চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হবে না

করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশের অর্থনীতি স্থবির। প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরছে না। অর্থনীতির লাইফলাইনগুলোও আপাতত নিশ্চল। অনেকেরই মনে শঙ্কা, তাহলে কি চুয়াত্তরের পরে আবার দুর্ভিক্ষের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে? আশাবাদের কথা হলো, সেই শঙ্কা খুবই কম। তবে সেখানে কিছু ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’ রয়েছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, মুক্তিযোদ্ধাদের পরে বাংলাদেশের ‘রিয়েল হিরো’ বা প্রকৃত নায়ক হচ্ছেন কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীরা। ১৯৭৪ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো। কিন্তু তখনও খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং যার পরিণতিতে দুর্ভিক্ষ। কিন্তু এখন দেশের জনসংখ্যা তার দুই গুণেরও বেশি। তা সত্ত্বেও চুয়াত্তর সালের পরে দেশে আর কখনোই দুর্ভিক্ষ হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অচলবস্থার কারণে অনেক সময় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে বটে, খাদ্যপণ্যের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছে, কিন্তু দুর্ভিক্ষ হয়নি। এর পেছনে মূল কাজ করেছেন আমাদের ওই নায়কেরা, অর্থাৎ ও কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে প্রতিনিয়তই কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত, বিশেষ করে খরা-বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড়-নদীভাঙন-লবণাক্ততাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার পরেও দেশের ১৭ কোটি মানুষ খেয়েপরে যে বেঁচে আছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এই কৃষি খাতের। একসময় যেসব জমি খরা, জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততার কারণে পতিত হয়ে পড়ে থাকতো, সেসব জমিতেও এখন ফসল হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন খরা-লবণ ও জলসহিষ্ণু ফসলের জাত। মাটি ছাড়াই কিভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়, সেই প্রযুক্তিও এসেছে। বিগত বছরগুলোয় শহরাঞ্চলে ছাদকৃষি যেভাবে জনপ্রিয় হয়েছে, তা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্যই শিক্ষণীয় এবং ঈর্ষার। শহুরাঞ্চলের অনেক স্বচ্ছল মানুষও এখন নিজেদের ছাদ বাগানের কৃষি দিয়েই নিজেদের সবজির চাহিদা মেটান। শুরুতে এটা শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ছাদকৃষি এখন একটি বিরাট অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম।

শুধু নানাবিধ জাত উদ্ভাবনই নয়, বরং অল্প জমিতে কিভাবে অধিক ফসল হতে পারে, বিজ্ঞানীরা তাও আবিষ্কার করেছেন। সারা বছরই জমিতে ফসল হচ্ছে। একটি ফসলের পরে আরেকটি ফসলের ঘ্রাণ। সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ ও সেচ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা, লক্ষ্যভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি উপকরণের দাম সহনীয় রাখা, সময়মতো কৃষকের কাছে বীজ ও সার পৌঁছানোর মতো কাজগুলোয় সরকারের অগ্রাধিকার রয়েছে।

কৃষিজমির পরিমাণ কমার পাশাপাশি নানাবিধ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুরযোগের মধ্যেও প্রতি বছরই যে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ছে তা দেখা যাচ্ছে সরকারের সবশেষ (২০১৯) অর্থনৈতিক সমীক্ষায়। এই সমীক্ষা বলছে, ২০১১-১২ সালে আউসের উৎপাদন হয়েছিল ২৩ দশমিক ৩৩ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ২৭ দশমিক ০২ লাখ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ সালে আমনের উৎপাদন হয়েছিল ১২৭ দশমিক ৯৮ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ১৪১ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ সালে বোরো উৎপাদন হয়েছিল ১৮৭ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ১৯৬ দশমিক ২৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ সালে মোটা চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩৩৮ দশমিক ৯০ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ৩৬৪ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ সালে গম উৎপাদন হয়েছিল ৯ দশমিক ৯৫ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ১২ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। সরকারের কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় আর আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত এবং বিশ্বে সপ্তম। চাম্বুল মেহগনির বদলে মানুষ এখন ফলের গাছ লাগায়। মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর, স্ট্রবেরি, ড্রাগনসহ ভিনদেশি আরও অনেক ফল এখন বাণিজ্যিভাবেই চাষ হচ্ছে।

ছাদকৃষি গবেষণা-শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়তবে শুধু কৃষি নয়, বিগত বছরগুলোয় মৎস্য ও পোল্ট্রি খাতেও দেশে যে বিপ্লব হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। শুরুর দিকে কার্প জাতীয় মাছ ও চিংড়িতে এই বিপ্লব শুরু হলেও এখন ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছা ছাড়া মোটামুটি সব ধরনের মাছই বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এবং সারা বছরই বাজারে প্রচুর মাছ মিলছে। যে শিং, কই, মাগুর, পাবদা নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলে, সেসব মাছ আবার ফিরে এসেছে দোর্দণ্ড প্রতাপে। খেতে আগের মতো অতটা সুস্বাদু না হলেও আমিষের চাহিদা অন্তত মিটছে। মাগুরের ঝোল এখন মোটামুটি খেয়েপরে ভালো থাকা পরিবারগুলোর থালায়ও উঁকি দিচ্ছে। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। বাংলাদেশর আগে আছে কেবল চীন ও ভারত। চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ।

