চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিনি এক সংগ্রামী নারী

শেখ রাজিয়া নাসের

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালো রাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে নিহত হন শেখ রাজিয়া নাসেরের স্বামী বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের। স্বামীসহ স্বজনদের অধিকাংশকে হারানো রাজিয়া তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তারপর একজন সংগ্রামী নারী রূপে সেই কঠিন সময় পাড়ি দেন রাজিয়া নাসের।

তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে শেখ রাজিয়া নাসেরের সংগ্রামী জীবনের নানা দিক।

বিজ্ঞাপন

কোনাে রকম সন্তানদেরকে নিয়ে জীবন বাঁচান
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মিরা শেখ আবু নাসের এর টুঙ্গিপাড়ার বাড়ী পুড়িয়ে দেয়। পরে সন্তানদের নিয়ে ঢেকিঘরে আশ্রয় নেন শেখ রাজিয়া নাসের। রাজাকাররা জানতে পারে যে শেখ নাসের এর পরিবার ঢেকিঘরে আশয় নিয়েছে। সেখানে যেয়ে তারা সেটিও পুড়ে দেয়। পুড়িয়ে দেওয়ার সময় শেখ রাজিয়া নাসের তার সন্তান শেখ রুবেলকে ফিডারে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। ফিডারটি কেড়ে নিয়ে রাজাকাররা ভেঙ্গে ফেলে এবং ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কোনাে রকম সন্তানদেরকে নিয়ে জীবন বাঁচান।

২. শেখ নাসের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছেলে শেখ হেলাল ও ভাতিজা শেখ জামাল তারাও শেখ নাসের এর সাথে মুক্তিযুদ্ধে মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন ৯নং সেক্টরে। শেখ হেলাল ও শেখ জামাল ছােট থাকার কারণে তারা মুক্তিযােদ্ধাদের জন্য গােলাবারুদ সরবরাহ করতেন, মুক্তিযােদ্ধাদের তথ্য দিতেন এবং তাদের অস্ত্রের গুলি লোড করে দিতে সাহায্য করত। যুদ্ধের এক পর্যায়ে শেখ নাসের ভারতে চলে যান। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে সুন্দরবন এলাকায় সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন।

নিজের বাড়ীতে শতচেষ্টা করেও ঢুকতে পারেননি
৩. ‘৭৫ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে খুনিরা শেখ নাসেরকেও হত্যা করে। পরের দিন ১৬ আগস্ট যখন টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতাকে দাফন করা হচ্ছে শেখ রাজিয়া নাসের সন্তানদের নিয়ে নিজেদের লঞ্চে করে খুলনা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় আসেন। কিন্তু খুনিচক্র টুঙ্গিপাড়ায় সেই লঞ্চ ভিড়তে দেয়নি। পরে সন্তানদের নিয়ে লঞ্চে করে আবার খুলনায় ফিরে আসেন। বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন খুনি সরকার তার বাড়ী সীলগালা করে রেখেছে। নিজের বাড়ীতেও শতচেষ্টা করে ঢুকতে পারেননি। এক পর্যায়ে বাচ্ছাদের নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। পরে সন্তানদের নিয়ে রাতে বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নেন। তখন শেখ রাজিয়া নাসের প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

বিজ্ঞাপন

সন্তানদের নিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন
৪. বাবার বাড়ীতেও খুনিরা তাকে থাকতে দেয়নি। তার বাবার উপর নানা প্রেসার দিতে থাকে বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্ররা। একপর্যায় সেখানে টিকতে না পেরে পাবনায় নানার বাড়িতে চলে যান রাজিয়া নাসের । কিন্তু সেখানেও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা হয় না। স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয়নি। তখন বড় ছেলে শেখ হেলাল ক্যাডেট কলেজে পড়তেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্যাডেট কলেজে একটা গ্রুপ হানা দেয় শেখ হেলালকে তুলে আনার জন্য। কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্রদের বিশেষ করে ক্যাডেট কলেজের সেই সময়কার প্রিন্সিপালের বাধার মুখে শেখ হেলাল রক্ষা পায়।

নিদারুণ অর্থ কষ্টে পড়েন
৫. শেখ রাজিয়া নাসের সন্তানদের নিয়ে আবার খুলনায় ফিরে আসেন। এখানে সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন সাত সন্তানদের নিয়ে। বড় মেয়ে মিনা ও ছেলে শেখ জুয়েলকে খুলনা সরকারি স্কুলে ভর্তি করানাে হলেও জিয়া সরকারের নির্দেশে স্কুল থেকে তার সন্তানদের নাম কেটে দেয়। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাদের পারিবারিক ব্যবসাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সাত সন্তান নিয়ে নিদারুণ অর্থ কষ্টে পড়েন শেখ রাজিয়া নাসের। অবশেষে ১৯৮১ সালে তার বাড়ীর সীলগালা খুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি সন্তানদের নিয়ে সেখানে উঠেন। ইতােমধ্যে ছেলে শেখ হেলাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

খুলনায় সঙ্গীত প্রতিযােগীতায় প্রথম হতেন
৬. শেখ রাজিয়া নাসের অত্যন্ত প্রগতিশীল ও সংস্কৃতি মনা ছিলেন। তিনি সেই সময় খুলনায় সঙ্গীত প্রতিযােগীতায় প্রথম হতেন। এই মহীয়সী নারীর ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ছােট ভাই শেখ আবু নাসের এর সঙ্গে বিবাহ হয়। রাজি নাসের এর বড় ছেলে বাগেরহাট-১ আসনের এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন ও খুলনা-২ আসনের এমপি শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, নাতি বাগেরহাট-২ আসনের এমপি শেখ সারহান নাসের তন্ময়। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার চাচী রাজিয়া নাসের।

দেশে ফেরার পর মাতৃস্নেহে আগলে রাখেন চাচী
৭. ১৯৭৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ছােট মেয়ে শেখ রেহানা লন্ডন থেকে বেবিসিটারের কাজ করে জমানাে টাকা দিয়ে তার চাচী ও ভাই-বােনদের জন্য শীতের কাপড়সহ প্রথম সহায়তা পাঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন ভারতের দিল্লীতে ছিলেন। এরপর তিনি সেখান থেকে তার চাচীসহ ভাই-বােনদের জন্য সহায়তা পাঠিয়ে ছিলেন। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তার চাচী রাজিয়া নাসের তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখেন। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অভিভাবক।

গতকাল সোমবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেখ রাজিয়া নাসের। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

রাজিয়া নাসের দীর্ঘদিন ধরে বাধ্যর্কজনিত নানা রোগ ভুগছিলেন। চলতি মাসের ৫ তারিখে তাকে এভারকেয়ার হসপিটালে ভর্তি করা হয়।