চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘বাংলাদেশের মানুষ তো দেশকে ভালোবেসে মরতেও পারে’

‘পতাকা ওড়ানোর বিতর্ক’ প্রসঙ্গে বললেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমির

আবুধাবি থেকে: বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) খেলার সুবাদে তামিম-মুশফিকদের সাথে দারুণ সখ্যতা পেসার মোহাম্মদ আমিরের। পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি হওয়ায় গত বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে জানিয়েছেন বিদায়। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে অবশ্য অংশ নিচ্ছেন নিয়মিত। খেলছেন আবুধাবি টি-টেনেও, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা বাংলা টাইগার্সের জার্সিতে।

চ্যানেল আই’য়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় অনেক প্রসঙ্গের মাঝে উঠে এলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান হালচাল বিষয়ও। বললেন অনেককিছুই।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে হোম সিরিজে টাইগারদের পারফরম্যান্সে হতাশ হয়েছেন আমির। এরচেয়ে ভালো করার সুযোগ ও সক্ষমতা বাংলাদেশের ছিল বলেই মনে করেন তিনি। সমস্যাটা কোথায় সেটা নিজেও ধরতে পারছেন না।

আমিরের মতে, বাংলাদেশ সাউথ এশিয়ায় সবসময় দুর্দান্ত খেলে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কন্ডিশনও বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন নয়। এমনকি পাকিস্তানের সাথে হোম সিরিজেও আপ টু দ্য মার্ক ছিলেন না কেউই।

‘সমস্যাটা যে কোথায়, সেটা আমিও বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশ এরচেয়েও ভালো করতে পারে। তারা এখনও ভালো দল। তাসকিন, শরিফুল, নাঈম, শান্ত, ওদেরকে বিপিএলে দেখেছি কতটা আক্রমণাত্মক। বাংলাদেশের স্কোয়াডটা একেবারে নতুন নয়, যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ক্রিকেটার আছে। তারা এরচেয়ে ভালো করতে পারে।’ বন্ধুসুলভ ক্রিকেটারদের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে এভাবেই বললেন আমির।

ওদিকে শর্টার ফরম্যাটে বাংলাদেশের করুণ অবস্থার কথা বললেও টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশকেই এগিয়ে রাখছেন আমির। কেননা চট্টগ্রামের উইকেটে স্পিন কতটা ভয়ঙ্কর তা ভালোই জানা তার।

আমিরের ভাষায়, ‘যদি বাংলাদেশে টেস্ট খেলার কথা বলেন, তবে তাদের হারানোটা কঠিন। দুর্দান্ত স্পিনার আছে তাদের। নিজেদের কন্ডিশনে তারা ভালো।’

বাংলাদেশি বোলারদের নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘প্রতিটি বোলারের একটা মাইন্ড সেট থাকে। সবসময় সেটাই সে কাজে লাগায়। একসময় প্রতিপক্ষ সেটা বুঝে ফেলে। তাই প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখতে হয়।’

‘একজন বোলার হিসেবে আমি সময়সময় একটা প্ল্যান নেই। তবে প্ল্যান বি রাখতে হয়। কারণ দ্বিতীয় পরিকল্পনা এতোটাই শক্তিশালী হয় যে, প্রতিপক্ষকে ঘাবড়ে দেয়া যায়। ধরেন, ইনসুইং আমার শক্তির জায়গা, কিন্তু যেদিন সুইংয়ের সুবিধা পাবো না সেদিন কী করবো। তাই প্লান বি’র উপকারিতা অনেক।’

বিজ্ঞাপন

চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে থাকা ফিজকে নিয়ে বললেন, ‘জানিনা মোস্তাফিজের কী হয়েছে, যতই অনুশীলন করুক প্রতিপক্ষ তার স্লোয়ার আর গতি সম্পর্কে বুঝে যায়, ব্যাটসম্যান যখনই বোলারের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বুঝে যায়, সে পানিস্ট হবেই। তার সমস্যাটাই হচ্ছে সে নিজেকে ইম্প্রোভাইজড করছে না। এটা তার ক্যারিয়ারের জন্যই ক্ষতিকর।’

কথা প্রসঙ্গে চলে আসে বাংলাদেশের মাঠে বাংলাদেশি পাকিস্তানি সমর্থক ও দলের পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি। যা নিয়ে টাইগার ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম সমালোচনা করেননি। এসবকে যদিও বড় কোনো ইস্যু মানছেন না আমির।

