চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পেঁয়াজের চোটপাট

ছোটবেলায় যখন বাবার সাথে বাজারে যেতাম তখন কোন পণ্যের বা সেবামানের ব্যাপক চাহিদার পাশাপাশি ঐ পণ্য বা সেবামানের ঘাটতি থাকা সাপেক্ষে বাজার দর উঠানামা করত। অর্থাৎ যোগানের ঘাটতি অথচ ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এমন পণ্যের ঊর্ধ্ব মূল্য লক্ষ্য করা যেত। আবার জোগান বাড়ার সাথে সাথে পণ্যের বাজার দরও কমে যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে নতুন পেঁয়াজের মৌসুম সত্ত্বেও হুট করে পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে, কোন কোন জায়গায় ২৪০-২৫০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টা কোনভাবেই কাম্য নয়, অযাচিত ও দৃষ্টিকটু। গতকাল সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকারের সিনিয়র বেশ কয়েকজন সদস্য পেঁয়াজের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন এবং সমাধানকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও দেখিয়ে দিয়েছেন। আবার কিছু কিছু জায়গায় দায়িত্বশীলদের বেফাঁস মন্তব্য পেঁয়াজের ঊর্ধ্বগতির জন্য দায়ী বলে অনেকেই মনে করছেন।

দফায় দফায় পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে কারণ হিসেবে দৈনিক সমকাল পত্রিকা বেশ কয়েকটি কারণকে মোটাদাগে চিহ্নিত করেছে। প্রথমত: পেঁয়াজের বিকল্প বাজার সৃষ্টি করে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানি করায় ব্যর্থতা। ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় তৎক্ষণাৎ নতুন বাজার সৃষ্টি না করতে পারার কারণে পেঁয়াজের দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত: বাণিজ্য মন্ত্রীর কাজের চেয়ে কথার ফুলঝুড়ির পরিপ্রেক্ষিতে মুনাফাকারীদের সুযোগ লাভ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বেফাঁস মন্তব্য সবসময়ই হিতে বিপরীত হয়েছে। আগাম পরিস্থিতি ও সংকট বিবেচনায় নিয়ে নতুন নতুন দেশের সাথে পণ্য আমদানি রপ্তানির চুক্তি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত: পেঁয়াজ আমদানি ও রপ্তানির সাথে সম্পৃক্ত সিন্ডিকেটকে যথাযথ শাস্তির মধ্যে আনতে না পারার ব্যর্থতা। মূল্য বৃদ্ধির শুরুর দিকে যে ধরনের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছিল তার ধারাবাহিকতার অপ্রতুলতা ও যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল সে সকল সিন্ডিকেটকে শাস্তি প্রদানে যথোক্ত ভূমিকার অপর্যাপ্ততা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চতুর্থত: শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের এলসি সংক্রান্ত যথাযথ ধারণার অভাব। পণ্য আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পঞ্চমত: মন্ত্রণালয়ের যথাযথ ভূমিকা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি লক্ষ্যণীয়। সবকিছুতেই সার্বিক নজরদারি ও সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজন কেননা নজরদারি ও সমন্বয় জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করে থাকে। উপরোক্ত কারণগুলোই মূলত বর্তমান বাজারে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধির পেছনের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে। পেঁয়াজের দাম অত্যধিক বেশি হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোন বিক্ষোভ দেখা না গেলেও মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাধ্য হয়েই পরিবারের সদস্যদের চাহিদা নিরূপণে কর্তা ব্যক্তি উচ্চ মূল্যে পেঁয়াজ সংগ্রহ করছেন। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, মানুষের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেই কি বেশি দামে পণ্য ক্রয় করতে হবে? অবশ্যই না, সব কিছুতেই একটা সুনীতি ও আদর্শ ধরে রাখা উচিত। না হলে অস্তিত্বের সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা সৃষ্টি হয় যা সকল পক্ষ ও পেশা-শ্রেণির জন্য শোভনীয় নয়।

