সকাল থেকেই বৃষ্টি আসি আসি করছিল। কলম্বোর আকাশ বাধটা ভেঙে দিয়েছে দুপুর নাগাদ। তবে ঝড় ওঠেনি। দুদল যেন তাই পণ করেই নেমেছিল ব্যাটে-বলে ঝড় তোলার। শ্রীলঙ্কার ২১৫ রানের ঝড়ের পর বাংলাদেশের পাল্টা ঝড়টা তাই মাতিয়ে দিল টি-টুয়েন্টির আসর। যাতে ৫ উইকেটের ইতিহাস গড়া এক জয়ে মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ।
প্রেমাদাসার ভেজা উইকেটের সুবিধা নিতে টস জিতে শ্রীলঙ্কাকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বোলাররা কোন সুবিধা আদায় করতে না পারলে লঙ্কানরা নির্ধারিত ওভারে ৬ উইকেটে ২১৪ রানের পুঁজি পায়। যেটি এই মাঠে সর্বোচ্চ সংগ্রহ, শ্রীলঙ্কা দলেরও। বাংলাদেশ নিজেদের সর্বোচ্চ সংগ্রহ গড়েই যার জবাব দিয়েছে। ৫ উইকেট আর ২ বল অক্ষত রেখেই।
দুর্দান্ত এই জয়ের পথে টি-টুয়েন্টির ইতিহাসে রান তাড়ার চতুর্থ সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। এই ফরম্যাটে রান তাড়ার সর্বোচ্চ রেকর্ডটি অস্ট্রেলিয়ার। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এবছরই অকল্যান্ড ২৪৩ রান তাড়া করে জেতে অজিরা।
এটি বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। কয়েকদিন আগেই ঘরের মাঠের সিরিজে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই শুরুতে ব্যাট করে ১৯৩ রানের পুঁজি গড়েছিল টাইগাররা। মিরপুরের সেই ম্যাচটি অবশ্য জেতা হয়নি। সঙ্গে এটি রান তাড়ারও দলীয় রেকর্ড টাইগারদের। আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৬৩ রান তাড়া করে জেতে বাংলাদেশ, খুলনায় ২০১৬ সালে।
পাহাড়সম লক্ষ্য টপকাতে শুরু থেকেই ঝড় তুলতে হত। তামিম-লিটন কাঙ্ক্ষিত ঝড়টা তুলে পথেই রাখেন বাংলাদেশকে। ১০ ওভারেই ১০০ তুলে ফেলেন। ৫.৫ ওভারের উদ্বোধনীতে আসে ৭৪ রান। তামিম ইকবালের চেয়ে লিটন দাসই ছিলেন বেশি আগ্রাসী। ফার্নান্দোর বলে এলবি হয়ে ফেরার আগে ১৯ বলে ৪৩ রান এসেছেন উদ্বোধন করতে নামা এ ডানহাতির ব্যাটে। ২ চার ও ৫ ছক্কার ইনিংস।

তামিম পরে সৌম্যকে সঙ্গী করে সংগ্রহটা একশতে টেনে নেন। যদিও ফিফটির আগেই ফিরেছেন। ৬ চার ও এক ছক্কায় ২৯ বলে ৪৭ রানের অবদান বাঁহাতি ওপেনারের। পেরেরাকে ফিরতি ক্যাচ দিয়েছেন।
পরের ব্যাটসম্যানদের রান তোলার গতি ধরে রাখতে হত। সৌম্য সরকার ও মুশফিকুর রহিম সে পথেই হাঁটেন। দুজনে ৫২ রান যোগ করেন ৪.৫ ওভারে। সৌম্যর বিদায়ে ভাঙে জুটি। ২ চার ও এক ছক্কায় ২২ বলে ২৪ রান করে ফার্নান্দোকে ফিরতি ক্যাচ দিয়েছেন এই বাঁহাতি।
মুশফিক অন্যপ্রান্তে চালিয়ে যান। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে গড়েন আরেকটি ৪২ রানের কার্যকরী জুটি। মাহমুদউল্লাহ একটি করে চার-ছয়ে ১১ বলে ঝড়ো ২০ তুলে চামিরার বলে ক্যাচ দেন। সাব্বির রহমান প্রয়োজনের মুহূর্তে হতাশ করেছেন। দুই বল খেলে রানের খাতা খুলতে পারেননি। ঝুঁকি নিয়ে এক রান নিতে যেয়ে পেরেরার সরাসরি থ্রোতে রানআউট।
কিন্তু ভরসা হয়ে ছিলেন মুশফিক। ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছেন। অপরাজিত ৭২ রানের ইতিহাস গড়া ইনিংস তার, ৫ চার ও ৪ ছক্কায় ৩৫ বলে সাজানো।
