চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিশ্বকাপের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া জাদুকরী মুহূর্তগুলো

দরজায় কড়া নাড়ছে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ময়দানি লড়াই শুরুর আগেই ক্রিকেটবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে রোমাঞ্চ, উত্তেজনা। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সেরা দলটিই শেষ হাসি হাসবে। তবে কখনো কখনো চির-অনিশ্চয়তার খেলাটি আমাদের অনুমানকে ছাপিয়ে যায়। জাদুকরী কিছু মুহূর্ত গোটা টুর্নামেন্টের চিত্রই পাল্টে দেয়।

বিশ্বকাপের আগের ১১টি আসর তেমন কিছু জাদুকরী মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। সেগুলো থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের সঙ্গে পরিচয় হওয়া যাক-

বিজ্ঞাপন

১৯৮৩ বিশ্বকাপ: ক্যারিবিয়ান-দুর্গের পতন, ভারতের ইতিহাস
’৮৩ বিশ্বকাপে ভারতের মতো দলকে নিয়ে কে-ই বা আলোচনা করেছিল! গ্রুপ পর্বের ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে লজ্জার মুখে পড়েছিল টিম ইন্ডিয়া। এরপর কপিল দেবের ১৭৫ রানের হার না মানা মহাকাব্যিক ইনিংসে ভর করে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। যেটি তাদের ড্রেসিংরুমের চেহারাই আমূলে বদলে দেয়।

এরপর ফাইনালে গিয়ে ইতিহাসই রচনা করে ফেলে কপিলের দল। শিরোপা লড়াইয়ে আগের দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শুরুতে ব্যাটিংয়ে নেমে মাত্র ১৮০ রানেই গুটিয়ে যায় ভারত। ক্রিকেটবিশ্ব হয়তো ক্যারিবিয়ানদের হ্যাটট্রিক শিরোপার দৃশ্যপটই আঁকছিল। তবে সবাইকে ভুল প্রমাণ করে লর্ডসের ব্যালকনিতে ট্রফি উঁচিয়ে উদযাপন করে ভারত।

১৯৮৭ বিশ্বকাপ: অজি-আধিপত্যের সূচনা
সেবার প্রথমবাবের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বুদ ছিল ক্রিকেটের আদিভূমি ইংল্যান্ড। শিরোপা জয়ের জন্য ২৫৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে মাইক গ্যাটিংয়ের দারুণ ব্যাটিংয়ে কক্ষপথেই ছিল ইংলিশরা। কিন্তু অ্যালান বোর্ডারের বলে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে নিজের ও দলের সর্বনাশ ডেকে আনেন ইংলিশ দলনায়ক।

গ্যাটিংয়ের বিদায়ের পর আর কক্ষপথে ফিরতে না পারা ইংল্যান্ড ৭ রানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। অন্যদিকে সেই থেকেই বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ান আধিপত্য শুরু হয়, যা এখনো চলছে।

১৯৯২ বিশ্বকাপ: ম্যাজিক্যাল ইমরান, অবিশ্বাস্য পাকিস্তান
পাকিস্তানের সোনায় মোড়ানো বিশ্বকাপটি জাদুকরী মুহূর্তে ভরপুর ছিল। সহজ কথায় বলতে গেলে পাকিস্তানের গোটা টুর্নামেন্টই ছিল ম্যাজিক্যাল। ময়দানি লড়াইয়ের আগে সাত ম্যাচের প্রতিটিতে হার। বিশ্বকাপ শুরুর পর পাঁচ ম্যাচের চারটিতে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়া টিম পাকিস্তানকে নিয়ে বাজি ধরার লোক হয়তো হাতে গোনাও ছিল না। সকলে দলটিকে বাতিলের খাতায়ই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু দলে ইমরান খান নামের একজন জাদুকর ছিলেন। যার ছোঁয়ায় সোনা ফলাতে শুরু করে পাকিস্তান।

বিজ্ঞাপন

টানা তিন ম্যাচ জেতার পথে অপরাজিত নিউজিল্যান্ডকে বধ করে সেমিতে জায়গা খুঁজে নেয় পাকিস্তান। এরপর রচনা করে অবিশ্বাস্য ইতিহাস। ইমরানের চৌকস নেতৃত্ব, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ইনজামাম-উল-হকের বিধ্বংসী ব্যাটিং, আকিব জাভেদের দুর্দান্ত সব স্লোয়ার, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত ছক্কা হাঁকিয়ে মঈন খানের ফাইনাল নিশ্চিতকরা, জাভেদ মিয়াঁদাদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, ল্যাম্ব ও লুইসকে করা ওয়াসিম আকরামের দুটি ম্যাজিক্যাল ডেলিভারি- প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার পথে কী উপহার দেয়নি পাকিস্তান!

১৯৯৬ বিশ্বকাপ: নতুন যুগের সূচনা
আজকের দিনে ব্যাটসম্যানরা যে ওপেনিংয়েই ঝড় তোলেন, বিশ্বক্রিকেটকে সেটি প্রথম দেখিয়েছেন সনাথ জয়সুরিয়া ও রমেশ কালুভিথারানা। গোটা টুর্নামেন্টজুড়ে শুরুতে চার-ছক্কার ফুলঝুরি বইয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষ বোলারদের আত্মবিশ্বাস শূন্যতে নামিয়ে আনতেন এ দুই শ্রীলঙ্কান।

জুটিতে জয়া ও রমেশের ঝড়ো ব্যাটিং সাফল্যের পথ তৈরি করে দেয় লঙ্কানদের। ফাইনালে জয়সুরিয়া ও কালুভিথারানা ব্যর্থ হলেও অরিবন্দ ডি সিলভার হার না মানা সেঞ্চুরির সুবাদে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরে শ্রীলঙ্কা।

১৯৯৯ বিশ্বকাপ: অস্ট্রেলিয়ার একক আধিপত্যের শুরু
১৯৯২ সালে ইমরান খান এবং ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অর্জুনা রানাতুঙ্গা যে আত্মবিশ্বাসের বলীয়ানে সফল হয়েছিলেন, সেই বিশ্বাসই সফলতা এনে দেয় স্টিভ ওয়াহকে। বিশ্বকাপ শুরুর পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন পরের সাত ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হবে অস্ট্রেলিয়া।

অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবে হলও তেমনটি। একক আধিপত্য দেখিয়ে পরের সবগুলো ম্যাচ জিতে বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠেন ওয়াহ ও অজিরা।

২০১১ বিশ্বকাপ: শচীনের আক্ষেপ-মোচন
২০০৩ ও ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ছিল অস্ট্রেলিয়ার একক আধিপত্যের গল্প। ২০১১ বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা শচীনময়। সবাই ধরেই নিয়েছিল এবার শিরোপা ভারতের হাতেই উঠবে। শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা কিংবদন্তি শচীনকে বিশ্বকাপের শিরোপা দিয়েই বিদায় দিতে চেয়েছিল টিম ইন্ডিয়া। নিয়তিকেও পাশে পান মাস্টার ব্লাস্টার।

সেমিফাইনালে পাঁচ-পাঁচবার পাকিস্তানি ফিল্ডারদের শচীনের ক্যাচ ফেলা সেটিই হয়ত প্রমাণ করে! এরপর অবিশ্বাস্যভাবে ডিআরএসের সহায়তায় এলবিডব্লিউ থেকেও বেঁচে যান টেন্ডুললকার! ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে সহজেই হারিয়ে শচীনকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা উপহার দেয় নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা ভারত। কিংবদন্তিকে শিরোপায় বিদায় জানিয়ে হয়ত ধন্য হয়েছে ক্রিকেটই!