তবে এও স্বীকার করতে হবে বাজারে কিন্তু পেঁয়াজের সংকট নেই। পেঁয়াজের সংকট মর্মে কোথাও কোন নিউজের শিরোনাম হচ্ছে না। তাহলেই অনুধাবন করা যায়, বাজারে পেঁয়াজের যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও লাগামহীন দাম বৃদ্ধি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর সাথে সম্পৃক্ত সিন্ডিকেট ও অন্যান্য কলাকুশলীদের দ্রুত খুঁজে বের করে নিয়ে এসে বিচারের মুখোমুখী করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। পেঁয়াজের ক্রমান্বয়িক দাম বৃদ্ধি সরকারের জন্য অবশ্যই নেতিবাচক ও দুশ্চিন্তার। সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদ সদস্যরা পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলেছেন। সরকার সবসময়ই প্রত্যাশা করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে। তথাপি উপরোক্ত কারণগুলোর জন্য বাংলাদেশে পেঁয়াজের রেকর্ড পরিমাণ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা যদি আমাদের ব্যবসায়ীদের চরিত্রের ব্যাপারে দৃষ্টি অবলোকন করি তাহলে কী দেখা যায়! পার্শ্ববর্তী দেশে বন্যা হওয়ার কারণে পণ্যের চাহিদা তথা পণ্যের সংকট পড়ার আশংকায় পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। যাতে করে সাধারণ ক্রেতাদের পেঁয়াজ ক্রয়ে কোনরূপ অসুবিধা না হয়। আর আমাদের দেশের ব্যবসায়ী বিশেষ করে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার সাথে সাথে নিজেদের কাছ থাকা পেঁয়াজ মজুদ করে রাখে বেশি লাভের আশায়। এই রকম সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের প্রতি ধিক্কার জানাই। প্রকৃত মানবিক মানুষ না হলে পরে বিবেকের কাঠগড়ায় আপনি আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংস হতে থাকবো। মানবিক এবং মৌলিক আচরণ সকলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি বিশেষ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে সকলের উচিত দেশপ্রেমের চশমা ও বিবেককে প্রতিনিয়ত জাগ্রত করে তদানুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ঘুষবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন “ট্রেস ব্রাইবারি রিস্ক ম্যাট্রিক্স” কর্তৃক তৈরিকৃত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, ঘুষ লেনদেনে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের মধ্যে সংগঠনটি নানা রকম দৃষ্টিকোণ/নির্দেশক থেকে যাচাই বাছাই করে জরিপটি পরিচালনা করে। ২০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৮ এ। বেশি স্কোর মানে সে দেশে ব্যবসায়ে ঘুষ লেনদেনের ঝুঁকিও বেশি। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের ধরণ ও বিস্তৃতি, ঘুষের প্রতি সামাজিক মনোভাব ও তা নির্বিঘ্নে সরকারের ক্ষমতা, সরকারের সদিচ্ছা এবং দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশে সুশীল সমাজের সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে গবেষণার মূল ফোকাসে রেখে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। গত বুধবার প্রকাশিত জরিপের রিপোর্টে জানা যায়, গত বছরের চেয়ে দুই পয়েন্ট বেড়ে ৭২ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ আছে ১৭৮তম অবস্থানে। অর্থাৎ ঘুষের লেনদেনের ঝুঁকি বেড়েছে বাংলাদেশে। ঘুষ লেনদেনের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে; এর দায় কিন্তু আমাদের সকলের। আমরা কেউই এর দায় এড়াতে পারি না। থানায় বড় করে লেখা থাকে জিডি করতে কোন টাকা দিতে হয় না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় অনেকেই লিখে থাকেন জিডি করার পর পুলিশকে খুশি করতে হয়। এখানে কিন্তু যিনি দিচ্ছেন এবং নিচ্ছেন উভয়েই সমভাবে দায়ী। কেননা ধীরে ধীরে এটি একটি কালচারে পরিণত হয়ে যায় এবং কেউ যখন জিডি করার পর বকশিশ প্রদানে অপারগ হয় সেখানে পুলিশ রাগান্বিত হয়ে থাকে। এভাবেই কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের বিষয়গুলো ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলের মতো। সরকারি অফিস আদালতে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের কাজটিকে সবার আগে করিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট অফিসারকে ঘুষ দিয়ে কাজটি সমাধা করে নিয়ে আসা হয়। এ রকম গর্হিত বৃত্ত থেকে সকলকেই বের হয়ে আসতে হবে।

পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা যখন নিয়মের অনিয়ম করে পেঁয়াজ মজুদ করে রাখে সেখানে অবশ্যই কাউকে না কাউকে প্রণোদনা দিতে হয়, না হলে অনিয়ম করে পেঁয়াজ মজুদ অসম্ভব। তাছাড়া পণ্য পরিবহন, বিপণন, আমদানি, রপ্তানিসহ নানা প্রক্রিয়ায় বিভিন্নজনকে প্রণোদনা দিতে হয় এবং যার রেশ পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের উপর। মধ্যস্থতাকারী, ঘুষ গ্রহণকারী ও প্রদানকারীদের অধিক তদন্তের মাধ্যমে বের করে নিয়ে আসা জরুরি দেশের সার্বিক মঙ্গলার্থে। ঘুষ লেনদেনের সাথে সম্পৃক্তদের খুঁজে বের করে আইনানুগ শাস্তি প্রদান আবশ্যক না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমে আসবে এবং যার প্রভাব পড়বে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

কাজেই, পেঁয়াজের চোটপাটকে মাথায় রেখে ঘুষ প্রদানকারী, ঘুষ গ্রহণকারী, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সহ সংশ্লিষ্ট যারা এই গর্হিত কাজের সাথে সম্পৃক্ত তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে পেঁয়াজের ন্যায় অন্যান্য পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির নজিরবিহীন বাজারদর না হয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View