চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পরবাসে কেমন আছেন প্লেব্যাক সিঙ্গার রুলিয়া আজম

বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আখতারদের সাথে যাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠ রাপালী পর্দা হয়ে রেডিওতে ভেসে আসতো তিনি রুলিয়া আজম। বিবাহপূর্বে যিনি সঙ্গীত শ্রোতাদের কাছে রুলিয়া রহমান নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে ড. খায়রুল আজমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নামের শেষে ‘আজম’ লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে রুলিয়া আজম আমাদের সিনেমা ইতিহাসে সমাদৃত এক নাম। আলাদা কণ্ঠবৈচিত্র্যের কারণে তিনি রুনা-সাবিনার সাথে অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে আশির দশকের শুরুতে তিনি শ্রোতা হ্নদয়ে ঝড় তোলেন এম. এ শোয়েবের সাথে ‘আজ থেকে বারোটি বছর’ গানটি গেয়ে। সে সময় ডিসকো রেকর্ডিং থেকে জাহিদ হোসেনের সঙ্গীত পরিচালনায় রুলিয়া আজম এবং এম. এ শোয়েবের ১২টি গান নিয়ে শোয়েব-রুলিয়া নামে একটি অডিও ক্যাসেট বের হয়। এই অডিও ক্যাসেটের ‘আজ থেকে বারোটি বছর’ গানটি সুপার হিট হয়। এই গানটির রেশ এখন শ্রোতাদের হ্নদয়ে আগের মতোই আছে।

আশি-নব্বই দশকে বেতার বাংলাদেশে অনুরোধের আসর, ছায়াছবির গান বা বিজ্ঞাপন তরঙ্গে নিয়মিত রুলিয়া আজমের গান বেজে উঠতো। প্রায় দুই শতাধিক ছবিতে কণ্ঠ দেন তিনি। ৮৩ সালে ‘গলি থেকে রাজপথ’ ছবিতে সুরকার সুবল দাসের সুরে এন্ড্রু কিশোরের সাথে রুলিয়া আজমের গাওয়া ‘আমি গাড়ি কিনি নাই, গাড়ি চড়ার মানুষ নাই’ এই গানটি এখনও শ্রোতাদের হ্নদয়ে অন্যরকম অনুরণন তোলে। সিনেমায় গানটিতে লিপ করেন নায়ক জাভেদ এবং নায়িকা জুলিয়া। একই ভাবে দারাশিকো পরিচালিত ‘প্রেমকাহিনী’ ছবিতে কুমার বিশ্বজিতের সাথে গাওয়া আমি যে প্রেমে পড়েছি, আমি যে প্রাণে মরেছি’ গানটি এখনও শ্রোতানন্দিত হয়ে আছে।
আশির দশকে ইতিহাস নির্ভর এবং একইসাথে প্রচুর ফ্যান্টাসি বা পোশাকি ছবি ছিল সাধারণ দর্শকদের কাছে প্রিয় এক বিষয়। এ সব ছবিতে একককণ্ঠে তিনি অনেক গান করেন। আবার নায়িকার সহপাঠী, বোন, বান্ধবী, ননদের চরিত্রে যারা অভিনয় করতেন তাঁদের লিপে বেশিরভাগ শোনা যেত রুলিয়া আজমের গান। সত্তর দশকের শেলষগ্নে পোশাকি ছবির খ্যাতনামা পরিচালক ইবনে মিজান পরিচালিত ‘বাগদাদের চোর’ দিয়ে প্লে-ব্যাক শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি। একের পর এক সিনেমায় প্লে-ব্যাক করেন। যাদুনগর, গলি থেকে রাজপথ, প্রিন্সের টিনা খান, শাহী চোর, আখেরী নিশান, প্রতিবাদ, গায়ের ছেলে, সেলিম জাভেদ, আলতা বানু, রাজ সিংহাসন রাজমহল, চম্পাচামেলি, রাজকন্যা, তাজ ও তালোয়ার, রাজার রাজা, আলিফ লায়লা, চাঁদ সওদাগর, সোহাগ মিলন, বাঁধনহারা, সবুজ সাথী, আলাদিন-আলীবাবা-সিন্দবাদ, রাজমহল, কেউ কারো নয়, নবাবজাদী-এরকম অনেক ছবিতে কণ্ঠ দেন। তাঁর গাওয়া এককভাবে উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো ‘সুলতানে জাহান তুমি বড়ই মেহেরবান’ (ছবি: শাহজাদী গুলবাহার: সুরকার: মনসুর আহমেদ), আমি