এর আগে ইনিংসের শুরু থেকেই ঝড় তুলে শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানরা দুইশ পার করে নেন দলীয় সংগ্রহ। প্রেমাদাসায় লঙ্কানদের আগের সর্বোচ্চ সংগ্রহটি ছিল ১৭৫ রানের, ভারতের বিপক্ষে নিধাস ট্রফির প্রথম ম্যাচেই। আর মাঠের আগের সর্বোচ্চ ওয়েস্ট ইন্ডিজের করা ২০৫ রান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০১২ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে।
ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়ে এদিন দুর্দান্ত শুরু করে টাইগার বোলারদের গড়িয়ে-উড়িয়ে সীমানার বাইরে পাঠাতে থাকেন গুনাথিলাকা ও মেন্ডিস। দুই লঙ্কান তরতরিয়ে এগিয়ে নেন রানের চাকা। দুজনের ঝড়ে ৪.৩ ওভারেই ফিফটি পেরোয় স্বাগতিকরা।
গুনাথিলাকার ও মেন্ডিসের ৫৬ রানের জুটি ভাঙেন মোস্তাফিজ। নিজের ভয়ঙ্কর অস্ত্র স্লোয়ার-কাটারে গুনাথিলাকার স্টাম্প উড়িয়ে। বাহাতি পেসারের দুর্দান্ত স্লোয়ার-কাটারটি বুঝতেই পারেননি গুনাথিলাকা। একটু আগেভাগে ব্যাট চালিয়েছিলেন। বল ব্যাট ফাঁকি দিয়ে উল্টে দেন স্টাম্প। ৩ চার ও এক ছক্কায় ১৯ বলে ২৬ রান এসেছে লঙ্কান উদ্বোধনীর ব্যাটে।
কুশল মেন্ডিস ও কুশল পেরেরা পরে রানের চাকা এগিয়ে নেন দ্রুততাল রেখেই। তাতে দশম ওভারেই শতক ছুঁয়ে ফেলে লঙ্কানরা। ঝড় তোলা মেন্ডিস তুলে নেন আরেকটি ফিফটি। টি-টুয়েন্টিতে শেষ চার ম্যাচে তৃতীয়, আর বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ম্যাচে টানা তৃতীয় ফিফটি।
সেটি থামান মাহমুদউল্লাহ। ইনিংসের ১৪তম ওভারে বোলিংয়ে এসে তুলে নেন দুই উইকেট। প্রথম বলে ছক্কা মেরেছিলেন মেন্ডিস। মাহমুদউল্লাহ পরের বলেই প্রতিশোধ নেন। ডিপ উইকেটে সাব্বিরের ক্যাচ বানিয়ে। থামে ২ চার ও ৫ ছক্কায় ৩০ বলে ৫৭ রানের ইনিংস।
মাহমুদউল্লাহর জোড়া আঘাতের ওভারে দাসুন শানাকা দ্বিতীয় শিকার। ডিপ মিডউইকেটে সাব্বিরের তালুতেই জমা পড়েন রানের খাতা খোলার আগেই। এরপর সিরিজে টানা দ্বিতীয় ফিফটি তুলে নেন পেরেরা।

খরুচে তাসকিন তখন বোলিংয়ে ফিরে আঘাত হানেন। ২ রান করা দিনেশ চান্দিমালকে ফেরান। মিডঅফে সাব্বিরের আরেকটি দুর্দান্ত ক্যাচ হয়ে থামেন লঙ্কান অধিনায়ক।
তবে একপ্রান্ত আগলে রাখা কুশল পেরেরাকে থামাতে বেগ পেতে হয়েছে টাইগারদের। শেষপর্যন্ত ৭৪ রানে তাকে থামান মোস্তাফিজ। ৮ চার ও ২ ছক্কায় ৪৮ বলের ইনিংসটি ততক্ষণে যা সর্বনাশ করার করে ফেলেছে। ওই ওভারেই থিসারা পেরেরাকেও (০) ফেরান ফিজ। উপুল থারাঙ্গা ১৫ বলে ৩২ রানের ঝড়ে তারপরও সংগ্রহটা পাহাড় উচ্চতাতেই টেনে নেন।
তাসকিন ৩ ওভারে ৪০ রানে এক উইকেট পেলেও সবচেয়ে খরুচে বোলার এদিন। ৪ ওভারে ৪৫ রান দেয়া রুবেল উইকেটের দেখা পাননি। মিরাজ দারুণ বল করেছেন, ৪ ওভারে মাত্র ৩১ রান দিয়েছেন, অবশ্য উইকেট মেলেনি।
দুই উইকেট নেয়া মাহমুদউল্লাহর খরচ ২ ওভারে ১৫ রান। আর সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেয়া মোস্তাফিজ ৪ ওভারে বিলিয়েছেন ৪৮ রান।
বাংলাদেশ সর্বশেষ ১৪ টি-টুয়েন্টির ১৩টিতেই হেরেছিল। সর্বশেষ জয়টা ছিল এই প্রেমাদাসাতেই। গত বছরের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কা সফরে মাশরাফীর টি-টুয়েন্টির বিদায়ী ম্যাচে। পরাজয়ের বৃত্ত ভাঙতে সেই মাঠকেই প্রেরণা বানিয়ে নিল লাল-সবুজরা।