একইভাবে বিপ্লব এসেছে দেশের পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতে। পোল্ট্রি খাত বিকশিত না হলে বাজার থেকে ডিম উধাও হয়ে যেতো। প্রাকৃতিকভাবে লালন করা সামান্য কিছু হাঁস মুরগির ডিম বাজারে এলে তা সাধারণ মানুষ চোখেও দেখতো না। হাঁস মুরগির মাংস চলে যেতো মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে। কিন্তু এখন একজন দিনমজুরও মুরগির মাংস ও ডিম খেতে পারছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডেইরি ফার্ম। ফলে বাজারে এখন আর গরুর দুধের কোনো সংকট নেই। গরুর মাংসের দাম বেশি হলেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো আমদানি নির্ভর হলে কী অবস্থা হতো, তা সহজেই অনুমেয়।

২০১৯ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে দুধের উৎপাদন হয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৩ লাখ টন, যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ৭০ দশমিক ১৬ লাখ টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে মাংসের উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩২ লাখ টন, যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ৬২ দশমিক ৭৮ লাখ টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন হয়েছে ৭৩০৩৮ লাখ টন, যা ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ১১৮৫২০ লাখ টন।

সুতরাং যে দেশের কৃষি, মৎস্য, পোল্ট্রি ও ডেইরিতে এত সাফল্য, সে দেশে দুর্ভিক্ষ কেন হবে? সবচেয়ে বড় কথা এই দেশের মাটি। বীজ পড়লেই তা গজিয়ে ওঠে। সামান্য একটু যত্নআত্তি পেলেই প্রকৃতি দুহাত ভরে দেয়। কিন্তু এসব আশাবাদের ভেতরেও অনেকগুলো ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’ এখনও আমাদের জন্য বড় কনসার্ন বা উদ্বেগের বিষয়—যা করোনর প্রভাব কেটে যাওয়ার পরে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না পারলে বা এই খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ভিক্ষ হবে না বলে আমরা যে আশাবাদের কথা বলছি, সেটি মিথ্যাও প্রমাণিত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

করোনার প্রাদুর্ভাব ও লকডাউনের ভেতরেই ধান কাটার মৌসুম চলে এসেছে। ধান শুধু কাটলেই হয় না, সেটিকে খাবার উপযোগী করে চালে পরিণত করতে অনেকগুলো ধাপ পেরোতো হয়। সবগুলো ধাপে প্রচুর মানুষের কায়িক পরিশ্রম লাগে। সুতরাং করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে যেখানে এখন একমাত্র উপায়ই বলা হচ্ছে ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কী করে ধান কাটা থেকে শুরু করে চাল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা যাবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন।

পরিস্থিতি যদি খুব দ্রুত স্বাবাবিক না হয়, তাহলে ফসল যতই উৎপাদন হোক না কেন, সেটি বাজারজাত করা আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং সেখানে একটি বড় মেকানিজম লাগবে। বাজারে একসঙ্গে অনেক লোকের সমাগম হয়। সুতরাং সেখানে ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা আদৌ সম্ভব নয়। সুতরাং ফসল উৎপাদনের পরে সেটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় কীভাবে বাজারে আসবে এবং ক্রেতারা কীভাবে সেটি যতটা সম্ভব শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কিনতে পারবেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বই প্রধান।

করোনাজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় নানা খাতের জন্য সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, সেখানে কৃষকও আছে। কিন্তু এই প্রণোদনা সরাসরি কৃষক যাতে পায়, যাতে মাঝখান দিয়ে এর একটি বড় অংশ যাতে সরকারি কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধি এবং টাউট ও দালালদের পকেটে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

সার বীজসহ কৃষি উপকরণের দাম যাতে না বাড়ে, সেই ব্যবস্থার পাশাপাশি করোনার প্রকোপ কেটে গেলে প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করতে হবে।

কৃষক যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক ও খুচরা ক্রেতার মাঝখানে মধ্যসত্ত্বভোগীর সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।

কৃষকের কাছ থেকে সরকার যে ধান চাল সংগ্রহ করবে, সেই প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে।

ফসলের উৎপাদনই শেষ কথা নয়, বরং সেটির সংরক্ষণও বিরাট কাজ। অনেক সময়ই সংরক্ষণের জায়গা না থাকার কারণে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পঁচনশীল দ্রব্য রাস্তায় ফেলে কৃষকের প্রতিবাদ করার খবরও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। ফলে জেলাভিত্তিক সংরক্ষণাগার তৈরি করতে হবে।

পরিশেষে আমাদের এটি মনে রাখা দরকার যে, দুর্ভিক্ষ শুধু খাদ্য সংকটের কারণে হয় না। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং সুশাসনের অভাবও দুর্ভিক্ষের কারণ হতে পারে। অতএব উর্বর মাটির দেশে চাহিদার চেয়েও বেশি ফসল আর মাছ মাংস উৎপাদন হচ্ছে বলে নির্ভাবনায় বসা থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং এখন এই চরম দুঃসময়ে কৃষি-মৎস্য-পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের দিকে সরকারকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কোনোভাবেই যাতে এই খাতগুলো বিপদে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এই খাতগুলো বিপদে পড়লে মানুষ পকেটে টাকা নিয়ে ঘুরবে, কিন্তু খাদ্য পাবে না। অর্থাৎ প্রকারান্তরে যাকে আমরা দুর্ভিক্ষ বলি, তা এড়ানো কঠিন হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)