‘সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি বাংলাদেশের মানুষরা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের কতটা ভালোবাসে। বিপিএলে দু’তিনটা সিজন খেলেছি, এশিয়া কাপেও ছিলাম, তারা খুবই অতিথি পরায়ণ। বাংলাদেশের দর্শকরা ক্রিকেট নিয়ে মারাত্মক ক্রেজি, ক্রিকেটের প্রতি তাদের প্রবল ভালোবাসা। বাংলাদেশের দর্শকদের ক্রাউড, চিৎকার মিস করি। পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের প্রতি তাদের এই ভালোবাসা পাওয়াটা আমাদের জন্য অনেক অনেক বড় বিষয়। তাই সময় সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে আসতে চাই, খেলতে চাই বিপিএলে।’

‘আর পতাকার ইস্যুতে তো আপনাদের জানা থাকারই কথা বা হয়তো দেখেছেনও, আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে যখন থেকে আমরা ক্যাম্প শুরু করি, প্রতিটি প্র্যাকটিসেই আমাদের পতাকা ছিল। এটা দোষের কিছু না, চাইলে বাংলাদেশ-ভারত ওরাও তো করতে পারে। সবাই দেশকে ভালোবাসে।’

‘বাংলাদেশের মানুষরা তো তাদের দেশকে ভালোবেসে মরতেও পারে। পতাকা উড়িয়ে ভালোবাসা দেখাতে পারেন পৃথিবীর যেকোনো দেশে থেকে। এটা তো কোনো ইস্যু হওয়ার কথা ছিল না। মামলার বিষয়টি নিয়ে জানি না কিছুই, আপনার থেকে শুনে অবাকই হলাম। এটা নিয়ে মন্তব্য করাও ঠিক হবে না। ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। বিষয়টি নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না আসায়।’

জানুয়ারিতে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে চার-ছক্কার তারকাময় বিপিএল। এবারও বিদেশী ক্রিকেটারদের সংখ্যা কমিয়ে রাখার পক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আবার ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো চাইবে তারকা ও পারফর্মার ওভারসিস খেলোয়াড়দের দলে টানতে।

আমির যদিও দিলেন দুঃসংবাদ। খেলতে আসছেন না বিপিএলের সপ্তম আসরে। কারণ হিসেবে বললেন, ‘আগেই বলেছি বাংলাদেশের দর্শকদের ভালোবাসার পাগলামিটা আমি মিস করি। তাদেরকেও আমি ভালোবাসি। কিন্তু এবার বিপিএলে আসতে পারবো না, একই সময়ে পিসিএল চলবে। আমাকে সেখানে অংশ নিতে হবে।’

গল্প প্রায় শেষের দিকেই ছিল। এমন সময় অবসর ভেঙে জাতীয় দলে ফেরার ইঙ্গিতের কথা মনে করিয়ে দিতেই আমিরের উত্তর, ‘সত্যি বলতে আগে বোর্ডে থাকা সিইও ওয়াসিম খান আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, সম্পর্কটাও ভালো ছিল আমাদের। সে এখন চলে গেছে। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনিই সব গোছাচ্ছেন, তার মতো করে। গণমাধ্যম বা অন্য যেকোনো জায়গা থেকে তিনি খুব অ্যাক্টিভ এবং পাওয়ারফুল।’

‘কী আর বলবো, ব্যস্ততার কারণে হয়তো তিনি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো ভাবার সময় পাননি। আর আমার কাছেও কেউ আসেনি। তাই অবসরের বিষয়গুলো নিয়ে আপাতত কিছু বলার নেই, কোনো মন্তব্য করাও হয়তো ঠিক হবে না। বাংলা টাইগার্সে ভালো সময় পার করছি। ম্যানেজমেন্টও খুব ভালো। তারা খুব আন্তরিক। পারফরম্যান্স দিয়ে তাদের আস্থার প্রতিদান দিতে পারবো।’

আমির সত্যিই প্রতিদান দিচ্ছেন। কোভিড থেকে সেরে উঠে মাঝপথে বাংলা টাইগার্সে যোগ দিয়েছেন। অনুশীলনে স্বাভাবিক থাকলেও নিজের প্রথম ম্যাচে ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের বিপক্ষে দেখা গেছে কতটা পরিশ্রম করতে আর ধুঁকতে হয়েছে। শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও ৪ ওভার বল করেছেন। শুরুতে কিপটে বোলিং করে একটি উইকেট নেন। শেষ পর্যন্ত ৩৩ রান বিলিয়েছেন। ডেকানকে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়েছে বাংলা টাইগার্স।

বিজ্ঞাপন