শহীদ মধুসূদন ধরের মেয়ে সুপ্রীতি ধর। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের জনপ্রিয় এই ব্যক্তিত্বের পোশাকি নাম ছিল হীরেন্দ্র চন্দ্র ধর। সবাই তাকে এক নামে চিনতেন, ‘মধুদা’ বলে। তার কন্যা সুপ্রীতি ধর বর্তমানে উইমেন চ্যাপ্টার এর সম্পাদক। বাবাকে কাছে পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। একাত্তরের ১৬ মে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে যায় তার বাবাকে। এরপর আর বাবার খোঁজ পাননি।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আজকের এই দিনে বাবাকে স্মরণ করে ফেসবুকে লিখেছেন সুপ্রীতি ধর। সেখানে তার বাবার দেশপ্রেম, পাকিস্তানী বাহিনীর ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়কার কথা বলেছেন। তার মাকে উদ্দেশ্য করে বাবার লেখা চিঠিও শেয়ার করেছেন তিনি। বাবা-মার একটি ছবিও শেয়ার করেছেন।
ফেসবুকে সুপ্রীতি ধর লিখেছেন,
“সাতচল্লিশে দেশভাগের পর মায়ের পরিবার চলে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। জ্যাঠুমুনি, পিসীরাও চলে গেছিল। কিন্তু আমার বাবা যায়নি। তখনও মা-বাবার বিয়ে হয়নি। নিচের চিঠিগুলো ১৯৫০ সালের, বাবার হাতে লেখা, মাকে উদ্দেশ্য করে। কেন তিনি এইদেশ ছেড়ে যাবেন না মায়ের চাওয়া সত্ত্বেও, সেই কথা তিনি লিখেছিলেন এই চিঠিতে। চিঠির একটা জায়গায় লিখেছেন, ‘প্রয়োজন হলে জীবন দিয়ে দেবো, তবু এদেশ ছেড়ে যাবো না’। শেষপর্যন্ত মাকেই সব ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল বাবার কাছে। আর বাবাও জীবন দিয়েই দেশপ্রেম প্রমাণ করেছিলেন।
মা-বাবা স্কুল জীবন থেকেই একসাথে আজাদ হিন্দ ফৌজ করতেন। সুভাষ বোস যখন ময়মনসিংহের গৌরীপুরে এসেছিলেন, তখন তাদের সান্নিধ্যও পেয়েছিলেন দুজনই।


বাবা কী না করেছেন জীবনে! খেলাধুলার মাঠে যেমন একজন সুদক্ষ খেলোয়াড়, একজন ক্রীড়া সংগঠক, শিক্ষক, তেমনি রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন। সবার প্রিয় মধুদা (মধুসূদন ধর) ছিলেন বাবা। যদিও একটা পোশাকি নাম তাঁর ছিল।
একাত্তরে যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৭৫ জন কাছের-দূরের আত্মীয়-স্বজন আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের গ্রামের বাড়িতে। বাবা হাসিমুখে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বাড়ির পিছনে বাঙ্কার খুঁড়ে দিয়েছিলেন বিপদে মেয়েরা যাতে আশ্রয় নিতে পারে। এতো এতো মানুষ বাড়িতে আশ্রয় নেয়ায় সহজেই নজরে পড়ে যায় অনেকের। বাবা হয়ে যান টার্গেট।
এসময়ই একদিন লুট হয় বাড়িতে। সেদিন রক্তারক্তি ঘটনা ঘটে। আমাদের একজন আত্মীয়কে বল্লম দিয়ে আঘাত করে ডাকাত ওরফে চেনামুখ লুটেরা রাজাকারদের একজন। সেই তিনি আহত হয়েও ওই ডাকাতকে পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপরের দিনও লুট হয় বাড়িতে। ধান-চালে ছড়াছড়ি তখন বাড়ির উঠোন জুড়ে, সেইসাথে রক্ত। তারও একদিন পর বাড়ির লোকজন দূরে পাকবাহিনীকে আসতে দেখে যে যার মতো দৌড়ে পালায়। কয়েকজন পুলিশ সাথে নিয়ে পাকবাহিনী এসে বাবার খোঁজ করলে বেরিয়ে আসে বাবা।
লুঙ্গি আর শার্ট পরে বাবা চলে যায় তাদের সাথে। সেটাই শেষ যাওয়া। তখনও সকালের খাবার কেউ খায়নি। বাবার নাকি খুব ক্ষিদে পেয়েছিল, বলতেন বাড়ির পুরনো ভৃত্য পাঞ্জর কাকা। মা আর পাঞ্জর কাকা দৌড়ে গিয়েছিলেন থানায়, ততক্ষণে বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাঞ্জর কাকা দৌড়ে আসেন রেল স্টেশনে। তখনও ট্রেনটি দাঁড়িয়ে। বাবা নাকি তখন কাকাকে দেখে কেঁদে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, পাঞ্জর ভাই, খিদে পেয়েছে খুব। এক টুকরো রুটির জন্য স্টেশনের এমাথা-ওমাথা করেও শেষরক্ষা হয়নি। ট্রেন নিয়ে যাচ্ছে বাবাকে, আর অক্ষম পাঞ্জর কাকা তা দেখছেন, এক টুকরো রুটি বাবার হাতে তুলে দিতে না পারার কষ্ট কাকাকে সারা জীবন তাড়িয়ে ফিরেছে, যতদিন বেঁচেছিলেন।
গল্পগুলো পুরনো, অনেকবার বলা। কিন্তু যতবার বলি, মনে হয় নতুন করে বলছি।”