জেনেশুনে হাতে কড়া পরেছি (ছবি: রাজকন্যা, সুরকার সুবল দাস), দুদিনের খেলা ঘরে যত খুশি খেলে যারে (ছবি: রাজকন্যা, সুরকার: সুবল দাস), তুমি যে আশা মোর ভালবাসা (ছবি: তাজ ও তালোয়ার, সুরকার: মনসুর আহমেদ), ‘এ রুপে লেগেছে আগুন দেখ না’ (ছবি: রাজার রাজা, সুরকার: আলম খান), মঞ্জুর করো রাজা আমার সালাম (ছবি: চাঁদ সওদাগর, সুরকার: আজাদ রহমান), ইরান তুরান ঘুরে (ছবি: শাহী চোর, সুরকার: সুবল দাস), দিও না আমায় দিও না ফুল দিয়ে বিনিময়ে মন নিও না (ছবি: আলতা বানু, সুরকার:সত্য সাহা), দুদিনের খেলাঘরে যত খুশি খেলে যারে (ছবি: রাজকন্যা, সুরকার: সুবল দাস) ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

রুপালি পর্দায় দ্বৈতকণ্ঠে তাঁর গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে ‘বন্ধু লিখেছে আমার প্রেমের আলাপন (ছবি: আলিফ লায়লা, সুরকার সুবল দাস, সহশিল্পী: রুনা লায়লা), ভ্রমর ছোঁয়ায় ফুল ফোঁটে (ছবি: রাজমহল, সুরকার সুবল দাস, সহশিল্পী: রুনা লায়লা), ‘চোখে আমার প্রেমের কাজল কণ্ঠে আছে গান’ (ছবি: গায়ের ছেলে, সুরকার: সুবল দাস, সহশিল্পী: উমা খান), ‘এখন আমার মনের মানুষ চাই’’ (শাহজাদী গুলবাহার: সুরকার: মনসুর আহমেদ, সহ শিল্পী: সুবীর নন্দী), রুপ দেইখা পাগল হইয়া পিরিতি কইরো না (ছবি: প্রতিবাদ, সুরকার আলম খান, সহ শিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদী), শোনো শোনো হয়েছে বাবা রাজি ( ছবি: সেলিম জাভেদ, সুরকার: আনোয়ার পারভেজ, সহশিল্পী: খুরশিদ আলম), সখি ঘরে বাইরে (ছবি: আলতা বানু, সুরকার:সত্য সাহা, সহশিল্পী: খুরশিদ আলম), বুজান লো বুজান ঘোমটাখানি টান (ছবি:কেউ কারো নয়, সুরকার: আলম খান), আমি গুলশানেরই লালগোলাপ (ছবি: রাজসিংহাসন, সহশিল্পী: রুনা লায়লা, সুরকার : সুবল দাস), মোরা চম্পা আর চামেলি (ছবি: চম্পা চামেলী, সুরকার: আলাউদ্দিন আলী, সহশিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), ও আমার ময়না কথা আর কয় না (ছবি: সোহাগ মিলন, সুরকার: আনোয়ার পারভেজ, সহশিল্পী: খুরশীদ আলম), চাঁদনী রাতে আমার চোখেতে রঙের বাহার (ছবি: আলাদিন-আলিবাবা-সিন্দবাদ, সুরকার: আলম খান, সহশিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন) ইত্যাদি।
দু সন্তানের জননী রুলিয়া আজম অনেকদিন ধরেই সবার চোখের আড়ালে গেছেন। দেশের কোনো চ্যানেল বা সঙ্গীতানুষ্ঠানে দেখা যায় না তাঁকে। এর কারণ অবশ্য একটাই তিনি অনেকদিন ধরে পরবাসী, ফিজিতে বসবাস করেন। ওখানে মেয়ে ড. নুসরাত আজমের সাথে থাকেন। মাঝে মধ্যে দেশে আসেন। তাঁর ছেলে থাকে পোলান্ডে। কদিন আগে কণ্ঠশিল্পী রুলিয়া আজমের সাথে কথা হয়। সঙ্গীত জীবনের গল্প করতে করতে ফিরে যান সেই তারুণ্যে। রাজধানীর স্মৃতিময় মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় বেড়ে ওঠা, গানের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া, প্লে-ব্যাক জীবনের অনেক কথাই বলেন। প্লে-ব্যাকের শুরুর কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘আমার প্লে-ব্যাকের শুরুটাও মিরাকল। আটাত্তর সালের দিকের কথা। আমি তখন বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী। সিনেমাতে গান গাওয়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু গান গাওয়ার ইচ্ছেটাও আবার অতো প্রবল না। তখন রেডিওতে সিনেমার গানের অসম্ভব জনপ্রিয়তা। এরমধ্যে ঘটল ঘটনা। ধানমন্ডিতে একদিন আমার খালাতো বোনের বউভাত। আমরা সবাই ওখানে গিয়েছি। হঠাৎ এলেন সুরকার মনুসর আহমেদ। নামকরা সন্তুর বাদক। ওখানেই উনি আমাকে পেয়ে বললেন, তোমাকে সিনেমাতে প্লেব্যাক করতে হবে। আমিতো খুবই খুশি। আমার বড় ভাই জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আমি মোহাম্মদপুরে সুরকার মনসুর আহমেদ-এর বাসাতে গেলাম। উনি গানটা হারমোনিয়ামে তুলে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। গানটি ‘বাগদাদের চোর’ ছবির। ছবির পরিচালক ইবনে মিজান। জাভেদ-ববিতা নায়ক নায়িকা। গানের কথা-আমি জারিনা আমি মেহফিলে হাসিনা। গানটির সুর আরাবিয়া ধাঁচে। পরে গানটি কাকরাইলে সাফাত ভাইয়ের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ড করা হলো। এই ছবিতে আরও গাইলাম-তারা ভরা রাতে এলে যে বাহার। বাগদাদের চোর ছবি হিট হলো। আমার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। এরপর একের পর এক সুরকাররা নতুন নতুন গান নিয়ে এলেন।’
রুলিয়া আজম দেশের প্রায় সব প্রখ্যাত সুরকারদের সুরের গানেই কণ্ঠ দিয়েছেন মনসুর আহমেদ ছাড়াও সুবল দাস, আনোয়ার পারভেজ, আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, শেখ সাদী খান, আজাদ রহমানের সুরের একাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে সুরকার মনসুর আহমেদ এবং সুবল দাস তাঁর হ্নদয়ে এখনও গেঁথে আছে। তাঁর মতে, ‘সঙ্গীত জীবনে এ দুজন সঙ্গীত গুরুর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এ দুজন শুরুতেই আপন করে রুনা-সাবিনার পাশে আমাকে বসিয়েছিলেন’। ফিজিতে বসবাস করলেও গান ছাড়েননি রুলিয়া আজম। ওখানে যেসব অনুষ্ঠান হয় সেখানে নিয়মিত অংশ নেন। এখনও প্রাণ খুলে গাইতে ভালবাসেন। তাঁর সময়ের গানের মানুষদের হ্নদয়ে অনুভব করেন সবসময়। আবিদা সুলতানাসহ অনেকের সাথে কথা হয় তাঁর নিয়মিত। গানের মানুষ যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের স্মরণে এনে নষ্টালজিক হয়ে পড়েন। ঢাকার সিনেমা হলগুলো তাঁর স্মৃতিতে এখনও অবিনশ্বর। বললেন, তাঁর প্লেব্যাকের প্রথম ছবি ‘বাগদাদের চোর’ মুক্তি পাওয়ার পর এই ছবি দেখতে গিয়েছিলেন আনন্দ সিনেমা হলে। এরপর যখনই তাঁর গাওয়া গানের ছবি মুক্তি পেত সেই ছবি হলে বসে দেখতে ভুল করতেন না।
রুলিয়া আজমের কোনো অনুযোগ-অভিযোগ নেই। নিজের গাওয়ার গানগুলো বরাবরাই তাঁকে উচ্ছ্বসিত করে। মনে করে করে নিজের গান গাইতে ভালবাসেন। প্রখ্যাত সুরকারদের সাথে রাতদিন কাজ করা, ইপসা-শ্রুতি রেকর্ডিং স্টুডিওতে কণ্ঠ দেওয়া-এরকম হাজারো স্মৃতি তাঁর জীবনের মূল্যবান সম্পদ। ফিজিতে বসে গুগলে যখন নিজের গাওয়া গান খুঁজে পান তখন তিনি আরও স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন। গানেই তিনি এখনও খুঁজে পান প্রাণ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন