে আছি
দরজারও পাশে-

মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়, সম্পর্ক ভেঙে যায়। সম্পর্কে চলে টানা-পোড়েন। সে সময়টাতে গান হয় মানুষের আশ্রয়। এমন একটা খুব বাজে সময়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি আমিও। সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে চলে গিয়েছিলাম হাওড়ে একটা এনজিওতে চাকরি নিয়ে। আইয়ুব বাচ্চু’র একটা গান শুনে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি বুকে গভীর ব্যথা নিয়ে। সামনে অনন্ত জলরাশি নিয়ে মোবাইল ফোনের সংগীতলতা কানে গুঁজে শুনেছি—

‘ভাঙা মন নিয়ে তুমি
আর কেঁদো না
সব চাওয়া পৃথিবীতে
পাওয়া হয় না’


আমার এই জীবনের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর সুর গাঁথা আছে। তাঁর গান শুনে নিজেকে তৈরি করেছি। ভেঙেপড়া সময়ে নিয়েছি আশ্রয়। আনন্দে শুনেছি তাঁর গান, বিরহে শুনেছি। এখনও শুনি। পৃথিবীতে শিল্পীর এইসব ঋণ শোধ করা যায় না। তাঁর কাছে এক জীবনের ঋণ। প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

শেয়ার করুন: